SalamWebToday নিউজলেটার
Sign up to get weekly SalamWebToday articles!
আমরা দুঃখিত কোনো কারণে ত্রুটি দেখা গিয়েছে:
সম্মতি জানানোর অর্থ, আপনি Salamweb-এর শর্তাবলী এবং গোপনীয়তার নীতি মেনে নিচ্ছেন
নিউজলেটার শিল্প
মতামত ১৭ জুন ২০২০

উদ্বাস্তু, শরণার্থী, অভিবাসী – ওরা কারা?

Tamalika Basu

লেখক জর্জ অরওয়েল বলেছিলেন,”আমাদের চিন্তাভাবনা যদি আমাদের ভাষাকে কলুষিত করে তবে ভাষাও আমাদের চিন্তাকে কলুষিত করতে পারে”। বস্তুত ভাষা আমাদের মানবিক প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। দার্শনিক ডেভিড লিভিংস্টোন স্মিথ এই বিষয়টি নিয়ে চর্চা করার প্রসঙ্গে দেখিয়েছিলেন যে মানুষ কীভাবে আরেকজন মানুষের সঙ্গে সহিংস নিষ্ঠুর আচরণ করতে সক্ষম হয়। স্মিথ তাঁর গ্রন্থ ‘লেস দ্যান হিউম্যান’-এ প্রাচীন সভ্যতার ইতিহাস (চিনা, মিশরীয়, মেসোপটেমিয়ান) এবং সাহিত্য থেকে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহে প্রমাণ পেয়েছেন যে মানুষই কীভাবে অন্য মানুষের প্রতি আক্রমণাত্মক আচরণে লিপ্ত হতে পারে।

কিন্তু যারা মনে করেন নির্মম, একইসঙ্গে এই ধরণের নিষ্ঠুরতার বাইরেও মানবসভ্যতার ধারা বিকশিত হয়েছে, তারা নাৎসি জার্মানি কর্তৃক ইহুদিদের নিরবচ্ছিন্ন অত্যাচারের কথা মনে করতে পারেন। রুয়ান্ডার তুতসিস প্রজাতিকে তেলাপোকা হিসেবে অভিহিত করা এবং বসনিয়ানদের এলিয়েন হিসেবে চিহ্নিত করা… এমন প্রতিটি উদাহরণই ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের উদ্রেক ঘটিয়েছে সমগ্র বিশ্বে।

উদ্বাস্তুদের অমানবিকরণঃ

উদ্বাস্তু, শরণার্থী, অভিবাসীদের অমানবিকরণের এই প্রক্রিয়াটি কয়েক বছর ধরে ইউরোপে ত্বরান্বিত হয়েছে। ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড ‘দ্য সান’-এর প্রাক্তন কলামিস্ট, কেটি হপকিনস, ২০১৫ সালে অভিবাসীদের বর্ণনা দেওয়ার জন্য ‘তেলাপোকা’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন।

ইউএনএইচসিআর রিপোর্টে ইইউতে শরণার্থী এবং অভিবাসীদের সঙ্কট নিয়ে প্রেস কভারেজের বিষয়বস্তু অধ্যয়ন করা হয়েছে। বস্তুত অভিবাসীদের এইরূপে চিত্রাঙ্কন করা হ’ল অমানবিক বর্বরতারই প্রকাশ। হপকিন্সও এর ব্যতিক্রম নন।

হাঙ্গেরিও এ ক্ষেত্রে কোনওভাবেই আলাদা নয়। এই ঘটনাগুলি কেবলমাত্র রাজনৈতিক বর্ণবাদের ভিত্তিতেই সীমাবদ্ধ করা হয়নি। ব্রিটিশ প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন, ২০১৫ সালে ফ্রান্সের সীমান্তে বসবাসকারী অভিবাসীদের সম্পর্কেও অত্যন্ত বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন।

হাঙ্গেরি বা অস্ট্রিয়ায় ভোটের সময়, জোটের সংখ্যালঘু অংশীদার-অস্ট্রিয়া ফ্রিডম পার্টি (এফপিও)এবং অস্ট্রিয়া মুসলিম যুব(এমজেও) গোষ্ঠীকে ‘একটি নেস্টেড নেটওয়ার্কের অংশ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা কেবলই রাজনৈতিকভাবে ইসলাম সংগঠিত করে। এসব দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দলগুলি “ইউরোপের ইসলামিকরণ” এর আসন্ন সমস্যার বিষয়ে কথা বলছেন। আশ্রয় প্রার্থনায় শরণার্থী হওয়া বা আরও সমৃদ্ধ ভূমির সন্ধানে অভিবাসী হওয়ার পরিবর্তে, অভিবাসনের সন্ধানকারী মুসলমানদেরকে সমগ্র ইউরোপে অস্বীকার করার জন্য বলা হয়েছে। যেমন নেদারল্যান্ডসেও কয়েক বছর আগে হিজাব নিষিদ্ধ, সমস্ত মসজিদ বন্ধ, কুরআন নিষিদ্ধ প্রস্তাব উঠেছিল।

উদ্বাস্তু বিষয়ে ইসলামোফোবিয়ার প্রসার

হাঙ্গেরি সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের পরিচালক কেনেথ রথ উল্লেখ করেছিলেন, ‘অভিবাসীদের নিয়ে সবাই কেন এতটা বিচলিত? এটি চাকরির সমবণ্টন বা তাদের পরিচালনা করার ক্ষমতা বা সামাজিক কল্যাণ সম্পর্কে নয়। আসলে এটি হচ্ছে কারণ তারা মুসলমান।” প্রকৃতপক্ষে, ধর্মীয় বা জাতিগত ভিত্তিতে অনাকাঙ্ক্ষিত ও অবাঞ্ছিত অভিবাসী সমস্যার অনেক ঐতিহাসিক নজির রয়েছে। যেমন অস্ট্রেলিয়া চায় সাদা ইউরোপীয় অভিবাসী। কিন্তু দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার লোকদের ঢুকতে দিতে চায় না। একই ভাবে ইজরয়েলে শরণার্থী স্বীকৃতি দেওয়া হয় শুধু মাত্র ইহুদীদের । বিশেষ করে ইউরোপ থেকে বিতাড়িত আসেনকাজি ইহুদীরা। রথের বক্তব্যের মূল বিষয় হল, ইউরোপে যে অভিবাসীদের ঘিরে ভীতি সঞ্চার লক্ষ্য করা যাচ্ছে তার গূঢ় অন্তর্নিহিত তাত্পর্য রয়েছে। এটা শুধুমাত্র বর্ণ বা জাতিগত বিদ্বেষ নয়। ইসলামফোবিয়ার ব্যাপক প্রসার ঘটছে ইউরোপে।

সাম্প্রতিক পিউ সমীক্ষায়  দেখা গিয়েছে  ২০১৬ সালে ধর্মীয় বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষেত্রে এবং অধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে মুসলমানদের টার্গেট করা হচ্ছে। ইউরোপে তা বছরের পর বছর বেড়েই চলছে। গবেষণায় দেখা গেছে যে তুলনামূলকভাবে কম খ্রিস্টান ও ইহুদিরা কিছু দেশে অত্যাচারের মুখোমুখি হচ্ছেন। রাজনৈতিক দল ও আইনগুলির অপ্রতিরোধ্য লক্ষ্যগুলি হয়ে উঠছে মুসলমানরা; যে ২৫টি ইউরোপীয় দেশ ধর্মবিরোধী জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলিকে আশ্রয় দিচ্ছে, তার মধ্যে ২০ টি দেশেই নির্যাতনের লক্ষ্য ছিল  মুসলমানরা।

উপসংহার

শেষ পাঁচ বছরে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনের এবং ব্রিটিশ ব্রেক্সিট ফলাফল জনসাধারণের মনে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গির অধ্যায় প্রকাশ করেছে। ইরাক, সিরিয়া, আফগানিস্তান – মধ্য প্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল থেকে আশা অভিবাসীদের প্রতি বিদ্বেষ এবং উস্কানি ত্বরান্বিত হচ্ছে যুক্তরাজ্যে এবং যুক্তরাষ্ট্রে। তাই শুধু অভিবাসীদের প্রতি ঘৃণা এবং ইসলাম ধর্মলম্বীদের প্রতি ঘৃণা এ দু’টি কোন পৃথক মনোভাব নয়। অভিবাসীদের প্রতি ঘৃণা কারণ তারা মুসলিম, জনসাধারণের এই দৃষ্টিভঙ্গী চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো হচ্ছে।

ইসলাম বিদ্বেষী মন্তব্য এবং হামলা নির্বিচারে চলছে ইউরোপে। রাষ্ট্রগুলি এর বিরুদ্ধে কোন গঠনমূলক পদক্ষেপ করেনি। এই সমস্যা নিয়ে নূন্যতম আলোচনা পর্যন্ত হচ্ছে না। ইসলামোফোবিক আক্রমণ বৃদ্ধির পাশাপাশি আইন-কানুনের নাগপাশে মুসলিম হওয়ার অর্থ কী তার সংজ্ঞা প্রশ্নের মুখে। বলা যেতে পারে আমরা এমন একটা সময়ে বাস করছি যেখানে মুসলিম অভিবাসীদের সর্বসমক্ষে বিতাড়িত করছে পশ্চিম বিশ্ব এবং আশ্রয় পাওয়া শরণার্থীদের সামান্য অধিকারটুকু যে কোনো মুহূর্তে খর্ব করা হতে পারে। ছিনিয়ে নেওয়া হতে পারে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।