একজন মুসলমানের কাছে সাফল্যের সংজ্ঞা কী?

আকীদাহ ২৭ এপ্রিল ২০২০ Tamalika Basu

সফলতার সংজ্ঞা কী? কাড়ি কাড়ি অর্থ সম্পদ কামানোর নামই কি সফলতা? নাকি নিজের পরিবারের সবার মুখে হাসি ফোটানোতে, অল্পে তুষ্ট থাকতে পারাতেই সফলতা? একেকজনের দৃষ্টিকোণ থেকে সফলতার সংজ্ঞা হতে পারে একেক রকম। কেউ হয়তো অ্যাপলের নতুন আইফোন পকেটে রাখাকে সফলতা মনে করবেন। আবার নিম্ন মধ্যবিত্ত কারও কাছে সাধারণ মোবাইলই হতে পারে সফলতা। যে ছেলে/মেয়ে পড়াশোনায় সবসময় ভালো তার কাছে রোল নম্বর দুই কিংবা তিনের নিচে যাওয়া মানেই ব্যর্থতা। আর যে ছেলে/মেয়ে শিক্ষার্থী হিসেবে অত ভালো নয়, তার জন্য হয়তো পাস করাটাই সফলতা।

একজন আদর্শ মুসলমানের জীবনের লক্ষ্য কী?

ভালো চাকরি করা, ব্যবসা করে অনেক টাকা কামানো, কেবল এগুলোকেই এখন সফলতা হিসেবে তুলে আনা হচ্ছে। আলীবাবা, মার্ক জুকারবার্গ, স্যামসন এইচ, এদেরকেই এখন সাফল্যের আইকন হিসেবে তরুণ প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে। যেকোনভাবেই হোক, অগুনতি টাকা উপার্জন করতে পারাটাই যেন ‘সাফল্য’। প্রতিটি সফলতাই পার্থিব জীবনকে কেন্দ্র করে। প্রতিটা সফলতার পেছনেই আছে দুনিয়াবি চিন্তা। একেক জনের দৃষ্টিভঙ্গি একেকরকম হওয়া সত্ত্বে মূলগতভাবে সবার চিন্তাধারা একই। আর তা হচ্ছে নিজের চোখে, সমাজের মানুষের চোখে, পার্থিব দৃষ্টিকোণ থেকে সফল হওয়ার আকাঙ্ক্ষা।

চাওয়াটা যতক্ষণ বৈধ ততক্ষণ এতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু একজন মুসলিমের জীবনে—যে ব্যক্তি নিজের ইচ্ছেকে সঁপে দিয়েছেন মহান আল্লাহর কাছে—তার কাছে সফলতা কেবল দুনিয়াবি চাওয়া-পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সীমাবদ্ধ নয় নিজের কিংবা সমাজের দৃষ্টিকোণের সীমিত গণ্ডির মধ্যে। এমন ব্যক্তির কাছে সফলতার সংজ্ঞা অনেক বেশি প্রশস্ত। অনেক বেশি বাস্তব। অনেক বেশি সত্য। এই সফলতাই চূড়ান্ত সফলতা; কারণ, যে ব্যক্তি আল্লাহর চোখে সফল সে-ই প্রকৃত অর্থে সফল। তার এই সফলতা চিরন্তন। শাশ্বত। একজন মুসলিমের কাছে সফলতার সংজ্ঞাটা সত্যি চমৎকার। পৃথিবীর জীবনের কোন লাভ, ক্ষতি, প্রাপ্তি বা অপ্রাপ্তিতে তাদের জীবনের সফলতা বা ব্যর্থতা নির্ধারিত হয় না। তাদের কাছে পৃথিবীর সবকিছুই আপাতদৃষ্টিতে পরীক্ষা। পরকালে পুরস্কৃত হওয়াটাই হলো একজন মুসলিমের জন্য সত্যিকার সফলতা।

কী বলে মুসলমানের দায়িত্বের বিষয়ে পবিত্র কুরআন ?

পবিত্র কোরআনের সূরা বাকারা (আয়াত ১৮৯), সূরা আলে ইমরান (আয়াত ১৪৪), সূরা আল মুমেনুন (আয়াত ১-১১), সূরা আন নূর (আয়াত ৬২), সূরা আশ শোয়ারা’র (আয়াত ৯০) মানুষের শ্রেণি বিভাগ এবং তাড়না ও আচরণের মিশ্রণ মানবিক বিকাশের ধারাক্রম বর্ণনা করা হয়েছে। যার ভিত্তিতে মানুষের জীবন বিকাশের পর্যায়গুলো হলো-

মানুষের মধ্যে রয়েছে আল্লাহর প্রভুত্বে বিশ্বাসী মুমিন। তার ওপরের স্তরে রয়েছে সচেতনভাবে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পনকারী মুসলিম। তার ওপরের স্তরে রয়েছে আল্লাহর সব হুকুম-আহকাম সতর্কভাবে পালনকারী মুত্তাকি। আর সর্বোচ্চ স্তরে রয়েছে সৎকর্মপরায়ন মোহসিনিন। মানবজীবনের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছার অভিলাষে তিলে তিলে অগ্রসর হতে হয়। গড়ে তুলতে হয় কোরআন ও সূন্নাহভিত্তিক জীবন-যাপন প্রণালী। আমরা প্রত্যহ ফজরের নামাজ সমাপনান্তে দিনের কর্মকাণ্ডের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করি। নিজ নিজ পেশা ও কর্মে আমরা পূর্ণ সফলতা প্রত্যাশা করি।

একজন মুসলমান কীভাবে জীবনে সাফল্য লাভ করবেন?

কিন্তু ‘কিভাবে জীবনে সফলতা লাভ করা যায়’- এটা জানতে হলে মানবজাতির উদ্দেশ্যে আল্লাহতায়ালার প্রথম নির্দেশনার দিকে লক্ষ্য করতে হয়। আর সেটা হলো- ‘পড়!’ অর্থাৎ পাঠ ও অধ্যয়নের নির্দেশ। অতএব নিত্য দিনের যথোপযুক্ত কর্মের শুরুতে আমাদেরকে পড়তে হবে আল্লাহতায়ালার কিতাব- আল কোরআন। যেখানে রয়েছে মানবজাতির দিশা। ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের বহুবিধ সমস্যার সমাধান এবং সঠিক পথের দিক-নির্দেশনা। পবিত্র কোরআনে তাগিদ দেওয়া হয়েছে যে, আমরা যে কাজই করি না কেন, প্রতিটি কাজ যেন আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে সূসম্পন্ন হয়। একই সঙ্গে মানুষকে উদ্যমী ও পরিশ্রমী হতে বলা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছে, ‘ফলাফলের জন্য বিশ্বাসীরা আল্লাহর ওপরই নির্ভর করবে এবং ধৈর্য ধারণ করবে।’-সূরা ইবরাহিম: ১১-১২

এ প্রেক্ষাপটে আমাদের সামনে সফলতার আদর্শ হচ্ছেন পবিত্র কোরআনের ভাষায় অনুসরণীয় উত্তম আদর্শ মহানবী (সা.) জীবন।

কিশোর বয়সে তিনি ছিলেন সমাজহিতৈষী, সত্যবাদী, চরিত্রবান, সংঘাত নিরসনে উত্তম ও ন্যায়সঙ্গত সমাধানকারী ও বিশ্ব আমানতদার ‘আল-আমিন’। পারিবারিক জীবনে তিনি ছিলেন আদর্শ স্বামী ও স্নেহময়-দায়িত্ববান পিতা। সামাজিক জীবনে তিনি ছিলেন সদাচারী ব্যক্তিত্ব, উপকারী প্রতিবেশী, সৎ ও সফল ব্যবসায়ী, দানবীর, আধ্যাত্মিক সাধনায় সিদ্ধ পুরুষ শ্রেষ্ঠ, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন কূটনীতিক, কৌশলী সমর নেতা, আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক, ত্যাগ-ক্ষমা-মহত্ত্বে অতুলনীয় আদর্শ, দুর্বল, সংখ্যালঘু ও নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার শ্রেষ্ঠতম সংগ্রামী।

অতএব মানুষের জন্য হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ও সূন্নাহ হচ্ছে জীবনের সফলতার একমাত্র পরীক্ষিত পাথেয়।