উপনিবেশের জাল ছিঁড়ে আজকের সুরিনামের জীবনযাপন

আমেরিকা Contributor
ফিচার
সুরিনাম
Exterior view to Keizerstraat mosque in Paramaribo, Suriname. © Sergey Mayorov | Dreamstime.com

ফ্লোরিডার সমান আয়তনের দেশ সুরিনামে বর্তমানে অন্তত ৫ লক্ষ মানুষের বাস। এর পশ্চিমে রয়েছে গুয়ানা, পূর্বে ফ্রেঞ্চ গুয়ানা এবং এর দক্ষিণে অবস্থিত সুবিশাল ব্রাজিল। এই দেশের রাজধানীর নাম পারামারিবো। রাস্তার ধারের বিভিন্ন সঙ্কেতে ডাচেদের প্রভাব আছে, কিন্তু রাস্তায় চলাচলের জন্য রাস্তার বামদিকই ব্যবহৃত হয় – ঠিক নেপোলিয়ান পূর্ববর্তী নেদারল্যান্ডের মতো।

পারামারিবো নিরক্ষরেখার ৬ ডিগ্রি উপরে অবস্থিত, তাই দুপুরে এখানে নিজের ছায়া পায়ের নীচে চলে আসে। সুরিনাম নদীর মোহনা এবং অ্যাটলান্টিক মহাসাগরের তীর থেকে এই শহর ২৩ কিমি দূরে অবস্থিত। এখানে দেশের দুই তৃতীয়াংশ লোকের বাস এবং সংযুক্ত রাষ্ট্রপুঞ্জ একে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে গণ্য করে, কারণ এই শহর সুরিনামের বহু সাংস্কৃতিক সমাজকে প্রতিফলিত করে।

বিভিন্ন দেশের মানুষ যে এই শহরে ছড়িয়ে আছেন, তা শহরতলিতে ঘোরাফেরা করলেই বোঝা যায়। এশিয়া, আফ্রিকা, অ্যামাজনের ভিতরের অংশের, ইন্দোনেশিয়ার বাসিন্দা ও ভারতীয়দের এখানে আকছার দেখা যায়। ২০১২ সালের আদমসুমারি অনুযায়ী, এখানে বসবাসকারী জনসংখ্যার অর্ধেক ক্রিস্টান, ২২ শতাংশ হিন্দু, ১৪ শতাংশ মুসলিম আর ২ শতাংশ উইন্টি (দেশীয় জাতি) এবং মাত্র ২০০ ইহুদীর বাস। এখানে সরকারি ভাষা ডাচ হলেও স্থানীয় ভাষা হল স্রানান্টোঙ্গো। এটি বহু প্রাচীন ভাষা, দাসেরা নিজেদের মধ্যে কথা বলার জন্য এর ব্যবহার করত – তাই এর মধ্যে আফ্রিকান ভাষার পাশাপাশি ইংরেজি, ডাচ এবং পর্তুগিজ ভাষার মিশ্রণ আছে।

সুরিনাম অঞ্চলের ইতিহাস 

অধুনা গুয়ানাতে স্প্যানিশরা এসেছিল পঞ্চদশ শতাব্দীতে। তাঁরা এক ক্ষমতাশালী ইনকা রাজার গল্প শুনে প্রভাবিত হয়েছিল, যিনি সোনার পবিত্র জলাশয়ে স্নান করতেন এবং তিনি নিজের মাথা থেকে পা পর্যন্ত সোনায় মুড়ে রাখতেন। মূলত সেই রাজা এবং তাঁর স্বর্ণময় রাজত্বের খোঁজেই এই দেশে বিদেশীদের প্রথম পদার্পণ হয়।

স্যার ওয়াল্টার রেলি ১৫৯৬ সালে একটি বই প্রকাশ করেন – দ্য ডিসকভারি অফ দ্য লার্জ রিচ বিউটিফুল এম্পায়ার অফ গোভিনা, উইথ আ রিলেশন অফ দ্য গ্রেট এন্ড গোল্ডেন সিটি অফ মনোয়া (যাকে স্প্যানিশরা এল ডোরাডো বলত)। সপ্তদশ শতাব্দীতে উইলিয়াম ব্লেউয়ের আঁকা ম্যাপে মনোয়ার অবস্থান ছিল, উত্তরে অরিনোকো নদী আর দক্ষিণে অ্যামাজনের মধ্যে কোথাও একটা। সেখানকার সোনার খোঁজ এখনো জারি রয়েছে।

ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি বারবাডোসের ব্রিটিশ গভর্নর লর্ড ফ্রান্সিস উইলোগবি তাঁর চিনির চাষ বাড়ানোর জন্য আরাওয়াক ইন্ডিয়ানদের সাথে সেখানে থাকার চুক্তি করেন এবং সুরিনাম নদীর ধারে একটি দূর্গ নির্মাণ করেন। এছাড়াও তিনি স্থানীয় আরও ৩০০০ ক্রীতদাসকে দিয়ে একটি চিনির কল তৈরি করেন।

সুরিনামের ঔপনিবেশিকতা 

১৬৬৪ সালে ইংরেজ এবং ডাচেরা সামুদ্রিক বাণিজ্যে আধিপত্য বজায় রাখার জন্য যুদ্ধ ঘোষণা করে। ডাচ নৌবাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয় সমস্ত ইংরেজ উপনিবেশ দখল করার জন্য। তারা সুরিনাম নদীতে প্রবেশ করে এবং প্রায় এক ঘণ্টা গোলাগুলি চলার পরে উইলোগবি আত্মসমর্পণ করেন। এই যুদ্ধ ১৬৬৭ সালে ব্রেডার চুক্তির পর শেষ হয়। এই চুক্তি অনুসারে, প্রত্যেক দেশ তাদের দখল করা উপনিবেশের উপরে দখল কায়েম রাখে, সুরিনাম ডাচেদের হয়ে যায় এবং ব্রিটিশরা নিউ অ্যামস্টারড্যাম নিজেদের দখলে রাখে। পরবর্তী কালে যার নামকরণ করা হয় নিউ ইয়র্ক। তখন শ্রমিক মানে শুধুই দাসদের বোঝানো হত।

পারামারিবোতে আগে সব কাঠের বাড়ি ছিল। ১৮২১ সালের এক অগ্নিকাণ্ডের জেরে ৪০০ জনের মৃত্যু হয়। ১৮৩২ সালে একদল ক্রীতদাস পালানোর পরিকল্পনা করে এবং যাত্রাপথের জন্য খাবার চুরি করতে যায়। সেই চুরি গোপন করতে তারা আগুন ধরিয়ে দেয়। কিন্তু তারা ধরা পরে, তাদের মধ্যে তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। যেখানে তারা আগুন ধরিয়েছিল, ঠিক সেখানেই তাদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়। সুরিনামের প্রতিটি স্কুলপড়ুয়া জানে যে, সেই তিন জনের নাম হল, কোজো, মেন্টর এবং প্রেজেন্ট। তাঁদের সেখানে জাতীয় বীরের মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে।

আজকের সুরিনাম 

সুরিনাম পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে কতটা আধুনিক হয়েছে, তার আরও একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। এখানে প্রথম থিয়েটার তৈরি হয়েছিল ১৭৭৫ সালে, এবং সেখানে কোনও ইহুদী এবং ক্রীতদাসের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। সেখান থেকে ১৯৪৩ সালে এই দেশ ঘোষণা করে যে, কোনও ইহুদী ইউরোপ ত্যাগ করতে চাইলে তাঁদের সুরিনামে স্বাগত জানানো হবে। সেই সময় বহু ইহুদী শরণার্থী এখানে আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং সরকার তাঁদের দায়িত্ব গ্রহণ করে।

১৮৬৩ সালের ১লা জুলাই এই দেশ দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়, যদিও স্বাধীনতার জন্য ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। ঐতিহাসিক এবং লেখক সিন্থিয়া ম্যাকলিওডের কথায়, “দাসত্ব ছিল একটা ভয়ানক প্রক্রিয়া, কিন্তু সেটি একটি প্রক্রিয়া ছিল। কারা এর পরেও বেঁচেছিল ? সবচেয়ে শক্তিশালীরা। কারা এই শক্তিশালী ব্যক্তি ? আমরা।”

Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.