শরিয়াহ সম্মত ওয়েব পরিবেশ. আরওসন্ধানকরুন
মতামত

উপমহাদেশের বুকে জ্বলতে থাকার হিংসার আগুন, ছয় শতাব্দী আগেই কারণ বিশ্লেষণ করে গিয়েছেন আরব ইতিহাসবিদ

Zeeshan R

ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তান তথা উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কোনও না কোনও নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর প্রতি বাড়তে থাকা  অত্যাচার প্রতিদিন খবরের কাগজের পাতা কিংবা টিভির পর্দা জুড়ে প্রাধান্য পাচ্ছে। এই মুহূর্তে ভারতের সংশোধিত নাগরিক আইন এবং তাতে মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের জায়গা না দেওয়ায় ফুঁসছে গোটা দেশ। ভারতের একাধিক শহরে চলছে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ-হিংসা। অন্যদিকে মিয়ানমারে, রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর অত্যাচার, চিনে উইগুর জাতির উপর নির্যাতন, পাকিস্তানে নিপীড়িত আহমদীয়া মুসলিম- এই সকল ঘটনায় সমাজের অবক্ষয় ও চরমপন্থী মানসিকতার দিকে আঙুল তোলে। এর বিশ্লেষণে আমরা বিভিন্ন পাশ্চাত্য দার্শনিক ও সমাজতত্ত্ববিদদের আলোচনার শরণাপন্ন হয়ে পড়ি। তবে ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে মধ্যযুগে উত্তর আফ্রিকায় এমন একজন বিদগ্ধ পন্ডিত ছিলেন যিনি সমাজ-ইতিহাস এবং তাকে কেন্দ্র করে চলতে থাকা বিজ্ঞানের বিশ্লেষণ করে গিয়েছেন যা আজকের আধুনিক যুগেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

অধ্যাপক লুডউইগ গুমপ্লায়িজ বলেন, ‘ইবনে খালদুন কোন পরিবারের উত্থান-পতন সম্পর্কে `তিন বংশ স্তরের` যে ধারণা দেন তা এখন অটোকার লরেঞ্জের কৃতিত্বের ভান্ডারে। অথচ লরেঞ্জের অনেক আগেই আরব দার্শনিক এই তত্ত্ব প্রচার করেছিলেন। বিস্ময়কর ব্যাপার ইবনে খালদুন সমর বিজ্ঞানের যেসব রীতি পদ্ধতি আলোচনা করেছিলেন ইউরোপীয়দের উত্থানের পুরো যুগে তাদের সেনাপতিরা সেসব রণকৌশল প্রয়োগ করেছেন। এছাড়া ম্যাকিয়াভেলি শাসকদের যেসব উপদেশ দিয়েছিলেন শতবর্ষ আগে ইবনে খালদুনও তা-ই লিপিবদ্ধ করে গিয়েছিলেন। অথচ তা কেউ জানত না।’

ইবনে খালদুন এমন এক যুগে জন্মেছিলেন যে যুগে ইসলামের শক্তি ও আধিপত্যে ভাঙ্গন শুরু হয়েছিল। ইসলামি চিন্তা ধারা হয়ে পড়েছিল অনাহুত, অবহেলিত। এজন্যে ইবনে খালদুনের রচনাবলী সাধারণের দৃষ্টির আড়ালে থেকে যায়। পাশ্চাত্যে ইবনে খালদুন পরিচিত হন ১৬৯৭ সালে। এর প্রায় শতাব্দী পরে ১৮০৬ সালে ফরাসী প্রাচ্য বিশেষজ্ঞ স্যাল ভেল্টার দ্য সাকি মুকাদ্দামার কয়েকটি পরিচ্ছেদ অনুবাদ সহ তার জীবনী ছাপেন। এরপর একজন অস্ট্রীয় প্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ভন হ্যামার পার্গস্টল (Von Hammer Purgstall: Thar Hunderten der Hidschort) ইসলামি শক্তির পতন সম্পর্কে ১৮১২ সালে একটি পুস্তক প্রকাশ করেন। এ পুস্তকে লেখক ইবনে খালদুনের রাষ্ট্রের পতন সম্পর্কীয় মতবাদ উল্লেখ করে তাকে ‘আরবীয় মন্টেস্কু (ফরাসি দার্শনিক)’ বলে অভিহিত করেছেন।

উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে ইউরোপের গবেষকদের কাছে ইবনে খালদুন পরিচিত হয়ে উঠতে শুরু করেন। এবার পাশ্চাত্য জানতে পারল ইসলামের ক্ষয়িষ্ণু সভ্যতার এই মহান গুণী সম্পর্কে। কারণ তিনি ইতিহাস রচনা করতে গিয়ে এমন সব অর্থনৈতিক, দার্শনিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক তত্ত্ব আবিষ্কার করেছেন যা পাশ্চাত্য জানতে পেরেছিল আরও কয়েক শতাব্দী পরে। তারা দেখতে পান ইবনে খালদুনের তত্ত্বগুলোই আলোচিত হয়েছে তার এক শতাব্দী পরে ম্যাকিয়ভেলির(১৪৬৯-১৫২৭) রচনায় এবং আরো তিন চার শতক পরের ভিকো (১৬৬৮-১৭৪৪), মন্টেস্কু (১৬৬৯-১৭৫৫), এ্যডাম স্মিথ (১৭২৩-১৭৯০), অগাস্ট ক্যোঁৎ (১৭৯৮-১৮৫৭) প্রমুখের রচনায়।

প্রথমে মনে করা হত পাশ্চাত্যের গবেষকরাই এ সব তত্ত্বগুলোর আবিষ্কর্তা। কিন্তু পরে গবেষণায় পাওয়া গেল গামবাতিস্তা ভিকোর পূর্বেই আরবীয় পন্ডিত ইবনে খালদুন ইতিহাসের দর্শন ও গতিপ্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। ভিকো নব বিজ্ঞান বা The new science বলে যে দাবি করেছেন তা আসলে উত্তর আফ্রিকার সেই রাজকর্মচারী ইবনে খালদুনের মাথায় ঢুকেছিল অনেক আগেই। অগাস্ট ক্যোঁৎ The new science নামে একটি শব্দ পাশ্চাত্যের অভিধানে সংযোজন করেন। কিন্তু তার পাঁচ শতাব্দী আগে প্রাচ্যের অভিধানে তা শোভা বর্ধন করেছিল। `আল উমরান` নামে একটি পরিভাষা। ইবনে খালদুন তার মতবাদসমূহ শুধু উপস্থাপন করেই ক্ষান্ত হননি, যুক্তিতর্কের মাধ্যমে সেসবকে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন।

ইবনে খলদুনের জন্ম তিউনিসিয়ার তিউনিস শহরে ১৩২৩ খ্রিস্টাব্দে। পুরো নাম ওয়ালী আল-দ্বীন আবদ আল-রাহমান ইবন মুহাম্মদ ইবন মুহাম্মদ ইবন আবি বকর মুহাম্মদ ইবন আল-হাসান ইবন খালদুন। তাঁর সবথেকে জনপ্রিয় গ্রন্থ মুকাদ্দিমা তিনি লিখেছেন ১৩৭৭ সালে। মুকাদ্দিমা অর্থ সূচনা। অনেক আধুনিক চিন্তাবিদ মুকাদ্দিমাকে ইতিহাসের দর্শনগ্রন্থ হিসেবে দেখতে চান। অনেকে বলেন, এটি সমাজবিজ্ঞানের প্রথম বই। সামাজিক ডারউইনবাদের সূচনাগ্রন্থ বলেও মনে করেন কেউ কেউ। অর্থনীতিকেও পথ দেখিয়েছে মুকাদ্দিমা। এতে রাজনীতির তত্ত্বকথা আছে, প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের প্রসঙ্গও আছে, আছে রসায়ন।

খালদুন মুকাদ্দিমা শুরুই করেছেন সাতটি ভুল সম্পর্কে সতর্ক করার মধ্যে দিয়ে, যা সচরাচর ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে করা হয়ে থাকে—

নির্দিষ্ট সম্প্রদায় বা মতবাদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব, তথ্যের উৎস সম্পর্কে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, উদ্দেশ্য সম্পর্কে বোঝার ব্যর্থতা, সত্য সম্পর্কে ভুল বিশ্বাস, কোনো ঘটনাকে বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে উপস্থাপনের অক্ষমতা, উচ্চপদস্থদের প্রশংসা করে তাদের আনুকূল্য লাভের চেষ্টা, সর্বোপরি মানবসমাজের অগ্রগতির গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে উদাসীনতা। ছয় শতাব্দী আগে ইবনে খালদুন বলেছিলেন, ইতিহাস চক্রাকারে ঘোরে। একটি বংশধারার প্রতিনিধিত্ব তিন প্রজন্ম স্থায়ী হয়। এরপর তাদের সমৃদ্ধশালী যুগের অবসান ঘটে। একটি বংশধারার অনুসারীদের মধ্যে অভিন্ন উদ্দেশ্যের চেতনা যত দিন উজ্জীবিত থাকে এবং যত দিন তারা ন্যায়বিচারের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত থাকেন এবং তাদের মধ্যে সংহতি থাকে তত দিন তাদের অবস্থা ভালো থাকে। কিন্তু অপর একটি গ্রুপের সাথে দ্বন্দ্ব শুরু হওয়ার পর নতুন বংশধারার উন্মেষ ঘটার আলামত শুরু হতে দেখা যায়।

বর্তমানে আরব দেশগুলি, মিশর, লিবিয়া, সিরিয়া প্রভৃতিতে স্বৈরীশাসকদের অপসারণ, গণঅভ্যুত্থান এবং গণতন্ত্র স্থাপন খালদুনের দর্শনকেই মনে করায়। এ ছাড়া ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশেও আমরা বংশানুক্রমিক রাষ্ট্রপ্রধানের উত্থান-পতন লক্ষ করেছি। যেখানে জন জাগরণের মূল কারণ শাসকের দুর্নীতি। মুকাদ্দিমায় ইবনে খালদুন জানিয়েছিলেন, শাসক যখন তাঁর উৎপাদন মূলক কাজ থেকে বিরত থাকে, বিলাস বহুল জীবন জাপান করে, পরামর্শ না নেয়, জনগণের উপর অত্যাচার চালু করে তখন সেই শাসক বা সভ্যতার ধ্বংস হয়।  এর একটি অর্থনৈতিক দিক বিশ্লেষণ করেছেন খালদুন। তিনি দাবি করেন, রাজবংশের তিন প্রজন্ম স্থায়িত্বের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে দেশের করব্যবস্থার সঙ্গে। শুরুর দিকে একটা সাম্রাজ্যের করের হার কম থাকে কিন্তু রাজস্ব আয়ের পরিমাণ থাকে বেশি। অন্যদিকে সাম্রাজ্যের পতনকালে করের হার বেশি থাকে কিন্তু রাজস্ব আয়ের পরিমাণ থাকে কম।

সত্যিকার অর্থে, ইসলামী আইন অনুযায়ী, ধর্মীয়বিধান করের স্বল্পতাকে নির্দেশ করে। যাকাতের পরিমাণ সঞ্চিত সম্পদের (স্বর্ণ, রৌপ্য বা মুদ্রা) উপর মাত্র ২.৫ শতাংশ এবং এই কর গরীবদের জন্য, সরকারে জন্য নয়। অন্যান্য করসমূহ যেমন — ভূমি কর, মাথাপিছু ধার্য কর ঐতিহাসিকভাবে মুসলিম বিশ্বে কখনোই কঠোর ছিলনা। ইবনে খালদুনের বক্তব্য হচ্ছে, একটি সরকার তখনই বেশি সফলতার মুখ দেখবে যখন তা ইসলামী নীতিমালা মেনে চলে এবং জনগণের উপর অতিরিক্ত কর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা না করে।

Related articles
মতামত মতামত
Zeeshan R

সুচিন্তিত বিবেচনার মাধ্যমে ভিন্ন চিন্তাধারাকে সহনীয় পর্যায়ে স্থান দেয়ার নাম পরমতসহিষ্ণুতা। রাষ্ট্রের সব শ্রেণী, পেশা, দলমত ও সব ধর্মের অনুসারীদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহনশীলতা প্রদর্শনও এর অন্তর্ভুক্ত। এটি গণতন্ত্রের অন্যতম নিয়ামকও। কোনো সমাজে ভিন্নমতের অনুশীলন ও চর্চা না হলে সে সমাজকে সভ্য ও গণতান্ত্রিক বলার সুযোগ থাকে না। যে সমাজে ভিন্নমতের কদর নেই, সেখানে গণতন্ত্রও নেই। দার্শনিক ভলতেয়ায়ের ভাষায়, ‘আমি তোমার সাথে দ্বিমত পোষণ করতে পারি, কিন্তু তোমার মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষার জন্য আমি জীবন দিতেও কুণ্ঠিত নই।’ মূলত এটিই গণতন্ত্র ও সভ্যতার মানদণ্ড।

চলবে চলবে