এতিম সন্তানের দায়িত্ব গ্রহণে উৎসাহ দেয় ইসলাম

katherine-chase-uNNvGTSwFtw-unsplash
Fotoğraf: Katherine Chase-Unsplash

পবিত্র ধর্ম ইসলামে অন্য কারো সন্তান লালন-পালন এবং তার অভিভাবক হওয়ার অনুমতি রয়েছে। এতিম, অসহায়, দরিদ্র, গৃহহীন , অবহেলিত শিশুকে নিজের সন্তানের মত করে মানুষ করার জন্য অন্ন বস্ত্র বাসস্থান মায়া মমতা ভালোবাসা দিয়ে স্বেচ্ছায় লালন-পালন করতে চাইলে তা ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। বরং ইসলাম দায়িত্ব গ্রহণকে আরো উৎসাহিত করে।  ইসলামে ধরনের কাজকে অনেক বেশি সওয়াবের কাজ বলে ঘোষণা করেছে। নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেন, ‘আমি ও এতিমের অভিভাবক জান্নাতে দুই আঙুলের ন্যায় অতি কাছাকাছি থাকব।’ (বুখারি : ৬০০৫) নবী করিম (সা.) আরো ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি এতিমের খোরপোশ ও লালন-পালনের যাবতীয় দায়িত্ব গ্রহণ করে, আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাত দান করবেন।’ (তিরমিজি : ১৯১৭)।

দত্তক নেওয়ার সময় এমনভাবে চুক্তিপত্র তৈরি করা বা ক্ষতি করা যাবে না যে সন্তানের জন্মদাতা পিতা মাতা আর কখনোই বাবা-মা হিসাবে তার কাছে পরিচয় প্রকাশ করতে পারবে না।  ইসলাম এ কাজকে সমর্থন করে না।  ইসলাম অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে বলেছে,  সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করতে বলেছে। কিন্তু তার প্রকৃত পরিচয় বিলুপ্ত করার অধিকার দেয়নি।  বর্তমান সময়ে আমরা দেখে থাকি গরীব মা বাবারা তাদের সন্তানকে অর্থের বিনিময় দত্তক দেন।  এ ধরনের কাজকে ইসলাম কখনই  অনুমতি দেয় না। এই কাজটি শুধু অমানবিকই নয়, ঘৃণ্য।

নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘কিয়ামতের দিন আমি তিন ব্যক্তির প্রতিপক্ষ হব—এক. ওই ব্যক্তি, যে কোনো কাজে আমার নামে কারো সঙ্গে কসম করার পর তা ভঙ্গ করেছে। দুই. যে ব্যক্তি কোনো স্বাধীন মানুষ বিক্রি করে সম্পদ অর্জন করেছে। তিন. আর যে ব্যক্তি কোনো লোক দিয়ে কাজ করিয়ে তার বিনিময় দেয়নি।’ (বুখারি : ২২২৭)।সন্তান পালক নিলে ইসলামী শরিয়তে তার কোনো বিধানই পরিবর্তন হবে না; বরং তার আগের মা-বাবা ও আত্মীয়পরিচয় এবং মা-বাবার অভিভাবকত্বের অধিকার যথারীতিই বাকি থাকবে। এককথায় পালক নেওয়ার আগে-পরের বিধান অভিন্ন। সন্তান লালন-পালনকারী ব্যক্তির সওয়াব পাওয়াটাই এখানে মৌলিক বিষয়।

সন্তানকে স্নেহ করে ছেলেমেয়ে ডাকতে পারবে। তবে এটা মনে করার সুযোগ নেই যে পালক নেওয়ায় সন্তানের আসল মা-বাবা থেকে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে। এখন লালনকারীই তার সব কিছু—এটা মনে করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এটি জাহেলি যুগের কুসংস্কার। কোরআনে কারিমে বিষয়টি কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। (তাফসিরে ইবনে কাসির ৬/৩৩৭, সুনানে আবু দাউদ : ১৯৪০)

রাসুলুল্লাহ (সা.)-ও জায়েদ নামে এক সাহাবিকে দত্তক নিয়েছিলেন। তাঁর পিতার নাম ছিল হারেসা। তাঁকে সবাই জায়েদ ইবনে মোহাম্মাদ—অর্থাত্ মোহাম্মাদের পুত্র বলে ডাকত। কোরআনে বিষয়টি নিষেধ করে দেওয়া হয়। পরে সবাই তাঁকে জায়েদ ইবনে হারেসা বলেই ডাকা আরম্ভ করে।

কোরআনে কারিমে মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আর আল্লাহ তোমাদের পোষ্যপুত্রদের তোমাদের পুত্র করেননি, এগুলো তোমাদের মুখের কথা মাত্র। আল্লাহ সঠিক কথা বলেন এবং সরল পথ প্রদর্শন করেন। তোমরা তাদের পিতৃপরিচয়ে ডাকো। এটাই আল্লাহর কাছে ন্যায়সংগত বিধান। যদি তোমরা তাদের পিতৃপরিচয় না জানো, তবে তারা তোমাদের ধর্মীয় ভাই ও বন্ধুরূপে গণ্য হবে।’ (সুরা আহজাব : ৪-৫)।

রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি জেনেশুনে নিজের পিতাকে ছাড়া অন্য কাউকে পিতা বলে দাবি করে, তার জন্য জান্নাত হারাম।’ (বুখারি : ৪৩২৬)

এ জন্যই যুগশ্রেষ্ঠ ফকিহ মুফতি শফি (রহ.) বলেন, ‘লালন-পালনকারীকে সম্মান ও কৃতজ্ঞতাস্বরূপ মা-বাবা ডাকা বৈধ হলেও অনুত্তম ও অনুচিত। কেননা এতে জাহেলিয়াতের কুসংস্কারের সঙ্গে সাদৃশ্য হয়ে যায়। ইসলাম এ ধরনের সাদৃশ্য পছন্দ করে না।’ (আহকামুল কোরআন : ৩/২৯২)

সন্তানকে যিনি বা যারা লালন পালন করলেন তাদের মৃত্যুর পর ওই সন্তান উত্তরাধিকার হিসেবে তাদের সম্পত্তি থেকে কোন প্রকার অংশ পাবে না।  তবে লালনকারী জীবন দশায় যদি কোন সম্পত্তি দান করেন তাহলে তা জায়েজ হবে।