ঈমান-এর অর্থ কী?

Muslim man standing in front of white mosque
Photo by Artur Aldyrkhanov on Unsplash

অনেক অনুবাদক আরবি শব্দ ‘ঈমান’ কে ‘বিশ্বাস’ হিসেবে অনুবাদ করেন। এই অনুবাদটি অনেকটা কঠিন সমস্যার একটি অপূর্ণ সমাধানের মত। দুর্ভাগ্যক্রমে, আরবি থেকে ভাষান্তরের সময় প্রায়শই ভুল অনুবাদ পাওয়া যায়। এই ভাষাতাত্ত্বিক ভাঙ্গনের অন্যতম করুণ উদাহরণ হল “জিহাদ” শব্দটি, যা এক সময় “পবিত্র যুদ্ধ” হিসাবে অনুবাদ করা হত।

মুসলিমরা নিজেরাই ঈমানকে ‘বিশ্বাস’ হিসাবে অনুবাদ করছে। ‘বিশ্বাস’ হিসাবে ঈমানের অনুবাদ এতটা সমস্যাযুক্ত কারণ, যদি কোনো মুসলিম যদি মনে করে যে কুরআন তাকে ঈমান রাখার আদেশ দিয়েছে, আর সে যদি ‘বিশ্বাস’ অনুবাদের দিকে তাকিয়ে শুধু অন্তর থেকে বিশ্বাস রাখে আর কোনো ধর্মীয় দায়িত্ব পালন না করে তবে তা তার ধ্বংসের জন্য একটি ভয়াবহ কারণ হয়ে দাঁড়াবে। ঈমানের অর্থ আরও বিস্তৃত যা ‘বিশ্বাস’ শব্দটির দ্বারা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ পায় না।

ঈমান এবং ‘বিশ্বাস’ এর মধ্যে পার্থক্য দেখানোর একটি উপায় হল শব্দ দুটির ব্যুৎপত্তি বিশ্লেষণ করা। আনাস ইবনে মালিক রাযিঃ বর্ণনা করেন যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তোমরা কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবে না যতক্ষণ না তোমার ভাইয়ের জন্য তাই পছন্দ করবা যা তুমি পছন্দ করো” [সহীহ বুখারি ও সহীহ মুসলিম]

উপরোক্ত হাদিসটি ঈমান ও বিশ্বাসের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরে। এই হাদিসটিতে মুসলিদেরকে বলা হয়েছে নিজের জন্য যা পছন্দ করে তা অপর ভাইয়ের জন্যও পছন্দ করতে হবে। এটি শুধু বিশ্বাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং কর্ম দিয়ে সম্পাদন করতে হবে। সুতরাং ঈমানও শুধু বিশ্বাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

বিশ্বাস শব্দটির সাথে কর্ম সম্পাদনের কোনো যোগসূত্র নেই। সাধারণ কথাবার্তায় কিভাবে  ‘বিশ্বাস’ শব্দটি ব্যবহৃত হয় তা ভেবে দেখুন। যখন কেউ বলে, “আমি আপনাকে বিশ্বাস করি”, তখন তিনি যা বলছেন তা হল “আমি মনে করি আপনি সত্য বলছেন এর কমপক্ষে ৫১% সম্ভাবনা রয়েছে।” এই বিশ্বাস এবং কর্মের মধ্যে কি কোনও সংযোগ রয়েছে? না। এই কথোপকথনটি কল্পনা করুন।

বিশ্বাসের সাথে প্রতিশ্রুতির কোনো সম্পর্ক নেই। অন্যদিকে, ঈমানের সাথে প্রতিশ্রুতি সম্পর্কিত। ঈমান একটি আমানত তৈরি করে । ঈমান আল্লাহর সাথে বান্দাকে অঙ্গীকারবদ্ধ করে তোলে। এই প্রতিশ্রুতির মধ্যে নিজে ইসলাম শেখা, ইসলামকে পরিপূর্ণভাবে অনুশীলন করা এবং অন্যকে ইসলাম শেখানো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

ঈমান একটি জীবন পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু করে। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রিয় চাচা আবু তালিবের কথা চিন্তা করুন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম ইসলামের সূচনা থেকেই তার চাচা আবু তালিবকে ইসলামের দিকে আহ্বান করা শুরু করেন। কিন্তু মৃত্যু পর্যন্ত আবু তালিব ইললাম গ্রহণ করেনি। ঈমানের ভিতর যদি ‘বিশ্বাস’ ব্যতীত আর কিছু না থাকে তবে আবু তালিব কি এটা প্রত্যাখ্যান করতেন? শুধু বিশ্বাস করা কি এতটাই কঠিন ছিল যে, নবী করীম সাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের বারবার চেষ্টার পরও তিনি কেন ইসলাম গ্রহণে অস্বীকার করে এসেছেন? এর কারণ, আবু তালিব সম্ভবত সত্যই ঈমানকে আজকের অনেক মুসলমানের চেয়ে বেশি বুঝতে পেরেছিলেন যার কারণে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। কারণ তিনি জানতেন যে ঈমান হল কর্মের প্রতিশ্রুতি, জীবন-পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি। তাই তিনি অস্বীকার করেছিলেন কারণ তিনি মৌলিকভাবে তার জীবনকে রূপান্তর করতে প্রস্তুত ছিলেন না।

সুতরাং ঈমান থাকার অর্থ যেকোনো কর্মের প্রতি প্রতিশ্রুতবদ্ধ হওয়া। যে মুসলমানের ঈমান রয়েছে সে কেবল আল্লাহকে বিশ্বাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং সে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশ অনুসরণ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়। ঈমান ধর্মীয় ক্ষেত্রে সাফল্যের চাবিকাঠি, তবে অন্যান্য ক্ষেত্রেও এর কিছু প্র্য়োগ দেখা যায়। ভাল শিক্ষার্থীদের এক প্রকার ঈমান থাকে; তারা তাদের সাফল্যে বিশ্বাস করে এবং এর ফলস্বরূপ, তারা নিয়মিত অধ্যয়ন করে, ক্লাসে উপস্থিত হয় এবং পড়ার প্রতি প্রতিশ্রুতবদ্ধ হয়।

ঈমান এর সাথে অনেক কাজও আঞ্জাম দিতে হয়। তাহলে কেন কেউ এতে আগ্রহী হবে? কারণ ঈমানের ফলাফল হল আমান। আমান অর্থ হল সুরক্ষা, নিরাপত্তা এবং শান্তি লাভ করা। ঈমান একজন ব্যক্তিকে শান্তির দিকে নিয়ে যায়। আর এই শান্তির প্রত্যাশী হয়েও আজ বিশ্ববাসী ঈমান থেক দূরে থাকছে। সুতরাং, অন্তরের শান্তিই হোক আর বাহ্যিক স্বস্তিই হোক তা একমাত্র ঈমানের দ্বারাই পাওয়া সম্ভব।