এই শক্তিশালী নারী ইসলামে প্রথম শহীদ বলে ভূষিত

© suppasit chookittikul | Dreamstime.com

নারীকে যোগ্য সম্মান দিতে আজও কুন্ঠা বোধ করে আমাদের সমাজ, সংসার। ইসলাম গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে একজন নারীকেই আমরা দেখি। যিনি ছিলেন রাসূল (সা.)এর প্রিয় সহধর্মিনী হযরত খাদিজা (রাযি.)। তেমনি, নিজের ঈমান রক্ষা করতে গিয়ে প্রথম যিনি শহীদ হয়েছিলেন, তিনিও ছিলেন একজন নারী- হযরত সুমাইয়া (রাযি.)।

সুমাইয়া বিনতে খাব্বাত বা সুমাইয়া বিনতে খাইয়াত হলেন ইসলামিক ঐতিহ্য অনুসারে হিজরত পূর্ব সময়ের প্রথম শহীদ সাহাবী এবং মহিলা যিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার কারণে আবু জাহলের হাতে নিহত হন। তিনি ইয়াসির ইবনে আমিরের স্ত্রী এবং আম্মার ইবনে ইয়াসিরের মাতা ছিলেন, যারা প্রাথমিক মুসলিম ধর্মান্তরিতদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন।

ইসলামের প্রথম শহীদ হযরত সুমাইয়া (রাযি.)এর জন্ম হয়েছিল তৎকালীন আরবের নিম্নগোত্রের পরিবারে। যাদেরকে দাস অথবা দাসির কাজ করতে হতো। অভিজাত বংশের প্রভাব বা ছায়া তাঁর মাথার উপর ছিল না। রাসূল (সা.) দ্বীন ইসলাম প্রচার করার সাথে সাথে হযরত সুমাইয়া (রাযি.) ও তাঁর স্বামী এবং ছেলেরাও মুসলমান হয়ে যান।
ইসলামের একদম গোড়ার দিকে কাফেরদের অত্যাচার ও উৎপীড়ন সহ্য করার এক কষ্টবহ দুঃসহ কাল ছিল। যারাই ইসলাম গ্রহণ করতেন সমাজ ও গোত্রের নেতাদের নির্যাতন-নিগ্রহের ভয়ে তারা তা প্রকাশ করতেন না। সত্যের দীক্ষা গ্রহণ করতেন গোপনে, সত্য শিখতেন গোপনে এবং গোপনে গোপনেই তাঁর প্রচার করতেন জীবন মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে।

এর মধ্যেও যারা ছিলেন সামাজিকভাবে শক্ত শেকড়বিহীন, শক্ত ও প্রভাব যাদের ছিল না, যারা ছিলেন কারো গোলাম, ক্রীতদাস বা অশ্রিত পর্যায়ের, তাদের অবস্থা হতো আরও শোচনীয়। কোন ভাবে তাদের ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ হয়ে গেলেই তাদের কাউকে গরম বালিতে পাথর চাপা দিয়ে, কাউকে লোহার বর্ম পরিয়ে রেখে, কাউকে বালিতে দড়ি দিয়ে বেঁধে টেনে হিঁচড়ে অত্যাচার করা হতো। এসব অত্যাচার যে কত তীব্র আর হৃদয়বিদারক হতো, হযরত বিলাল (রাঃ) হযরত খাব্বাব (রাঃ)-এর মতো সাহাবীগণের নিপীড়িত জীবন ছিল তার বেদনামাখা উদারণ।
হযরত সুমাইয়া (রাযি.) ছিলেন শুরুর দিক থেকে ইসলাম গ্রহণ করার মাঝে ১৭তম ব্যক্তি। ইসলাম গ্রহণ করার পর হযরত সুমাইয়া (রাযি.)এর উপর আবু জাহেল অকথ্য অত্যাচার শুরু করে। আবু জাহেল তাদেরকে মক্কার আল-বাতহা উপত্যকার মরুভূমির তপ্তবালুর মাঝে লোহার পোষাক পরিয়ে শুইয়ে রাখত। যেহেতু হযরত সুমাইয়া (রাযি.)এর কোন নিজস্ব গোত্র ছিল না, তাই আবু জাহেল তার ইচ্ছামত হযরত সুমাইয়া (রাযি.)কে অত্যাচার করত।

‘আল বাতহা’ উপত্যকার পথ ধরে একদিন রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হেঁটে যাচ্ছিলেন। সঙ্গে ছিলেন তাঁর কোনো কোনো সাহাবী। তাঁরা দেখতে পেলেন প্রখর রোদের মধ্যে আম্মার, তাঁর মা-বাবা এবং ভাইয়ের উপর চালানো হচ্ছে বিভিন্ন রকম অত্যাচার। এ বুকফাটা দৃশ্য দেখে নবীজীর শরীর ও মন বিষণ্ণ হয়ে গেলো। তাঁর উপরও তো তখন চারদিকের চাপ। হাত-পা বাঁধা অবস্থার মতো। তিনি ইচ্ছে করলেই কাফির মুশরিকদের এই পশুত্বের বিরুদ্ধে কিছু করতে পারবেন না। তিনি দাঁড়িয়ে দেখলেন এই করুণ দৃশ্য। আর তাকে দেখেই পরিবারের প্রধান হযরত ইয়াসির হাহাকারের সুরে চিৎকার করে বলে উঠলেন, ইয়া রাসূরুল্লাহ এরকম কেন হয়ে গেল? বুকে ভেতর কষ্টের পাথর চাপা দিয়ে রাসূরুল্লাহ (সাঃ) মমতাভরাট কণ্ঠে তাঁদের বললেন, হে ইয়াসির পরিবার ধৈর্য ধরো।
তোমাদের জন্য রয়েছে সুসংবাদ। তোমাদের জন্য রয়েছে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি। হে আল্লাহ ইয়াসির পরিবারকে ক্ষমা করুন। রাসূলুল্লাহ(সা.) যখন হযরত সুমাইয়া (রাযি.) কে জান্নাতের সুসংবাদ দিতেন, তখন হযরত সুমাইয়া (রাযি.) রাসূল (সা.)কে বলতেন- “ইয়া রাসূলুল্লাহ(সা.)! আমি জান্নাতের সুগন্ধ এই তপ্ত মরুভূমির বুকে শুয়েই পাচ্ছি।”
দীর্ঘদিন অত্যাচার নির্যাতন করার পরও যখন হযরত সুমাইয়া (রাযি.) দ্বীন ইসলাম পরিত্যাগ করলেন না, তখন একদিন নরাধম আবু জাহেল হযরত সুমাইয়া (রাযি.)এর লজ্জাস্থানে বর্শা নিক্ষেপ করে উনাকে শহীদ করে দেয়। (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন। এর মৃত্যুর পর স্বামী হযরত ইয়াসীর ইবনে আমির (রা.)কেও তীরবিদ্ধ করে শহীদ করে।

হযরত সুমাইয়া (রাযি.)এর শাহাদাতের ঘটনাটা ঘটে ৬১৫ খ্রীষ্টাব্দে। অর্থাৎ রালূলুল্লাহ (সা.)এর নবুওয়্যাত লাভের ৫ বছর পর হযরত সুমাইয়া (রাযি.) শাহাদাত বরণ করেন।
বদর যুদ্ধে আবু জাহেল নিহত হলে রাসূল (সা.) হযরত সুমাইয়া (রাযি.)এর ছেলে হযরত আম্মার রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন- “আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন তোমার মায়ের ঘাতককে হত্যা করেছেন।” হযরত সুমাইয়া (রাযি.) এর সন্তান হযরত আম্মার (রাযি.)এর তত্ত্বাবধানেই মদীনার কুবা শহরে ইসলামের ইতিহাসের প্রথম মসজিদ তৈরি হয়। আজ থেকে ১৪০০ বছরপূর্বে এই মহান নারী সাহাবীয়্যাহ হযরত সুমাইয়া (রাযি.) ইসলামের সুমহান সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ হয়ে মুসলমান হয়ে যান।