একজন ধার্মিক বাঙালি মুসলমান রাজনীতিবিদের কাহিনী

mujib ur rehman

বঙ্গবন্ধু যেমন ছিলেন একজন দেশপ্রেমিক বাঙালি, তেমনি ছিলেন একজন প্রকৃত মুসলমান। বঙ্গবন্ধুর সারা জীবনের কর্মপ্রয়াস ছিল বাংলার জনগণের শোষণ ও মুক্তির অন্বেষণ। স্বাধীন বাংলাদেশে ইসলামি অগ্রযাত্রায় বঙ্গবন্ধুর অবদান অবিস্মরণীয়। বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে ইসলামের প্রচার প্রসারে যে অবদান রেখেছেন, তা সমকালীন ইতিহাসে বিরল। স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন উদার চেতনার অধিকারী একজন খাঁটি ইমানদার। পারিবারিকভাবেই ইসলামিক চেতনা নিয়ে জন্মেছিলেন তিনি ইসলামের মহানুভবতা ও উদারতার আদর্শ আজীবন লালন করেছেন বাঙালির এ মহানায়ক।

৭ মার্চের ভাষণে দৃঢ়প্রত্যয়ীভাবে ‘ইনশাআল্লাহ’ বলে যে ঘোষণা তিনি দিয়েছিলেন, সেই ‘ইনশাআল্লাহ’ থেকেই বাঙালি মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রেরণা পেয়েছিল। লাখো মানুষের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জনের পর বঙ্গবন্ধু যখন স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করলেন, একই মাঠে তার মুখে শোনা গেল বাঙালির জাতিসত্তার পরিচয়। ১৯৭২ সালে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্ত বাতাসে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিশাল জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমার ফাঁসির হুকুম হয়েছিল, জীবন দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়েছিলাম, আমি বলেছিলাম তোমরা আমাকে মারতে চাও মেরে ফেল। আমি বাঙালি, আমি মানুষ, আমি মুসলমান। মুসলমান একবার মরে, বারবার মরে না।’

বাংলাদেশকে সব ধর্মের সব মানুষের জন্য শান্তির দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে বঙ্গবন্ধু ছিলেন সদা সচেষ্ট। তার স্বল্পকালীন শাসনামলে দেশ ও জাতির সার্বিক কল্যাণার্থে গৃহীত নানামুখী পদক্ষেপগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং ভৌত অবকাঠামোগত পদক্ষেপ যেমন ছিল, তেমনি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি ও মূল্যবোধের বিষয়াদি বিবেচনায় রেখে তিনি ইসলামের প্রচার-প্রসারে গ্রহণ করেছিলেন বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকরী নানা ব্যবস্থা। তিনি যেমন একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের মহান স্থপতি, তেমনি বাংলাদেশে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ইসলামের প্রচার-প্রসারের স্থপতিও তিনিই। এ দুটি অনন্য সাধারণ অনুষঙ্গ বঙ্গবন্ধুর জীবনকে দান করেছে উজ্জ্বল মহিমা।

মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে পিতাতুল্য মনে করতেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। রাষ্ট্রপ্রতি হওয়ার পরেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে মওলানা ভাসানী ছিলেন পিতার মতো। বঙ্গবন্ধুকেও তিনি পুত্রসম স্নেহ করতেন। উল্লেখ্য, মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগের সভাপতি থাকাকালেই বঙ্গবন্ধু তাঁর সাধারণ সম্পাদক হয়ে ছিলেন। মওলানা ভাসানীকে তিনি একজন রাজনৈতিক গুরু হিসেবে যতটা মানতেন ঠিক ততটাই তাকে একজন ধর্মীয় পথ-নির্দেশক হিসেবে মান্য করতেন।

বিশ্ব ইজতেমা বর্তমানে যে তুরাগ নদী সংলগ্নে আয়োজিত হয়, ইজতেমার জন্যে এ স্থানেরও বরাদ্দ দিয়েছিলেন জাতির জনক। বঙ্গবন্ধু জীবিতাবস্থায় রমজান মাস উপলক্ষে পত্র-পত্রিকায় বাণী দিতেন। রোজাদারদের যেন কষ্ট না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতেন।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালির আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ে তাদের শোষণ, বঞ্চনার বিরুদ্ধে যখন আন্দোলন করছেন, যখন বাঙালির অধিকার আদায়ে জেল–জুলুম নির্যাতন বঙ্গবন্ধুকে দমিয়ে রাখতে পারেনি,  তখন বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে ধর্মকে ব্যবহার করেছেন সর্বাগ্রে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে বাংলা ভাষাকে হিন্দুয়ানী ভাষা হিসাবে রূপ দেওয়ার ষড়যন্ত্র করেছে। বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে একে পাকিস্তান ভাঙা, মুসলমানদের বিরুদ্ধে ভারতের ষড়যন্ত্র বলে প্রচার করেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ভারতের চর ও ইসলামের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছে। রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার করে রাজনীতিকে কলুষিত করেছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একজন প্রকৃত মুসলমান হিসেবে ধর্মকে রাজনীতি হতে দূরে রেখে অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রতিষ্ঠা করেছেন।

সে সময় বঙ্গবন্ধু তাঁর এই অমূল্য বক্তব্যে রাসুল (সা.)–এর ইসলামের সুমহান শিক্ষা, অন্যায়, অবিচার, অত্যাচার, বঞ্চনা ও শোষণের বিরুদ্ধে ইসলামের আপসহীন অবস্থান, প্রতারণা, প্রবঞ্চনা ও মুনাফেকির বিরুদ্ধে ইসলামের শিক্ষার প্রতি তাঁর দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। সব ধর্মের মানুষের কাছে ইসলামের মূল মর্মবাণী তুলে ধরে অসাম্প্রদায়িক চিন্তা–চেতনার রাজনৈতিক নতুন ধারা সৃষ্টি করে সফলতা লাভ করেন।

বঙ্গবন্ধুহীন বাংলায় তাঁর হাতে গড়া স্বপ্নের এই সোনার বাংলা সে সময়কার পাকিস্তানি জান্তাদের ন্যায় বঙ্গবন্ধুর ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা–অপচেষ্টা করা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। তাঁর ইসলামি চেতনার বৈশিষ্ট্যগুলোকে ভুল ব্যাখ্যা করে তাঁকে খাটো করার হীন চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু বাঙালি তাঁদের প্রাণপ্রিয় নেতার আদর্শ হতে কোনো সময় বিচ্যুত হয়নি বলেই আজ বাংলাদেশ সম্পদে ও উন্নয়নে, শিক্ষা, শিল্পায়নে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এগিয়ে যাচ্ছে।

জানা যায়, বঙ্গবন্ধু ছিলেন বংশ পরম্পরায় বাগদাদের দরবেশ বংশের লোক। তাঁর বাবা–মা সবাই ধার্মিক ছিলেন। তিনি ধর্মকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করাকে ঘৃণা করতেন। তিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে সব মানুষের স্ব-স্ব ধর্মের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতার উৎসই ছিল রাসুল (সা.)–এর মদিনায় সনদের শিক্ষার অনুসরণে।

‘মদিনা ইহুদি-নাসারা, পৌত্তলিক ও মুসলমান সবাই নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে।’ ইসলামই প্রথম নিরপেক্ষতার বাণী বিশ্বে প্রচার করেছে, ‘তোমার ধর্ম তোমার জন্য, আমার ধর্ম আমার জন্য এবং ধর্মে কোনো জুলুম বা অত্যাচার নেই।’ এ কথা পবিত্র কোরআন ছাড়া আর কোনো ধর্মগ্রন্থ প্রচার করেনি। ধর্মকে বঙ্গবন্ধু শ্রদ্ধা করতেন। কিন্তু ধর্মান্ধতাকে তিনি মনে প্রাণে ঘৃণা করতেন। এ কারণেই তিনি এ দেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের গোড়া হতেই ধর্মনিরপেক্ষতাকে প্রাধান্য দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্ম নিরপেক্ষতার স্বীকৃতির মধ্যে তাই এ দেশের জনগণের সুদীর্ঘ তিক্ত অভিজ্ঞতা ও বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ প্রত্যয়ের ফলশ্রুতি ঘটেছে বা তা বাস্তবায়ন করে এ জাতি উন্নত জাতিতে পরিণত হয়েছে।

ইসলামের চর্চা ও গবেষণার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আন্তরিক উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় বায়তুল মোকাররম মসজিদ নিয়ে ১৯৭৫ সালের ২৮ মার্চ প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমান এক অধ্যাদেশ জারি করে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেন। মেশকাত শরিফের অনুবাদক হিসাবে সুপরিচিত মাওলানা ফজলুল করিমকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রথম মহাপরিচালক নিযুক্ত করেন। বঙ্গবন্ধু মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ডকে পুনর্গঠন করেন। জুয়া, হাউজি, মদ প্রভৃতি অসামাজিক কার্যকলাপ নিষিদ্ধ এবং শাস্তির বিধান করেন।