ঈদুল আযহা: আনন্দ ভাগাভাগি ও পরস্পরের প্রতি যত্নশীল হওয়ার সময়

رمضان كريم

ঈদুল আযহার অনন্য আধ্যাত্মিক, শিক্ষামূলক এবং সামাজিক তাৎপর্য্য রয়েছে। এটি মুসলমানদের অন্তরে আনন্দ ভাগাভাগি করার ও পরস্পরের প্রতি যত্নশীল হওয়ার চেতনাকে রোপন করে। এর রয়েছে বিশেষ আচার-অনুষ্ঠান, রীতিনীতি এবং মূল্যবোধ, যা যথাযথভাবে পালন করা সম্ভব হলে একজন মুসলিমের চেতনা আরও সমৃদ্ধশালী হতে পারে।

ঈদের দিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ হল – ঈদের নামাযে যাওয়ার আগে গোসল করা এবং নিজের সবচেয়ে ভাল পোশাকটি পরিধান করা। এটি ইসলামের পরিচ্ছন্নতা এবং সৌন্দর্যের দিকটি প্রতিফলিত করে। একজন মুসলিমের উচিত তার অবয়ব, পোশাক এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে যত্নবান হওয়া।

ঈদের দিনের সকালে, একজন মুসলিম তার ছোট ভাই-বোনদের সাথে নিয়ে ঈদের নামাজ আদায় করতে বের হয়। সম্প্রদায়ের প্রতিটি সদস্যের মাঝে এদিন ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে দেখা যায়।

এটি সুপরিচিত যে, মহিলারা তাদের মাসিক চলাকালীন সময়ও ঈদের নামাজ এবং খোলা ময়দানে ঈদ উদযাপন করা দেখার অনুমতি পান। এটি মুসলমানদের অন্তরের ভ্রাতৃত্ববোধ, ঐক্য এবং একতার অনুভূতিকে প্রতিবিম্বিত করে।

ঈদের নামাজের পর আরেকটি সুন্নাহ হল, সকলে যে পথ দিয়ে ঈদের ময়দানে প্রবেশ করেছিল তার বিপরীত পথ দিয়ে যেন বের হয়। জাবির ইবনে আবদুল্লাহ(রাযিঃ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের দিন তার পথ পরিবর্তন করতেন। (বুখারী) এই বিস্ময়কর প্রস্তাবিত অনুশীলনের লক্ষ্য হল বিপরীত পথ দিয়ে গমনের সময় অন্যান্য মুসলমান বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশী এবং সম্প্রদায়ের সদস্যদের সাথে ঈদের শুভেচ্ছা ও আনন্দ বিনিময়ের একটি সুযোগ পাওয়া যায়।

ঈদুল আযহার সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ অনুষঙ্গ হল কুরবানী করা। কুরবানীর মাংসকে তিন ভাগে ভাগ করার জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে। এক-তৃতীয়াংশ পরিবারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ আত্মীয়স্বজনের জন্য এবং বাকি এক-তৃতীয়াংশ গরীবদের জন্য। এটি মুসলিমদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আরও একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।

মুসলিম উম্মাহর মধ্যে কাউকে উপেক্ষা করা বা একা রাখা হয় না, কারণ মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিটি সদস্যকে কেবল তার নিকটবর্তী পরিবার ও আত্মীয়স্বজনদের জন্যই নয়, বরং মুসলিম উম্মাহর সমস্ত সদস্যদের জন্য যত্নবান হওয়ায় প্রতি কুরআন ও হাদিসে অনেক তাকিদ এসেছে।

কুরআনের আয়াত এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের অনেক হাদিস থেকে এই শিক্ষা পাওয়া যায় যে, মুসলমানরা পরস্পর ভাই-বোন এবং একে অপরের প্রয়োজনে দেখাশোনা করা ভাই-বোনদের প্রতি প্রতিষ্ঠিত কর্তব্য। ঈদুল আযহা আমাদেরকে এই শিক্ষাটিই দেয় যেটির বাস্তব প্রতিফলন ঘটাতে পারলে মুসলিম উম্মাহ বর্তমান নাজুক পরস্থিতি থেকে অনেকটাই রেহাই পেত।

ঈদ হল একে অপরের বাড়িতে যাওয়া এবং পারিবারিক সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য একটি দিন। আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা একটি প্রতিষ্ঠিত কর্তব্য যা প্রত্যেক মুসলমানকেই পালন করা উচিত। ঈদ পরিবারের সদস্যদের একত্রিত করার এবং আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও সম্প্রদায়ের অন্যান্য সদস্যদের সাথে সাক্ষাত করার একটি সুবর্ণ সুযোগ। ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় ও পরস্পরের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া ব্যতীত ঈদের আসল মজাটাই যেন পাওয়া যায় না।

কয়েক বছর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রমজান সফরের সময়, আমি নেভাডার রেনোতে ইসলামিক সেন্টার দ্বারা আয়োজিত একটি ‘ঈদ পার্টি’ সম্পর্কে শুনতে পেলাম; সম্প্রদায়ের সকল সদস্যের  সাথে পরিচিত হওয়া, শুভেচ্ছা বিনিময় করা এবং পারস্পরিক বন্ধন আরও মজবুত করার লক্ষ্যেই তারা এই উদ্যোগটি হাতে নিয়েছে এবং এটি অনেক ফলপ্রসুও হয়েছে।

ঈদের দিন, মুসলমানদেরকে মসজিদ, বাজার, রাস্তা ইত্যাদি সকল স্থানে সর্বসাধারণের মাঝে তাকবির(আল্লাহু আকবার) বলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই ইবাদতটি মুসলমানদেরকে আধ্যাত্মিকভাবে সংযুক্ত করে এবং পরস্পরের মাঝে মানসিক প্রশান্তি ও সুখ ছড়িয়ে দেয়।

এ কারণে হৃদয় এবং শরীর উভয়ই ঈদ উদযাপন উপভোগ করে। লোকেরা একে অপরের সাথে সাক্ষাত করে, শুভেচ্ছা জানায় এবং আল্লাহর প্রশংসা ও ইবাদত করার মাধ্যমে অন্তরগুলি প্রশান্তি ও সুখ খুঁজে পায়।

ঈদ এমন একটি দিন যেদিন একজন মুসলিমের উচিত সৎকর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে নিজেকে আল্লাহর নিকট সমর্পণ করা — যেমন নামাজ, দরিদ্র ও মিসকীনদের দেখাশোনা করা, অসুস্থ লোকদের দেখাশোনা করা, অভাবীদের সাহায্য করা ইত্যাদি। মানুষের ক্ষতি করা এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা প্রভৃতির মত শয়তানী কার্যকলাপ এবং যেকোনো খারাপ অভ্যাস থেকে সকলকেই বিরিত থাকা উচিত।

সংক্ষেপে, ঈদুল আযহা মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য একটি আদর্শ, যা পরস্পরের মাঝে ভালোবাসা, যত্ন, ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি এবং সংহতি বজায় রাখে। ঈদের এই সামাজিক, আধ্যাত্মিক এবং শিক্ষামূলক তাৎপর্য্যগুলি সকলের অনুধাবন করা উচিত।