উপনিবেশবাদ : সভ্যতার খোলসে দাসত্ববোধ ও ধর্মবিশ্বাসকে চাপিয়ে দেওয়ার অন্য নাম

Expositions Maritime Museum in Madrid history of the Spanish Navy ship models historical artifacts .
Expositions Maritime Museum in Madrid history of the Spanish Navy ship models historical artifacts . Photo 176899201 © - Dreamstime.com

 ফ্লোরা সরকারের “বন্ধুর বেশে আসা শত্রুর এক নির্মম ছবি” শিরোনামের একটি লেখা পড়ে জানতে পারি “উই কাম আ্যাজ ফ্রেন্ডস” নামের প্রামাণ্যচিত্রটির কথা। নির্মাতা হবার্ট সপার। পড়ে বুঝতে পারি এটির বিষয়বস্তু হচ্ছে উপনিবেশবাদের রূপ ও স্বরূপ তুলে ধরা। পশ্চিমাদের উপনিবেশবাদী আগ্রাসন কীভাবে উপনিবেশিত জাতিগোষ্ঠীকে শোষন করে, তাদেরকে কী কী কায়দায় নিজেদের মানসিক দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে রাখে, অথচ তারা টেরই পাই না, এমনকি উল্টো সেই ঔপনিবেশিকতাকে মনেপ্রাণে কামনা করে এবং ঔপনিবেশিক দখলদার বাহিনীকে বন্ধুরূপে আমন্ত্রণ জানাতে থাকে অবলীলায়। তারা এমনটা কেন করে? করে কারণ, উপনিবেশকবলিত সেই জাতিগোষ্ঠী এতোই আত্মবিস্মৃত এবং হীনম্মণ্য হয়ে ওঠে যে, উপনিবেশবাদকেই তারা তখন নিজেদের জন্য আশীর্বাদ মনে করে, জ্ঞান করে মুক্তির স্বর্গদূত।

বস্তুত, উপনিবেশবাদী শক্তি উপনিবেশিত মানুষের উপর জবরদখলের মাধ্যমে আগ্রাসন চালালেও পরবর্তী সময়ে তারা তাদের আগ্রাসন প্রক্রিয়া ও ধরণ পাল্টে ফেলে। তারা নতুন করে চালু করে বহুমাত্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসন। এর মাধ্যমে তারা মানুষের মনমগজ পুরোপুরি ধোলাই করে ফেলে। ফলে ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে গণমানুষের পুঞ্জিভূত ক্ষোভস্পৃহা ধীরে ধীরে লোপ পায়। তাদের মনোজগতের রদবদল ঘটে। সেই বদল সাধারণ কোনো পরিবর্তনে সীমাবদ্ধ থাকে না, তাদেরকে পর্যবসিত করে চরম হীনমন্যতায়। একপর্যায়ে তারা প্রচণ্ড অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাধ্য হয়ে সঁপে দেয় নিজেদের। মেনে নেয় উপনিবেশ। গ্রহণ করে নেয় উপনিবেশবাদী প্রভূদের দাসত্ব…

ছবিটির প্রেক্ষাপট উপনিবেশ কবলিত দক্ষিণ সুদান। ছবির শুরুতেই সুদানের একটি গ্রামের বয়স্ক গ্রাম-প্রধান কামরু নামের লোকটি তার গ্রামের মানুষদেরকে ঔপনিবেশিক শক্তিধরদের উপনিবেশবাদী তৎপরতার কথা বলতে গিয়ে বলেন: তোমাদের একটা কথা জানিয়ে রাখি—ইউরোপ আমেরিকার মানুষেরা ঘর থেকে বেরিয়ে পড়তো পৃথিবীর নানা দেশে এবং সেসব দেশগুলোকে জোরপূর্বক দখল নিয়ে তারা উপনিবেশ স্থাপন করতো। দখলকৃত সেসব দেশে প্রচুর যুদ্ধের পর তারা আফ্রিকা মহাদেশকে টুকরো টুকরো করলো৷ যেমন সুদান, উগান্ডা, নাইজেরিয়া ইত্যাদি। তারপর তারা এসব দেশের নাম দিল মুক্ত বা স্বাধীন জাতি..”

বলেছি যে, উপনিবেশবাদ কেবল চিন্তা ও মনোজগতের পরিবর্তন করেই ক্ষান্ত দেয় না, বরং মনের ভেতর জন্মায় হীনমন্যতাবোধ, যার অনিবার্য পরিণতি হয় দাসত্ববরণ। এই বাস্তবতাকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলে হবার্ট সপার, এক উপনিবেশগ্রস্ত সুদানি নাগরিকের সাথে কথোপকথনের মধ্য দিয়ে।

সুদানি : আমরা চাই আমাদের এখানে বাইরে থেকে কেউ এসে আমাদের দেশটাকে আরও ভালো করে গড়ে তুলুক।

হুবার্ট : যেমন?

সুদানি : এই যেমন খাবার পানি। তোমাদের মতো লোকেরা এসে আমাদেরকে পরিস্কার পানি খাওয়া শিখিয়েছে। তোমরা তো আসো আমাদের শিক্ষা দীক্ষা দিতে, উৎপাদনে সাহায্য করতে।

হুবার্ট: তোমাদের এই এলাকায় একটা এয়ারপোর্ট করে দিলে কেমন হয়?

সুদানি: খুব ভালো হয়। আমাদের এখানে এয়ারপোর্ট হলে, এয়ারপোর্ট পরিস্কার করার জন্যে আমাদের কত মানুষ চাকরি পাবে।

হুবার্ট : আমরা এয়ারপোর্ট বানিয়ে দিবো আর তোমাদের জনগন সেটা পরিস্কার করবে শুধু?

সুদানি : অবশ্যই, আমাদের ক্লিনাররা সেখানে কাজ পাবে। আমরা তোমাদের সেজন্যে বিনা পয়সায় জমি দিতে রাজি। সরকার হয়তো কিছু টাকা নিবে নামমাত্র। সেটা শুধু একটা ডকুমেন্ট রাখার জন্য।

দেখুন, উপনিবেশিত মানুষের মানসিক দাসত্ববোধের কী করুণ অভিব্যক্তি। ভাবা যায় কী!

বস্তুত, জনগণ বুঝতেই পারে না যে, উপনিবেশবাদীরা আসলে বন্ধু নয়, বরং বন্ধুর বেশে মুখোশপরা শত্রু। সাধারণ মানুষের সরলতা বা মূর্খতার আশ্রয় নিয়ে, কলে-কৌশলে উপনিবেশিত জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব  সবকিছুই তলে তলে নিঃশেষ করে ফেলে। বাতিল করে দেয় তাদের ইতিহাস ঐতিহ্য, শিক্ষা সংস্কৃতি। বিপরীতে তাদের উপর চাপিয়ে দেয় নিজেদের কৃষ্টি-কালচার। এরা স্কুল খুলে দিবে, পড়াবে নিজেদের (আধুনিক?) সিলেবাস। গায়ে পরিয়ে দিবে নিজেদের পোশাক। আর বলবে, “তোমরা যদি এই পোশাক পরো, তবে তোমাদের দেখতে ‘স্মার্ট’ লাগে। স্কুলের পোশাক ছাড়া তোমরা আসতে পারবে না। শাস্তি খাবে আসলে। এমনকি, স্কুলের পোশাক না পরলে তোমরা মানুষ হিসেবেই গণ্য হতে পারবে না। ”

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে, এটাতো ভাল। পোশাক তো সভ্যতা। পোশাকহীনতা অসভ্যতা। কিন্তু, এর ভেতর-বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমেরিকার খ্রিস্ট্রান মিশনারী থেকে আগত এক নারী এবং পুরুষের পারস্পরিক আলাপচারিতার মধ্য দিয়ে পোশাকের অন্তরালের রাজনীতিকে তুলে ধরেন চৌকস নির্মাতা হুবার্ট সপার। যার সারমর্ম হচ্ছে এই, বাইবেলে বর্ণিত আদম ও হাওয়া যখন উলঙ্গ ছিল, তখন তাদের লজ্জা নামের কোনো অনুভূতি ছিল না। কিন্তু গন্ধব ফলটা খাওয়ার পরই তাদের দৃষ্টি খুলে যায় এবং তারা বুঝতে পারে তারা নগ্ন ছিল। অর্থাৎ তারা সভ্যতার খোলস লাগিয়ে কৌশলে নিজেদের ধর্মবিশ্বাসকেই চাপিয়ে দিচ্ছে তাদের অজান্তেই এবং নিজেদেরকে জাহির করছে এই বলে যে,  লজ্জানুভূতির পরোয়া একমাত্র সাদা চামড়ার খ্রিষ্টান শেতাঙ্গরাই করে এবং করেছে। তাই শেতাঙ্গরাই একমাত্র সভ্য! তারা যা করে, যেমনকরে করে তাই সভ্যতা!

আশ্চর্য হয়ে আমি ভাবি, যদি তাদের দৃষ্টিতে পোশাকের গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য এতই বেশি, তবে তারা আজ পোশাকশূন্য উলঙ্গ কেন? কেন তারা আজ পোশাককে নয়, পোশাকহীনতাকেই সভ্যতার মাপকাঠি করে নিয়েছে? যেখানে উপনিবেশিত কালোরা পোশাক না পরলে মানুষের কাতারেও থাকতে পারছে না? কেন এই অস্বাভাবিক বিবর্তন? অমানবিক অধঃপতন?

কিছু কিছু মানুষ অবশ্য তাদের খপ্পরে পড়ে একেবারে হারিয়ে যায় না। তারা ঠিকঠিক বুঝতে পারে কি হচ্ছে। দেশ ও দেশের মানুষ কোনদিকে যাচ্ছে। তারা অতঃপর সইতে না পেরে মুখ ফুঁড়ে বলে উঠে, প্রতিবাদ করে। জীবন বাজি রেখে উপনিবেশের বিরূদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কিন্তু, পরগাছা হয়েও প্রতিষ্ঠিত, অস্ত্রসস্ত্রের অধিকারী উপনিবেশিক শক্তি ও শাসনের রোষানলে পড়তে হয় তাদের। ফলে তারা হয় গুম, হত্যা। হতে হয় নির্যাতন, নিপীড়ন এবং নির্বাসননের নির্মম শিকার। এমনই এক সুদানি গায়িকা, যাকে তার গানের জন্য স্বদেশছাড়া হতে হয়, সে জানায়, ‘ব্রিটিশরা আমাদের সংবিধান রচনা করে দিয়েছিল। তাদের ডান হাতে থাকে বাইবেল আর বাম হাতে থাকে অস্ত্র।’

সভ্যতা, উন্নয়ন এবং স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে আগমনকারী উপনিবেশবাদীরা গোপনে গোপনে লুটপাট করে নিয়ে যায় দেশের সমস্ত সম্পদ। দেশকে, দেশের মানুষকে সবদিক থেকেই করে দেয় পঙ্গু, এমনকি তাদের স্বাভাবিক জীবনকেও করে দেয় পুরোপুরি বিপর্যস্ত। সেই গ্রাম প্রধান কামুরুর মুখেই কিছু শুনা যাক— “আমরা আমাদের জমি চাষ করতাম ফসল উৎপাদনের জন্যে। আমাদের সব জমি এখন তেল কোম্পানির অধীনে চলে গেছে। তাদের অধীনেই শুধু যায় নাই, আমাদের পানি পর্যন্ত ওরা বিষাক্ত করে দিয়েছে। আমরা এখন এ পানি আর পান করতে পারি না। পান করলেই অবধারিতভাবে মৃত্যু। তেলের মিশ্রণে এসব পানি বিষাক্ত হয়ে গেছে। মাটির নিচে গভীর খননের কারণে এসব হচ্ছে। ”

এই হচ্ছে উপনিবেশবাদী সভ্যতার, আধুনিকতা,  উন্নয়ন ও প্রগতির উৎকৃষ্ট উদাহরণ। হ্যাঁ, এভাবেই তারা উপনিবেশিত জাতির উন্নতি সাধন করে! তাদেরকে সভ্য বানায়! স্বাধীনতা শেখায়! মুক্তি দেয়!

লেখক: কাজী একরাম

লেখক পরিচিতি : শিক্ষার্থী, মাহাদুল ফিকরি ওয়াদদিরাসাতিল ইসলামিয়াহ, ঢাকা। ধর্মতত্ত্ব ও গবেষণাকেন্দ্র।