এই বঙ্গে হযরত শাহজলালের পদার্পণ ও শ্রীহট্ট বিজয় (১)

হিজরী ১ম শতকেই আরব বণিকদের মাধ্যমে হিন্দুস্তানে সর্বপ্রথম ইসলামের আগমন ঘটে। বাণিজ্যের পাশাপাশি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার বিস্তীর্ণ উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলোতে তারা ইসলাম প্রচার করেছিলেন। যার মধ্যে বাংলাদেশও ছিল। যারা ঐ সময় ইসলাম প্রচারের উদ্দেশে এতদঞ্চলে আগমন করেন তাঁদের পরিচয় সম্পর্কে ইতিহাস নীরব। পরবর্তী কালে আগতদের মাত্র কয়েকজনের নাম জানা যায়।

১৪ শতাব্দীতে যে সকল অলি-আউলিয়ারা বর্তমান বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারে ভূমিকা রেখেছেন তাদের একজন হলেন হযরত শাহজালাল ইয়েমেনী (রহঃ)। ভারত উপমহাদেশে খাজা মইনুদ্দীন চিশতী (রহঃ)-এর পরে এই ভূখণ্ডে ইসলাম প্রচার ও প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন হযরত শাহ্জালাল ইয়েমেনী (রহঃ)। তিনি আরবের দক্ষিণে অবস্থিত ইয়েমেন রাজ্যে হাডরামন্টের কুনিয়া শহরে ৫৯৭ হিজরি ১১৯৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন। কারো কারো মতে তিনি তুরস্কের কোনা শহরে জন্মগ্রহণ করেন তবে অধিকাংশের মতে তিনি ইয়েমেনেই জন্মগ্রহণ করেছেন বলে ধরা হয়। তাঁর পিতা শায়খ মুহম্মদ যিনি প্রখ্যাত সূফী জালাল আদ্ দ্বীন মুহম্মদ রুমী (রহঃ)-এর সমসাময়িক ছিলেন এবং মাতা সৈয়দা ফাতিমা হাসিনা সাইদা। জন্মের তিন মাসের মধ্যেই তিনি তাঁর স্নেহময়ী মাকে হারান ও কিছুদিন পরে তিনি তাঁর বাবাকেও হারান। পিতৃ ও মাতৃহারা শাহজালাল তাঁর নিকটাত্মীয় মামা ও আধ্যাত্মিক গুরু সৈয়দ আহমদ কবিরের আদর স্নেহে বড় হতে থাকেন। ইতিহাস থেকে জানা যায় হযরত শাহজালাল (রহঃ) একদিন স্বপ্নযোগে রাসুলে পাক (দঃ)-এর পক্ষ থেকে তৎকালীন ভারতবর্ষের গৌড় রাজ্যে ইসলাম প্রচারের জন্য আদেশপ্রাপ্ত হন। মূলত গৌরবঙ্গে মুসলিম নির্যাতক রাজা গৌড় গোবিন্দকে পরাজিত এবং প্রশান্তির ধর্ম ইসলামের প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা নেওয়ার জন্য বিখ্যাত হযরত শাহজালাল (রহঃ)।

কথিত আছে, তাঁর স্বপ্নের কথা স্বীয় মুর্শিদ হযরত সৈয়দ আহমদ কবির (রহঃ)-এর কাছে বলার পরে তিনি হযরত শাহজালাল (রহঃ)-এর হাতে এক মুঠো মাটি দিয়ে বলেছিলেন- ‘যে মাটির রং ও গন্ধ এই মাটির সঙ্গে মিলবে সেখানেই তুমি অবস্থান নেবে এবং সেখান থেকেই তুমি ধর্ম প্রচার করবে।’ ভারতে আগমনের বহু পূর্বেই তিনি উচ্চস্থানীয় আধ্যাত্মিক সূফী সাধক বা কামেল অলি হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। হযরত শাহ্জালাল স্বীয় মুর্শিদের আদেশ পেয়ে ১২ জন দরবেশকে সঙ্গে নিয়ে হিন্দুস্থান তথা ভারতের উদ্দেশে রওনা হলেন। তবে তিনি প্রথমে তার জন্মস্থান ইয়েমেনে শেষবারের মতো যান। সে সময় ইয়েমেনের বাদশাহ ছিলেন সুলতান ওমর আশরাফ। ততদিনে হযরত শাহজালাল (র:)-এর জ্ঞান-গরিমা, আধ্যাত্মিকতা ও অলৌকিকতার খবর সারা বিশ্ব বিদিত। ইয়েমেনের বাদশাহও তার ব্যাপারে শুনেছিলেন। যখন শুনলেন হযরত শাহজালাল (র:) ইয়েমেনে আসছেন তখন তার ইচ্ছে হলো হযরত শাহজালাল (র:)-এর আধ্যাত্মিকতার গভীরতা কতটুকু তা একটু পরীক্ষা করে দেখবেন। সে উদ্দেশ্যে তিনি হযরত শাহজালাল (র:) এবং তার সাথীদেরকে রাজদরবারের মেহমান হিসেবে আমন্ত্রণ করেন। তারা উপস্থিত হলে তাদেরকে শরবত পরিবেশন করা হয়। হযরত শাহজালাল (র:)-কে পরীক্ষা করার জন্য তিনি শরবতের মাঝে বিষ মিশিয়ে রেখেছিলেন। হযরত শাহজালাল (রহঃ) তার দিব্যজ্ঞান দ্বারা শাসকের দুরভিসন্ধি বুঝে ফেলেন এবং মুচকি হেসে বললেন ‘এই পানপাত্রের শরবত সাধারণের জন্য বিষ মিশ্রিত হলেও আমি মুসাফির ফকিরের কাছে তা অমৃতের মতো এবং মধুমিশ্রিত এই বলে তিনি তা পান করেন। আল্লাহর অলিদের আল্লাহ স্বয়ং রক্ষা করে থাকেন; কোনো বিষক্রিয়া তো দেখাই গেলো না বরং রাজা নিজ রাজপ্রসাদেই বিষের যন্ত্রণায় প্রাণ হারালেন। পরবর্তীতে ঐ রাজার পুত্র রাজার স্থলাভিষিক্ত হলেও তিনি পরবর্তীতে রাজ্য ত্যাগ করে হযরত শাহজালালের সান্নিধ্য লাভে ধন্য হন।

হযরত শাহজালাল (রহঃ) ইয়েমেন থেকে বাগদাদে আসেন এবং সেখানে কিছুদিন অবস্থানের পর পারস্যে আসেন। পারস্য থেকে তিনি আফগানিস্তান, বেলুচিস্তান হয়ে ১৩০৩ সনে দিল্লিতে পৌঁছান। ভারতে পৌঁছার পর তিনি হযরত খাজা মইনুদ্দীন চিশতী [১১৪১-১২৩০] (রহঃ)-এর মাজার জিয়ারত করে তাঁর কাছ থেকেও ফায়েজপ্রাপ্ত হন। পরবর্তীতে তিনি সুলতানুল মাশায়েখ হযরত নিজামউদ্দিন আউলিয়া [১২৩৮-১৩২৫] (রহঃ)-এর আতিথেয়তা গ্রহণ করেন।