উমর বিন আব্দুল আজিজ: ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক (১ম পর্ব)

Caliph Umar Ibn Khattab sur sa terrasse, surveillant son peuple
https://onlinemagazinepk.wordpress.com/2017/12/07/the-true-life-history-you-need-to-know-about-umars-caliphate/

পর্ব-০১ 

ইসলামের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ শাসকদের অন্যতম হলেন উমর বিন আবদুল আজিজ (রহঃ)। খোদাভীতি, বিচক্ষণতা, সাহসিকতাসহ সাহাবাদের অনন্য গুণাবলির সমন্বয় ঘটেছিল তাঁর মাঝে। তাই অনেকে তাঁকে ইসলামের পঞ্চম খলিফা বলে খোলাফায়ে রাশেদার মধ্যে গণ্য করেন।

ইসলামের প্রথম মুজাদ্দিদ হলেন উমর বিন আব্দুল আজিজ (রহঃ)। ৬১ হিজরিতে মদিনায় এক রাজ পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। প্রাপ্ত বয়স্ক হয়ে তিনি দেখতে পান যে, তাঁর পিতা মিসরের ন্যায় বিশাল সম্রাজ্যের গর্ভনর। তাঁর পিতা আবদুল আজিজ বিন হাকাম ছিলেন বনি উমাইয়ার শ্রেষ্ঠ গভর্নরদের অন্যতম। ২০ বছরেরও বেশি সময় মিসরের তিনি শাসক ছিলেন তিনি। বয়ঃপ্রাপ্ত হলে উমর বিন আব্দুল আজিজ (রহঃ) নিজেই উমাইয়া সরকারের অধীনে গভর্ণর নিযুক্ত হন।

বনু উমাইয়া বাদশাহগণ যে সব জায়গীরের সাহায্যে নিজেদের খান্দানকে বিপুল অর্থ বিত্তের মালিক করেছিলেন তাতে তাঁর এবং তাঁর পরিবার-পরিজনেরও বিরাট অংশ ছিল। এমনকি তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদের বার্ষিক আয় ছিল প্রায় ৫০ হাজার আশরাফি।

খলিফা হওয়ার পূর্বে তিনি বিত্তশালীদের ন্যায় শান-শওকত পূর্ণ জীবন-যাপন করতেন। পোশাক-পরিচ্ছেদ, খানা-পিনা, বাড়ি-ঘর, যান-বাহন, স্বভাব-চরিত্র সবই ছিল রাজপুত্রের ন্যায়।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, পরবর্তীকালে তিনি যে কাজ সম্পাদন করেন তার সঙ্গে তার পরিবেশের কোনো দূরতম সম্পর্কও ছিল না।

তাঁর মাতা ছিলেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু’র পৌত্রী। তিনি প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওফাতের ৫০ বছর পর ৬১ হিজরিতে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর রাজত্বের সময়কালে অসংখ্য সাহাবা ও তাবেঈ জীবিত ছিল।

ইলমে হাদিস ও ফিকহের ওপর তাঁর গভীর পাণ্ডিত্য ছিল। যে কারণে রাষ্ট্র পরিচালনায় যে কোনো সংযোজন বিয়োজনে ক্ষতি ও উপকারের দিকগুলো তাঁর ভালোই জানা ছিল। তবে তাঁর রাষ্ট্র ক্ষমতায় প্রতিপত্তি ও প্রভাব বিস্তার করার মতো লোকও তাঁর বংশ ও পরিবারে বিদ্যমান ছিল।

কারণ এ প্রভাব বিস্তার করতে পারলে তাঁর ও তাঁর পরিবার এবং বংশের ব্যক্তি স্বার্থ ও লালসা আর ভবিষ্যৎ বংশধরদের দুনিয়ার যাবতীয় কল্যাণে উপকার লাভ হত। যেমনটি করেছিল অত্যাচারী শাসক ফেরাউন। ৩৭ বছর বয়সী ওমর ইবনে আব্দুল আজিজেরও এমনটি হওয়া ছিল স্বাভাবিক।

কিন্তু তিনি ৩৭ বছর বয়সে ঘটনাক্রমে যখন রাজ তখতের অধিকারী হন এবং অনুভব করতে পারেন যে, ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির বিশাল দায়িত্ব তাঁর কাঁধে চেপেছে, তখন তাঁর জীবনধারা পাল্টে যায়। বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করেই তিনি ইসলামের পথ বেছে নেন। যেন এটি ছিল তাঁর পূর্ব গৃহীত সিদ্ধান্ত।

বংশানুক্রমিকভাবে তিনি রাজ তখতের দায়িত্ব লাভ করেন। কিন্তু বাইয়াত তথা আনুগত্য গ্রহণ করার সময় তিনি জনসমাবেশে সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন যে, ‘আমি তোমাদেরকে আমার বাইয়াত থেকে মুক্ত করে দিচ্ছি। তোমরা নিজেদের ইচ্ছা মতো কাউকে খলিফা নির্বাচন করে নিতে পার। অতঃপর জনগণ সর্বসম্মতভাবে এবং সাগ্রহে বলল যে, ‘আমরা আপনাকেই নির্বাচন করছি’, তখনই তিনি স্বহস্তে খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

ক্ষমতার মসনদে আরোহন করেই তিনি রাষ্ট্রীয় সংস্কার কাজে হাত দেন। প্রথমেই তিনি জাকজমকপূর্ণ রাজকীয় ফেরাউন, কিসরা ও কাইসার সরকারদের রাষ্ট্রীয় নিয়মনীতি বন্ধ করে দেন। প্রথম দিনেই তিনি রাজযোগ্য সবকিছুই পরিত্যাগ করে মুসলমানদের মধ্যে তাদের খলিফা পরিচালিত শাসন পদ্ধতি চালু করেন।

রাষ্ট্র ক্ষমতায় আরোহন করে তিনি যে সব কার্যক্রমগুলো পরিচালনা করেন তার মধ্যে অন্যতম হলো রাজ পরিবারের সংশোধন।

-রাজবংশের লোকদের দিকে তিনি দৃষ্টি দেন। তাদেরকে সব দিক থেকে সাধারণ মুসলমানদের পর্যায়ে নিয়ে আসেন।

-তাঁর নিজের জায়গীরসহ অন্যদের যে সব জায়গীর রাজবংশের দখলে ছিল তার সবগুলো রাষ্ট্রীয় কোষাগার বায়তুল মালে জমা দেন।

এ অভাবনীয় পরিবর্তনের ফলে যা ঘটে তা হলো- ‘তাঁর বার্ষিক আয় ৫০ হাজার আশরাফি থেকে নেমে তা ২ হাজার আশরাফিতে পৌছে।’

-বায়তুল মালের অর্থ তিনি তাঁর নিজের ও নিজ খান্দানের জন্য হারাম করে দেন। এমনকি খলিফা হিসেবে তিনি রাজ ভাণ্ডার থেকে বেতনও গ্রহণ করতেন না।

রাজত্ব লাভ করার পর তিনি তার নিজের জীবনধারণ পদ্ধতিই পরিবর্তন করে ফেলেন। যেখানে রাষ্ট্র প্রধান হওয়ার আগে তিনি শান-শওকতপূর্ণ জীবন-যান করতেন; সেখানে খলিফা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি গরিবি হালে চলে যান।

খলিফা হওয়ার আগে যেখানে তিনি হাজার দিরহাম মূল্যের পোশাকও তাঁর পছন্দ হতো না সেখানে খলিফা হওয়ার পর তিনি ৪/৫ দিরহাম মূল্যের পোশাককেও তিনি নিজের জন্য অনেক দামি মনে করতেন।

(চলবে)