উজবেকিস্তানের নান রুটি এবং তার ঐতিহ্যপূর্ণ আখ্যান

এশিয়া Contributor
সুস্বাদু
উজবেকিস্তানের নান রুটি
© Konstantin Han | Dreamstime.com

উজবেকিস্তানের রাজধানী তাশখন্দের শহরতলীর প্রাচীন শীতল গলি পথ দিয়ে হাঁটলেই কাঠের ধোঁয়া আর টাটকা রুটির গন্ধ পাওয়া যায়। দিনের যে কোনও ব্যস্ত সময়ে রাস্তায় সাইকেলে সওয়ার রুটি সরবরাহকারী আর বাচ্চাদের দলকে প্লাস্টিকের থলে করে রুটি নিয়ে যেতে দেখা যাবে। এখানে দেখা মিলবে পাঁচ পুরুষ ধরে উজবেকিস্তানের নান রুটি প্রস্তুতকারক রাওশানবেক ইসমাইল্ভের। ৩১৫ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডের তন্দুর ওভেনে শরীরের অর্ধেকটা ঢুকিয়ে তিনি রুটির মণ্ডগুলিকে ওভেনের গরম দেওয়ালে আটকে দেন আর কিছু ক্ষণ পরে সেখান থেকে বের করে আনেন সোনালী রঙের সুগন্ধিত নান রুটি। এরপরে সেগুলো ঠান্ডা করার জন্য একটি ধাতব পাত্রে রাখা হয়।

নান শব্দটি পারস্য থেকে এসেছে, এইসব অঞ্চলে রকমারি ময়দা দিয়ে বানানো এবং ঈষৎ ধোঁয়ার গন্ধ আর স্বাদযুক্ত রুটি বড় বড় মাটির তন্দুরে বানানো হয়, যেগুলো নান নামেই পরিচিত।

স্থানীয় ভাবে রাওশানবেক নান রুটি প্রস্তুতকারক হিসেবেই পরিচিত। উজবেকিস্তানের বিভিন্ন রকম তন্দুরে তৈরি নানের মধ্যে তাশখন্দ রীতি অবলম্বনে প্রচলিত নান তৈরিতে তিনি বিশেষজ্ঞ বললেও অত্যুক্তি হয় না। তাঁর হাতে বানানো রুটি খাস্তা, খাওয়ার জন্য একদম সঠিক। আর সেগুলি বেশ ফাঁপা এবং সুস্বাদু হয়।

ঊজবেকিস্তানের নান তৈরির প্রণালী

রাওশানবেকের রুটি তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয় আগের দিন রাতে তৈরি করে রাখা টকে যাওয়া ময়দার মন্ড দিয়ে, যাকে খামির বলা হয়। পুরোনো দিনের ঢালাই করা লোহার একটি বড় পাত্রে কিছুটা খামির নেওয়া হয়, তারপর হাতে কিছুটা মন্ড নিয়ে সমান ভাবে বেলা হয়। এরপর চেকিচ নামক ধাতুর স্ট্যাম্প নিয়ে ছিদ্রযুক্ত নকশা করা হয়। তারপর এর উপর তেল লেপা হয়, এই কারণেই জন্য রুটিগুলো সোনালী রঙ ধারন করে। শেষে তিলের বীজ ছড়িয়ে দেওয়া হয় আর উপরে গুঁড়ো দুধের মিশ্রণের প্রলেপ দিয়ে স্বাদ বাড়ানো হয়। রাওশানবেক দিনে প্রায় ৫০টি বড় রুটি এবং অন্তত ৪২৫টি ছোট রুটি অনায়াসে বানাতে পারেন।

উজবেকিস্তানের অন্যান্য অঞ্চলের নানের তুলনায় তাশখন্দ রীতির নান অনেকটাই হালকা, নরম এবং পাতলা হয়। তৈরি করার কয়েক ঘণ্টা পর পর্যন্ত এই নান রুটিগুলি সুস্বাদু থাকে। তাই যাঁরা রুটি তৈরি করেন, তাঁরা কম বয়সি ছেলে বা সাইকেল আরোহীদের নিযুক্ত করেন যাঁরা ক্যাফে, রাস্তার ধারের দোকান বাজার, বাড়ি আর রেস্তোরাঁয় সকাল পাঁচটা থেকেই রুটি পৌঁছে দেওয়ার কাজ শুরু করে।

গম আর বার্লির চাষ মুসলিম দুনিয়ায় বহু বছর আগেই শুরু হয়, কিন্তু ফারাওদের সমকালীন মিশরে অপ্রত্যাশিতভাবে খামিরের আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত, বাকি পৃথিবী যেভাবে রুটি বানায় এখানেও সেভাবেই তৈরি করা হত।

খামির আবিষ্কারের ইতিহাস

এই খামির কীভাবে আবিষ্কৃত হল তার পিছনে নানা প্রচলিত মত রয়েছে – যেমন, খাদ্যশস্য আর জলের মিশ্রণ উষ্ণ আবহাওয়ায় থাকার ফলে বায়ুবাহিত ইস্টকে আকৃষ্ট করে, যেমনটা সব জায়গাতেই হয়ে থাকে। দ্বিতীয় মতটি হল, নীল নদের জলে এক প্রকার ঈস্ট থাকে, ওই জল ব্যবহারের ফলে সেই ঈস্ট গম বা বার্লির গুঁড়োকে গাঁজিয়ে দেয়। যেভাবেই শুরু হয়ে থাকুক না কেন, উজবেকিস্তানের নান রুটি যথেষ্ট পুরোনো বলেই প্রায় ২৭০০ সাল পুরোনো এপিক অফ গিলগামেশ-এও এর উল্লেখ আছে।

ইরান, তুরস্ক, মধ্য এশিয়া, আফগানিস্থান, পাকিস্থান, উত্তর ভারত এবং চীনের পশ্চিমে শিনজিয়াঙ প্রদেশে বিভিন্ন আকৃতির, মাপের এবং স্বাদের নান পাওয়া যায় । উজবেক নান চেনার উপায় হল, এর গোল আকৃতি, যার মাঝখানটা ঈষৎ বসানো, নরম কুরমুড়ে স্বাদ, নিজস্ব গন্ধ আর সোনালী রঙ। তাও প্রতিটি অঞ্চল আর শহরের উজবেক নানের মধ্যে তারতম্য রয়েছে।

যেমন খ্রিস্টান এবং অন্যান্য সংস্কৃতিতে যেমন রুটি ভাগ করে নেওয়াটা বন্ধুত্ব, সম্মান এবং আতিথেয়তার পরিচায়ক, তেমনই উজবেকিস্তানে চা-কফি-খেজুরের মতো রুটি ভাগ করে নেওয়াটাও অন্যতম প্রচলিত আতিথেয়তার ঐতিহ্য।

উজবেক ঐতিহ্যের অংশ তাদের নান রুটি

উজবেকিস্তানের নান রুটি শুধুই জনপ্রিয় নয়, এর সাথে জড়িয়ে রয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের বহু রীতিনীতিও। যেমন, নবজাতকদের দীর্ঘায়ু কামনা করে তাদের মাথার নীচে নান রুটি রাখা হয়। এমনকি শিশু হাঁটতে শিখলেও তার পায়ের মধ্যে নান রাখা হয়, যাতে তার যাত্রাপথ মঙ্গলময় হয়। উজবেকিস্তানে নান কখনওই ছুড়ি দিয়ে কাটা হয় না, বরং সেটি হাত দিয়ে ভেঙে দুই টুকরো করা হয়। এমনকী নান উল্টে রাখাটাও অসম্মানজনক বলে মনে করা হয়। উজবেক ঐতিহ্য অনুসারে, রুটিকে ঈশ্বর প্রদত্ত পবিত্র দান বলে মনে করা হয়, এমনকি রুটির টুকরো ভেঙে মাটিতে পড়লেও তা তুলে দেওয়াল কিংবা গাছের উপরে পাখিদের জন্য রেখে দেওয়া হয়, এবং বলা হয় “আয়শ আল্লাহ” (আল্লাহের রুটি)।

Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.