এই শহরই ছিল একদা ‘অর্ধেক বিশ্ব’

Isfahan
Historical Siosepol Bridge in Isfahan and its reflection in water, Iran ID 169789902 © Turfantastik | Dreamstime.com

ইরানের অন্যতম জনবহুল নগরীটির নাম হল ইসফাহান। এই শহরের চিত্তাকর্ষক ইতিহাস এবং অসামান্য স্থাপত্য শৈলীর নিদর্শন শহরটিকে ইরানের তৃতীয় বৃহত্তম শহর এবং এক নম্বর পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করেছে। তেহরান শহরের ৩৪০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত ইসফাহন একসময় বিশ্বের বড় শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল । ১০৫০ থেকে ১৭২২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ছিল এর সমৃদ্ধিকাল। সাফাভিদ সাম্রাজ্যের সময়কালে এই শহর শৌর্যের শীর্ষে পৌঁছয়।

অনন্য ইসলামী স্থাপত্য, ছাদ ঢাকা সেতু, মসজিদ ও মিনারের অসাধারণ সৌন্দর্য আজও ইসফাহনকে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে রেখেছে। বিখ্যাত ভ্রমণপ্রিয় ফরাসি লেখক অঁদ্রে মালরো লিখেছিলেন:

“কে দাবী করতে পারে সে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর শহর দেখেছে, যে এখনও ইসফাহনে যায়নি?”

এই শহরের ইতিহাস জানতে আমাদেরকে সেই প্রস্তর যুগে ফিরে যেতে হবে। এ শহর এলামী সভ্যতা (২৭০০-১৬০০ খ্রি.পূ.) থেকে আরম্ভ করে ধীরে ধীরে বর্তমান রূপ লাভ করেছে। তখন এর নাম ছিল আসফানদানা বা ইসফানদানা। একটা সময়ে শহরটিকে বলা হত ‘ইসফাহান নাসফ-ই জাহান’ যার আক্ষরিক অর্থ দাঁড়ায় ‘ইসফাহান অর্ধেক পৃথিবী’। বিশ্বের বৃহত্তম শহর বা জনবহুল জনপদ রূপে প্রসিদ্ধ এই নগরী সর্বমোট দু’বার ইরানের রাজধানী হওয়ার সম্মান পেয়েছিল।

আছামেনিদের সময়কাল থেকে শুরু হয়ে কাজার রাজবংশের সমাপ্তি পর্যন্ত বহু ধারাবাহিক আক্রমণের ঘটনাতে ইসফাহানের ইতিহাস বিস্তৃত। ঐতিহাসিক সাক্ষ্য অনুযায়ী ইসফাহান মোট চৌদ্দটি বিভিন্ন সাম্রাজ্য দ্বারা শাসিত হয়েছে। এই সময়পর্ব জুড়েই ঐতিহাসিক এবং ধারাবাহিক বহু উত্থান পতন এবং রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক নানাবিধ পরিবর্তন আসে।

আর্সাসিড থেকে সেলজুক সাম্রাজ্য

৬৫১ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১২২০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইরান আরব বিজয়ের মধ্যে দিয়েই কার্যত ইরানী রাজবংশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পারস্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। নিজাম আল-মুলক নির্মিত জুমা মসজিদের গম্বুজ (‘মসজিদ-ই-জামেহ ইসফাহান’) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিস্তম্ভগুলি এই সময়কালেই নির্মিত হয়েছিল। আজকে যে মসজিদটি আমরা দেখতে পাই তা হল বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত নিয়মিত নির্মাণের একধরনের ফলাফল। সেলজুক বংশের মালিক শাহের শাসনামলে এসফাহন পুনরায় রাজধানীর মর্যাদা পায়। এ সময়টা ছিল ইসফাহনের স্বর্ণযুগ। দার্শনিক ইবনে সিনা ১১শ শতকে এসফাহনে শিক্ষকতায় নিয়োজিত ছিলেন।

ইল-খানস থেকে সাফাভিডস পর্যন্ত

ইল-খানস বা ‘ওয়ার্ল্ড অফ লর্ডস’ এর শাসনামলে ওলজেইতু খান ছিলেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শাসক। তাঁর শিল্পের প্রতি উচ্চ আগ্রহ, একই সঙ্গে শৈল্পিক চর্চার প্রতি ঝোঁক সাম্রাজ্যের সামগ্রিক সৌন্দর্যায়নে বিশেষভাবে সহয়তা করেছিল। তিনিই প্রথম শাসক যিনি শিয়াদের বিশ্বাসকে মেনে নিয়েছিলেন।

ইরানের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি হাফেজ মুজাফফারিদে থাকতেন। এই সময়টি টিমুরিডদের দ্বারা সমাপ্ত হয় এবং তার পরে কারা-কুইনলুস, যিনি দরব-ই -মান নির্মাণ করেছিলেন, তাঁদের সাম্রাজ্যের প্রসার চলেছিল।

এই সময়টি সাফাভিড রাজবংশের রাজত্বের মধ্যে দিয়ে শেষ হয়েছিল। তাঁদেরই উদ্যোগে চিত্তাকর্ষক এবং আকর্ষণীয় বহু স্থাপত্যশেলী নির্মিত হয়। এই সময় পর্বকে বলা হয় ‘শহরের স্বর্ণযুগ’। খাজো ব্রিজ, হাকিমের মসজিদ, তালার-ই-আশরাফ এবং চেহেল সুতুনের প্রাসাদগুলি নির্মিত হয়েছিল, এই সময়েই।

আফগানি ইন্টাররিগনাম থেকে কাজার পর্যন্ত

আফগানি আন্তঃসংযোগের সময় একমাত্র নির্মাণ হল “ওমরের বারান্দা”, এটি মসজিদের একটি মেহরাব বলা যেতে পারে। ১৭৫৩ সালে করিম খান কর্তৃত্ব গ্রহণ করেন এবং সিরাজকে রাজধানী করেন। কাজারের আমলে আবার রাজধানী তেহরানে স্থানান্তরিত হয়। ইসফাহানের আর কোনও স্থাপত্যের নিদর্শন এই সময়ে দেখা না গেলেও। এই সময়ে নির্মিত একমাত্র স্থাপত্য নির্মাণ ছিল মসজিদ-ই-সাইয়েদ।

এই সমস্ত স্থাপত্য নির্মাণকে ইউনেস্কো বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসাবে মনোনীত করেছে। একজন ব্রিটিশ ভ্রমণকর্মী রবার্ট বায়রন, এথেন্স বা রোমের মতো দুর্লভ নিদর্শনগুলির পাশাপাশি ইসফাহানকেও অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক প্রসিদ্ধ স্থান হিসেবে স্থান দিয়েছেন। এই নগরীর প্রাচীন ইতিহাস জানা এবং এর চিত্তাকর্ষক স্থাপত্যগুলি দেখার মধ্যে দিয়ে ইসফাহানকে ‘ইরানের লুকানো রত্ন’ বলার কারণ বোধগম্য হয়ে ওঠে।