উম্মাহর বিভক্তি মুসলমানদের দুর্বলতা

মুসলিম উম্মাহর গুরুত্ব অপরিসীম। মুসলিম উম্মাহ এক সাথে থাকা বিরাট একটা সফলতা। মুসলিম উম্মাহ এক থাকলে আজকে মুসলিমরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নির্যাতিত হত না।

এ প্রসঙ্গে কিছু আয়াত উল্লেখ করা হল:

১.‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে (ইসলাম) আঁকড়ে ধরো (ঐক্যবদ্ধ হও) এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।’ (সুরা আলি ইমরান :১০৩)
২. ‘তোমরা সেসব লোকদের মত হয়ো না, যাদের কাছে স্পষ্ট ও প্রকাশ্য নিদর্শন আসার পরও তারা বিভিন্ন দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে এবং নানা ধরনের মতানৈক্য সৃষ্টি করেছে, তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি।’ (সুরা আল ইমরান :১০৫)
৩.‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, সালাত কায়েম করো এবং কখনো মুশরিকদের দলভুক্ত হয়ো না, যারা তাদের দীনকে টুকরো করে দিয়েছে এবং নিজেরা নানা দলে বিভক্ত হয়েছে, এদের প্রত্যেকটি দলই নিজেদের যা আছে তা নিয়েই মত্ত।’ (সুরা তাওবা :৩১-৩২)
৪.‘নিশ্চয়ই মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই।’ (সুরা হুজরাত :১০)
৫. ‘এই যে তোমাদের জাতি, এতো একই জাতি, আর আমি তোমাদের পালনকর্তা, অতএব, তোমরা (ঐক্যবদ্ধভাবে) আমারই দাসত্ব করো।’ (সুরা তওবা :৯২)
হাদীসে মহানবী সাঃ বলেন তোমরা মুমিনদেরকে একটি দেহের ন্যায় দেখতে পাবে। যখন দেহের কোনো অংশ আঘাত পায়, তখন দেহের অন্য অংশও ব্যথা অনুভব করে।-(সহীহ মুসলিম)
পবিত্র কুরআনে ঐক্য সম্পর্কে এতো নির্দেশনা থাকার পরও দুঃখজনক সত্য হচ্ছে, বর্তমান মুসলিম উম্মাহ শতধা বিভক্ত। ‘মুসলিম জাতি এক দেহ, এক প্রাণ’-এই চেতনাবোধ দিনে দিনে ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে আসছে। এ পথ থেকে মুসলিম উম্মাহ কে ফিরে আসতে হবে। মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ থাকার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলেই তারা তাদের পুরনো ঐতিহ্য ফিরে পাবে।

ইসলামী ঐক্যের উদ্দেশ্য

চিন্তাবিদদের মতে, মুসলমানদের বিভিন্ন মাযহাবের মধ্যে ঈমানের দিক দিয়ে সুন্দর ঐকমত্য রয়েছে। এ দিকটি তাদের ঐক্যের জন্য মজবুত ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। সকল মুসলমান এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী, মহানবী (সা.)-এর নবুওয়াতের প্রতি সবাই আস্থাশীল, মহাগ্রন্থ আল-কুরআন সকলেরই পবিত্র কিতাব এবং কা’বার দিকে মুখ করে তারা সবাই নামায আদায় করে। সবাই রমজান মাসে রোযা রাখেন, একই পদ্ধতিতে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়, ছেলেমেয়েদের একই শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলে এবং একই পদ্ধতিতে মৃতের দাফন কাফন সম্পন্ন করে। পবিত্র কুরআন বলে, মুসলমানরা পরস্পর ভাই। তাদের একের প্রতি অপরের বিশেষ অধিকার ও কর্তব্যবোধ মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করে।

ঐক্যের প্রতি পবিত্র কুরআনের আহ্বান

কুরআন, ইসলাম এবং আরো নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে মহান আল্লাহ স্বয়ং ঐক্যের নির্দেশ দিয়েছেন। কুরআনের নিম্নবর্ণিত আয়াতসমূহের দিকে দৃষ্টি দিলেই বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে যায়।
‘এবং তোমরা আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর, তোমরা ছিলে পরস্পর শতরু এবং তিনি তোমাদের হৃদয়ে প্রীতির সঞ্চার করেন। ফলে তাঁর অনুগ্রহে তোমরা পরস্পর ভাই হয়ে গেলে। তোমরা অগ্নিকুণ্ডের প্রান্তে ছিলে, আল্লাহ তা থেকে তোমাদের রক্ষা করেছেন। এভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর নিদর্শনসমূহ স্পষ্টভাবে বিবৃত করেন যাতে তোমরা হেদায়াত লাভ করতে পার।’- আলে ইমরান : ১০৩
ঐক্যের গুরুত্ব অপরিসীম। ঐক্য শব্দের অর্থ হলো একতা। ইসলামের মৌলিক আহ্বান হচ্ছে : আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল। এই তাওহিদী আহ্বানের মধ্যেই ঐক্যের বীজ নিহিত। ইসলামে শিরকের সুযোগ নেই এবং অনৈক্য ও বিভেদের অবকাশ নেই।

বিদায় হজ্জের ভাষণে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “হে ভ্রাতৃম-লী, আমার বাণী মনোযোগ সহকারে অনুধাবন করতে চেষ্টা কর। জেনে রেখো, সকল মুসলমান পরস্পর ভাই ভাই। সবাই একই ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ। সমগ্র দুনিয়ার সকল মুসলমান একই অবিচ্ছেদ্য ভ্রাতৃসমাজ। স্মরণ রেখো, বাসভূমি ও বর্ণ নির্বিশেষে সকল মুসলমান সমান। আজ থেকে বংশগত কৌলিন্য প্রথা বিলুপ্ত হলো। পরস্পরের প্রাধান্যের একমাত্র মাপকাঠি হল খোদাভীতি বা সৎকর্ম। সে ব্যক্তিই তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে কুলীন, যে নিজ কার্য দ্বারা শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “এক মুমিন অপর মুমিনের জন্য আয়নাস্বরূপ এবং এক মুমিন অপর মুমিনের ভাই। তারা একে অপরকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করে এবং তার অনুপস্থিতিতে তাকে রক্ষা করে।” [সুনান আবূ দাউদ : ৪৯১৮]

মুসলিম অনৈক্যের পেছনে অমুসলিমদের ষড়যন্ত্র একটি বড় কারণ বলে ধারণা করার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। ইসলামের আবির্ভাব পরবর্তীকাল থেকে মুসলমানদের সঙ্গে খ্রিষ্টান ও ইহুদী ধর্মাবলম্বীদের বৈরিতা চলে আসছে। উপমহাদেশসহ পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলে ইহুদী-খ্রিষ্টান ষড়যন্ত্রের বাইরে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের ষড়যন্ত্রও মুসলিম ঐক্যকে বিঘ্নিত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে চলেছে। মুসলমানদের বিভক্ত ও দাবিয়ে রাখার জন্যে অমুসলিম বৃহৎ শক্তিসমূহ মুসলমানদের ক্ষেত্রে এক নীতি এবং অমুসলিমদের ক্ষেত্রে ভিন্ন নীতি অনুসরণ করছে। কাশ্মীর ও পূর্ব-তিমুরের ক্ষেত্রে গৃহীত দ্বৈতনীতি তার এক প্রকৃষ্ট উদারহণ। ফিলিস্তিন, ইরাক, কসোভো, আফগানিস্তান, নাইজেরিয়া, আলজেরিয়া ও মায়ানমারের ঘটনাবলী উপোরক্ত সত্যকে দিবালোকের মত স্পষ্ট করে।

মুসলমানদের স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, বাইরের ষড়যন্ত্র অতীতে চলেছে, বর্তমানে চলছে এবং ভবিষ্যতেও চলবে। এ বিপদ সামনে রেখেই মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার শক্তি ও কৌশল অর্জন করতে হবে। মুসলমানদের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও ষড়যন্ত্র দূরীভূত করা সম্ভব হলে বহিঃষড়যন্ত্র মুসলিম শক্তি ও ঐক্যকে শত প্রচেষ্টা সত্বেও বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারবে না। এক্ষেত্রে মুসলমানদের পরকালীন জীবনের পাশাপাশি ইহকালীন জীবনের সুখ-সমৃদ্ধি ও গৌরব লাভের জন্যে শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উৎকর্ষতা অর্জন, পরমত সহিষ্ণুতা, ছোটখাটো বিষয়ে মতানৈক্য পরিহার, বিভিন্ন মতের সমন্বয়, জনসমর্থনের উপর নির্ভরশীল, বৈধ সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, জাতিরাষ্ট্রের সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য প্রতিষ্ঠায় আন্তরিক হতে হবে।