উমর বিন আব্দুল আজিজ: ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক (২য় পর্ব)

Caliph Umar Ibn Khattab sur sa terrasse, surveillant son peuple
https://onlinemagazinepk.wordpress.com/2017/12/07/the-true-life-history-you-need-to-know-about-umars-caliphate/

দ্বিতীয় ও অন্তিম পর্ব 

নিজ গৃহ ও রাজ পরিবারে আমূল সংশোধন আনার পর তিনি মন দেন রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংশোধনের দিকে। তৈরি করেন দক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থা। রাষ্ট্র ব্যবস্থায় তিনি যেসকল সংশোধন আনেন সেগুলি নিম্নরূপঃ

– অত্যাচারী গভর্ণরদেরকে বরখাস্ত করেন।

– গভর্ণরের দায়িত্ব পালনের জন্য সৎ লোকদেরকে অনুসন্ধান করে বের করে আনেন।

– যে সব প্রশাসনিক কর্মচারীবৃন্দ নিয়মবহির্ভূতভাবে প্রজা সাধারণের জান মাল, ইজ্জত আব্রুর ওপর অনধিকার হস্তক্ষেপ করেছিল তাদেরকে তিনি আইনের আওতায় নিয়ে আসেন এবং আইনের শাসন বাস্তবায়ন করেন।

– রাষ্ট্রীয় কোষাগার বাইতুল মালে কর নির্ধারণ ও কর জমা করার সব নিয়ম-নীতি পরিবর্তন করেন।

-আবগারী করসহ বনি উমাইয়া প্রশাসকগণ যে সব অবৈধ ও অন্যায় কর নির্ধারণ করেছিলেন; তিনি ক্ষমতারোহনের সঙ্গে সঙ্গে তা বাতিল করে দেন।

– যাকাত আদায়ের যে ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল, তা নতুনভাবে সংশোধণ করেন।

– বায়তুল মালের অর্থকে সাধারণ মুসলমানের কল্যাণের জন্য ওয়াকফ করে দেন।

– রাষ্ট্রের অমুসলিম প্রজাদের সঙ্গে যে সব অন্যায় আচরণ করা হয়েছিল, তার প্রতিকার করেন।

– অমুসলিমদের যে সকল উপাসনালয় অন্যায়ভাবে দখল করা হয়েছিল, সেগুলো তাদেরকে ফিরিয়ে দেন।

– অমুসলিমদের যে সব জমি ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিল, তাও তিনি তাদেরকে ফিরিয়ে দেন।

– ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে তাদের প্রাপ্য যাবতীয় সুবিধা প্রদান করেন।

– রাষ্ট্রের বিচার বিভাগকে সরকারের শাসন বিভাগের অধীনতা থেকে মুক্ত করেন।

– ইসলামি নীতির ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতে সরকারি হস্তক্ষেপকে প্রভাবমুক্ত করেন।

আর এভাবেই হজরত উমর বিন আব্দুল আজিজ (রহঃ) রাষ্ট্র ব্যবস্থা সুন্দর, সুসজ্জিত ও সুসংহত করতে ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা পরিপূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠা ও পুনরুজ্জীবিত করেন।

তাঁর অল্প দিনের শাসন ব্যবস্থায় অর্ধ শতাব্দীর জাহেলি রীতিনীতি সব অপসারিত হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যায় বিকৃত আকিদা-বিশ্বাসের প্রচার ও প্রসার। ব্যাপকভাবে জনগণের দ্বীনি শিক্ষার ব্যবস্থা চালু করা হয়। কুরআন হাদিস ও ইলমে ফিকহ এর শিক্ষা ব্যবস্থা বুদ্ধিজীবী শ্রেণীকে আকৃষ্ট করে।

যার ফলে তাঁর শাসনযুগ ও তাঁর শাসনযুগের পরে ইমাম আবু হানিফা (রহঃ), ইমাম মালিক (রহঃ), ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) ও আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহঃ) প্রমুখের মতো জগৎ বিখ্যাত ইমামদের আবির্ভাব ঘটে।

হজরত উমর ইবনে আব্দুল আজিজ (রহঃ) এর ক্ষমতাকালে রাজ্যের ইলমের অবস্থা এতটাই উন্নত হয় যে, ৪ জন লোক একত্রিত হলেই সেখানে নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত ও কুরআন-সুন্নাহ সম্পর্কিত আলোচনা শুরু হয়ে যেত।

হজরত উমর ইবনে আব্দুল আজিজ (রহঃ) এর সময়ে পাশ্ববর্তী অনেক রাষ্ট্র ইসলাম গ্রহণ করে। ইসলামের প্রভাবে মুসলমান হয় অসংখ্য মানুষ। যার প্রভাব পড়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে। দীর্ঘ দিন ধরে সংঘাত লেগে থাকা রোম সম্রাজ্যের ওপর এর বিরাট নৈতিক প্রভাব পড়েছিল।

হজরত উমর ইবনে আব্দুল আজিজ (রহঃ) এর মৃত্যুর পর রোমান সম্রাটের মন্তব্য থেকেই তা অনুমিত হয়। রোমান সম্রাট উমর বিন আব্দুল আজিজ (রহঃ) সম্পর্কে বলেছিল, “কোনো সংসার বৈরাগী যদি সংসার ত্যাগ করে নিজের দরজা বন্ধ করে নেয় এবং ইবাদতে মশগুল হয়; তাহলে আমি তাতে মোটেই অবাক হই না। কিন্তু আমি অবাক হই সে লোকের ব্যাপারে, যার পদতলে ছিল দুনিয়ার বিপুল ধন-সম্পদ; আর সে তা হেলায় ঠেলে ফেলে দিয়ে ফকিরের ন্যায় জীবন-যাপন করে।”

কিন্তু তাঁর এ ন্যায় শাসনের বারিধারা অব্যাহত থাকেনি বেশি দিন। কারণ এত কঠিন ন্যায়নিষ্ঠার সঙ্গে জীবনযাপন করা উমাইয়া বংশের অন্য শাসকদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাঁর শাসনকাল ছিল মাত্র দুই বছর পাঁচ মাস। উমাইয়া শাসকদের ষড়যন্ত্রে অবশেষে ১০১ হিজরিতে বিষ প্রয়োগের কারণে মুসলিম উম্মাহর মহান খলিফা উমর বিন আবদুল আজিজ (রহঃ) মৃত্যুবরণ করেন। তখন তাঁর বয়স ছিল ৩৯ বছর পাঁচ মাস চার দিন।

আড়াই বছরের সংক্ষিপ্ত রাষ্ট্র ক্ষমতায় তাঁর সম্রাজ্যে বিশাল পরিবর্তন সাধিত হয়। উমাইয়া বংশের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে বিপ্লবী বিজয়ী বীর হজরত উমর ইবনে আব্দুল আজি(রহঃ) কে বিষ পান করিয়ে ১০১ হিজরিতে হত্যা করা হয়। ৩৯ বছর বয়সে মুসলিম মিল্লাতের এ নিঃস্বার্থ খাদেম হজরত উমর ইবনে আব্দুল আজিজ দুনিয়া থেকে বিদায় নেন।

আল্লাহ তাআলা তাঁকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন। বিশ্বের প্রতিটি শাসককেই তাঁর আদর্শ ও অনুপ্রেরণ গ্রহণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।