একজন শিক্ষক ব্যক্তির অন্তর থেকে, সমাজের ভেতর থেকে অন্ধকার দূর করেন

Private boarding school with female muslim students in lecture
© Mehreen Fn | Dreamstime.com

শিক্ষকরা হচ্ছেন মানুষ গড়ার কারিগর। একজন শিক্ষার্থীর প্রকৃত রূপে মানুষ হয়ে গড়ে ওঠার পেছনে বাবা মার চেয়ে শিক্ষকের অবদান কোন অংশেই কম নয়। মহান রাব্বুল আলামিন শিক্ষকদের মর্যাদা ও সম্মান দান করেছেন। তাই সমাজে শিক্ষক বিশেষ মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী।

শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড। আর এই মেরুদণ্ড সোজা রাখতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করে শিক্ষকরা। শিক্ষাকে যাবতীয় উন্নয়নের চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হলে, শিক্ষকের ভূমিকার গুরুত্ব অপরিসীম। বলতে গেলে এর বিকল্প নেই। পবিত্র কোরআনে নাজিলকৃত প্রথম আয়াতে জ্ঞানার্জন ও শিক্ষা সংক্রান্ত কথা বলা হয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেনঃ “ পড়ো! তোমার সৃষ্টিকর্তা প্রভুর নামে। যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন নিষিক্ত ডিম্ব থেকে। পড়ো! তোমার প্রতিপালক মহান দয়ালু। তিনি মানুষকে জ্ঞান দিয়েছেন কলমের। আর মানুষকে শিখিয়েছেন, যা সে জানত না। “ (সূরা আলাক, আয়াত ১-৫)।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা জ্ঞান অর্জন কর! এবং জ্ঞান অর্জনের জন্য আদব শিষ্টাচার শেখ। তাকে সম্মান কর যার থেকে তোমরা জ্ঞান অর্জন কর।’ (সূত্র : আল-মুজামুল আউসাত, ৬১৮৪)।

অন্যদিকে, আসহাবে সাহাবার মধ্যে পাওয়া যায়, হজরত শাবি থেকে বর্ণিত- একবার হজরত জায়েদ ইবনে সাবেত (রা.) তার সওয়ারিতে ওঠার জন্য রেকাবে পা রাখলেন। তখন ইবনে আব্বাস (রা.) রেকাবটি শক্ত করে ধরেন। তখন জায়েদ ইবনে সাবেত (রা.) বললেন, হে রাসুলুল্লাহর (সা.) চাচাতো ভাই, আপনি হাত সরান। উত্তরে ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, না, আলেম ও বড়দের সঙ্গে এমন সম্মানসূচক আচরণই করতে হয়। (সূত্র : আল ফকিহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ, ২/১৯৭)।

খেলাফতের যুগেই ইসলাম শিক্ষাকে সকলের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। শিক্ষকদের জন্য সম্মানজনক সম্মানীর ব্যবস্থা করা হয়েছিল যাতে শিক্ষাকে সহজলভ্য করা যায়। যদিও দ্বীন শিক্ষার শিক্ষকরা শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই জ্ঞান বিতরন করে থাকতেন। আর তারা যেহেতু নিজেদের জীবিকার পেছনে ব্যতিব্যস্ত সময় পার না করে, শান্ত-সৌম্য মস্তিষ্কে জ্ঞান বিতরণের পবিত্র কাজে আত্মনিয়োগ করেছেন, তাই তৎকালীন খেলাফত ব্যবস্থা বা সরকার তাদের সম্মানে অভিষিক্ত করেছিলেন। তাদের জ্ঞান বিতরণের এ মহৎ কাজকে সম্মান জানিয়ে তাদের পরিবার-পরিজনের যাবতীয় আর্থিক খরচ বহন করেছিলেন। যেন জীবনের তাগিদে শিক্ষকদের ভিন্ন কোনো পথে পা বাড়াতে না হয়।

উমর (রা.) ও উসমান (রা.) তাদের শাসনামলে শিক্ষা ব্যবস্থাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তারা শিক্ষকদের জন্য বিশেষ সম্মানীর ব্যবস্থা করেছিলেন। আবদুর রহমান ইবনুল জাওজি (রহ.) তার বিখ্যাত ‘সিরাতুল উমরাইন’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) হজরত ওসমান ইবনে আফ্ফান (রা.)-এর যুগে মুয়াজ্জিন, ইমাম ও শিক্ষকদের সরকারি ভাতা দেওয়া হতো। (কিতাবুল আমওয়াল, পৃষ্ঠা: ১৬৫)।

সত্যিকার অর্থে একজন প্রাজ্ঞ, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, বিচক্ষণ শিক্ষক সমাজ বদলে দেয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারেন। একজন আদর্শবান শিক্ষকই পারেন একটি আদর্শবান সমাজ প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করে দিতে। একজন শিক্ষক সমাজের সকল নেতিবাচকতা, অন্ধকার দূর করে জ্ঞানের আলো দিয়ে আলোকিত করতে পারেন। এজন্যই শিক্ষককে শুধুমাত্র তার পেশার মানদন্ডে পরিমাপ করা যাবে না। কারণ সত্যিকারের জ্ঞান মানুষকে মুক্তির পথ দেখিয়ে থাকে। নবী (সা.) বলেন, ‘দুই ব্যক্তি ব্যতীত অন্য কারও পদ-গৌরব লোভনীয় নয়। তা হলো- ১. ধনাঢ্য ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ ধন-সম্পদ দান করেছেন এবং তা সৎপথে ব্যয় করার ক্ষমতা দিয়েছেন; ২. ওই ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ বিদ্যা দান করেছেন এবং সে অনুসারে সে কাজ করে ও অপরকে শিক্ষা দেয় (বুখারি :৭১)।

রাসুল (সা.) শিক্ষা, শিক্ষা উপকরণ, শিক্ষক ও শিক্ষার বিস্তৃতিকরণে সদা সচেষ্ট ছিলেন। তাই তো প্রিয় নবী (সা.) বদরের যুদ্ধবন্দিদের মুক্তির জন্য মদিনার শিশুদের শিক্ষা দেওয়ার চুক্তি করেছিলেন। যার মাধ্যমে তিনি বন্দিদের মুক্তির ব্যবস্থা করেছিলেন, যা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল।

পরিশেষে নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, একজন সত্যিকারের আদর্শবান, ন্যায়-নীতি সম্পন্ন শিক্ষক ব্যক্তির অন্তর থেকে, সমাজের ভেতর থেকে অন্ধকার দূর করে আলো দ্বারা আলোকিত করতে পারেন। যে আলোয় একজন ব্যক্তির স্রষ্টার নৈকট্য পেতে সুবিধা হয়।