শরিয়াহ সম্মত ওয়েব পরিবেশ. আরওসন্ধানকরুন

এই বঙ্গে হযরত শাহজালালের পদার্পণ ও শ্রীহট্ট বিজয় (২)

কথিত রয়েছে, তৎকালীন শ্রীহট্ট বর্তমান সিলেট শহরের পূর্বদিকে টোল টিকর নামক স্থানে শেখ বুরহানউদ্দিন নামে একজন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি সন্তানপ্রাপ্তির আশায় একটি গরু কুরবানির মানত করেন এবং আল্লাহ তাকে একটি পুত্রসন্তান দান করেন। শেখ বুরহানউদ্দিনের এই সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। জগতের সকল সুখ-দুঃখ আল্লাহ নিয়ন্ত্রণ করেন এবং এর পেছনে তাঁর নিগূঢ় উদ্দেশ্য লুকায়িত থাকে যা সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে না। যথারীতি পুত্রপ্রাপ্তির পর তিনি গরু কুরবানি করেন। কুরবানির এক টুকরা গোশত চিল ছোঁ মেরে নিয়ে যায় এবং ঘটনাক্রমে তা গৌড় গোবিন্দের প্রাসাদের সামনে পড়ে। রাজা ক্রোধান্বিত হয়ে গো হত্যাকারীকে খুঁজে বের করার নির্দেশ দেন এবং অনুসন্ধানে শেখ বুরহানউদ্দিনকে দায়ী করে রাজার সামনে উপস্থিত করা হয়। শেখ বুরহানউদ্দিন অকপটে গরু জবাইয়ের কথা স্বীকার করলে রাজা তার ডান হাত কেটে নেন এবং শিশুসন্তানটিকে হত্যা করেন।

দিল্লির সুলতান আলাউদ্দিনের দরবারে পৌঁছে রাজা গৌড় গোবিন্দের অত্যাচারের নির্মম কাহিনী বর্ণনা করেন পাগলপ্রায় বুরহানউদ্দিন।  সুলতান এই করুণ কাহিনী শুনে বড়ই মর্মাহত হলেন এবং রাজাকে উপযুক্ত শাস্তি প্রদানের জন্য স্বীয় ভগ্নিপুত্র সেকান্দার শাহ্কে প্রধান করে সৈন্যসহ শ্রীহট্টে পাঠান। সেকান্দার শাহ্রে বাহিনী শ্রীহট্টে পৌঁছার পূর্বেই রাজা গৌড় গোবিন্দ তাদের ওপরে অগ্নিবাণ নিক্ষেপ করেন। সৈন্যদের অগ্নিবাণ সম্বন্ধে ধারণা না থাকায় বহু সৈন্য নিহত হয়। সেকান্দার শাহ্ এই অবস্থা দেখে পশ্চাৎপদ হয়ে আরো প্রায় দুবার প্রচেষ্টা করেও সফল হতে পারলেন না এবং তিনি তা দিল্লির সম্রাটকে অবহিত করেন। দিল্লির সম্রাট সৈয়দ নাসিরউদ্দিন শাহ্কে সেকান্দার শাহ্কে সহযোগিতার জন্য প্রেরণ করেন। অতঃপর তিনি দিল্লি থেকে এলাহাবাদে পৌঁছালে হযরত শাহজালাল (রহঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। সাইয়্যেদ নাসিরউদ্দিন হযরত শাহজালাল (রহঃ)-এর মুরিদও হয়ে গেলেন। হযরত শাহজালাল (রহঃ) ইয়েমেন থেকে ১২ জন সঙ্গী নিয়ে রওনা করলেও শ্রীহট্টে আসার সময় তার সঙ্গী সংখ্যা ছিল ৩৬০ জন। হযরত শাহজালাল (রহঃ) ৩৬০ জন শিষ্য এবং বাদশাহের প্রেরিত সেনাদলসহ সোনারগাঁওয়ে সেকান্দার শাহ্রে সঙ্গে মিলিত হন। তিনি হযরত শাহজালাল (রহঃ)-এর পরিচয় পেয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন এবং বিশেষভাবে গৌড় গোবিন্দের অগ্নিবাণই তাদের পরাজয়ের প্রধান কারণ বলে উল্লেখ করেন। হযরত শাহজালাল (রহঃ) তাকে উৎসাহ দিয়ে কোনো ভয় নেই বলে আশ্বস্ত করলেন এবং বলেন, হযরত মুসা (আঃ) যেভাবে ফেরাউনের সমস্ত জাদুকে নিষ্ক্রিয় করেছিলেনÑ আল্লাহর দয়ায় আমরাও গৌড় গোবিন্দের জাদু নষ্ট করে দেবো। তার কর্মের জন্য তার পরাজয় এবং সিংহাসনচ্যুতি সুনিশ্চিত ও অনিবার্য।
অতঃপর তারা ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরে পৌঁছে দেখলেন পারাপারের কোনো ব্যবস্থা নেই। হযরত শাহজালাল (রহঃ) তাঁর নিজের জায়নামাজ বা নামাজের চাদরে চড়ে সকলকে নিয়ে পার হন এবং গৌড় গোবিন্দের এলাকা শ্রীহট্টের দিকে অগ্রসর হন। গৌড় গোবিন্দ যখন খবর পান যে, এক মুসলিম ফকির তার শিষ্য ও সেকান্দার শাহের সৈন্যবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে তার এলাকার দিকে অগ্রসর হচ্ছেন তখন তিনি তাদের দিকে অগ্নিবাণ নিক্ষেপ করতে থাকেন কিন্তু এবারের অগ্নিবাণ কোনো ক্রিয়া না করে উল্টো গৌড় গোবিন্দের দিকে ফিরে আসতে লাগলো এবং তার সৈন্যবাহিনীর ছাউনি ধ্বংস হয়ে গেলো। গৌড় গোবিন্দ এই অলৌকিক ঘটনা দেখে নিজের প্রাণরক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ইতোমধ্যে হযরত শাহজালাল (রহঃ) সদলবলে বাহাদুরপুরের নিকটবর্তী বুরাক নদী পার হয়ে জালালপুরে উপনীত হলেন। রাজা পথিমধ্যে বিভিন্ন শিলাপাথর ও অন্যান্য জিনিসপত্র দিয়ে বাধা তৈরি করেও শেষ রক্ষা করতে পারলেন না। গৌড় গোবিন্দ নিজের পরাজয় মেনে নিয়ে কাছাড়ের দিকে পালিয়ে গেলেন। হযরত শাহজালাল (রহঃ) সুরমা নদী পার হয়ে শ্রীহট্ট বা সিলেট শহরে প্রবেশ করলেন।
এখানে সিলেট নামকরণে একটা কথা প্রচলিত আছে আর তা হলো হযরত শাহজালাল (রহঃ) যখন সিলেটের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন তখন রাজার তৈরি করা ব্যারিকেডের শিলাপাথরকে “শিল হট যা” বলে উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে শিলাপাথরগুলো সরে গিয়েছিল বলে জানা যায়। এখান থেকেই সিলেটের নামকরণ হয়েছে বলে ধরা হয়।
সিলেট বিজয়ের পর তিনি সেকান্দার শাহকে রাজ্য বুঝিয়ে দিয়ে তাঁর মুর্শিদের কথামতো তিনি তাঁর ধর্মপ্রচারের স্থানের ব্যাপারে চিন্তা করতে লাগলেন। পূর্বেই তিনি তাঁর মুর্শিদ প্রদত্ত মাটি একজনের জিম্মায় প্রদান করেছিলেন যিনি চাশনী পীর নামেও খ্যাত এবং তাঁর প্রতি আদেশ ছিল পথে এই মাটির সঙ্গে মিলিয়ে দেখার জন্য। এই চাশনী পীর এসে হযরত শাহজালাল (রহঃ)-কে সিলেটের মাটির সঙ্গে তাঁর মুর্শিদের প্রদত্ত মাটির মিলের কথা জানালে তিনি চিন্তামুক্ত হয়ে আস্তানা গাড়ার আদেশ দিলেন।
হযরত শাহজালাল (রহঃ)-এর সাহচার্য পাওয়ার জন্য দূরদূরান্ত থেকে লোকজন আসতে লাগলো এবং তিনি তাদের ধর্ম ও জীবন ব্যবস্থা সম্পর্কে জ্ঞানদান করেন। তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনার্থে তিনি তার শিষ্যদের বিভিন্ন স্থানে ধর্ম প্রচারের আদেশ দিয়ে পাঠিয়ে দেন। তন্মধ্যে হযরত শাহ পরান সিলেট, হযরত শাহ মালেক ঢাকা, সৈয়দ আহমদ ওরফে কল্লাশহীদ কুমিল্লায়, চট্টগ্রামে খাজা বুরহানউদ্দিন কাত্তান ও শাহ বদরুদ্দীন, সুনামগঞ্জে শাহ্ কামাল কাত্তানী প্রমুখ। হযরত শাহজালাল (রহঃ)-এর সঙ্গে ৩৬০ জন সঙ্গী হিসেবে যারা এসেছিলেন তাদের সকলের নাম জানা সম্ভব না হলেও ১৯৭৪ সালে ইংরেজি ভাষায় সিলেট ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ারে ৩৫৫ জনের নাম সমৃদ্ধ একটি তালিকা প্রকাশিত হয়। ‘শ্রীহট্ট নূর’ গ্রন্থে ৩০৭ জন আউলিয়ার নাম পাওয়া যায়। মর্তুজা আলী ‘সুহেল ই ইয়ামেন’-এ ২৫২ জন আউলিয়ার নাম উল্লেখ করেন। আল ইসলাহে মোঃ নুরুল হক ৩২২ জন আউলিয়ার নাম উল্লেখ করেন।
হযরত শাহজালাল (রহঃ) তাঁর শেষ জীবন পর্যন্ত ধর্ম প্রচার করে গেছেন। তার ব্যবহার ও অন্যান্য গুণাবলী লক্ষ করে বহু হিন্দু এবং বৌদ্ধ ইসলাম গ্রহণ করেন। বিশ্বের নামকরা পর্যটক মরক্কো তানজানিয়ার অধিবাসী শায়খ সরফ উদ্দিন আবু আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ ইবনে বতুতা ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে সিলেট সফরে এসে হযরত শাহজালাল (রহঃ)-এর সাক্ষাৎ লাভ করেন। ইবনে বতুতা সিলেটকে কামরূপ রাজ্যের অন্তর্গত অঞ্চল বলে উল্লেখ করেন এবং সমুদ্র তীরবর্তী একটি গহিন বনভূমি বলেও বর্ণনা করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী হযরত শাহজালাল (রহঃ) পাতলা গড়ন ও খুবই সুন্দর চেহারার অধিকারী এবং বেশ লম্বা ছিলেন। তিনি ছাগলের দুধ পান করতেন। সারা বছরই বলতে গেলে তিনি রোজা রাখতেন ও সারা রাত এবাদতে মশগুল থাকতেন। ইবনে বতুতা ‘রিহালা ইবনে বতুতা’য় হযরত শাহজালাল (রহঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাতের বিভিন্ন বর্ণনা প্রদান করেন। মোগল কবি হযরত আমির খসরুর কবিতার বইয়েও হযরত শাহজালাল (রহঃ)-এর সিলেট বিজয়ের উল্লেখ আছে।
হযরত শাহজালাল (রহঃ)-এর মৃত্যুবরণের সঠিক তারিখ নিয়ে মতভেদ আছে। কিন্তু ইবনে বতুতার বর্ণনা অনুযায়ী তিনি ১৫০ বছর বয়সে ৭৪৭ হিজরি ১৩৪৭ সালে ওফাত গ্রহণ করেন বলে জানা যায়। তিনি সিলেটেই সমাহিত হন এবং তাঁর সমাধিস্থল দরগা মহল্লা নামে পরিচিত।

কিছুবলারথাকলে

যোগাযোগকরুন