এমব্রয়ডারি: ইসলামের এক প্রাচীন কারুশিল্প

শিল্প ১২ এপ্রিল ২০২১ Contributor
ফিচার
embroidery
Photo : Dreamstime

এমব্রয়ডারি বা সেলাইয়ের কারুকাজ মধ্যযুগের ইসলামী দুনিয়ার অন্যতম এক চারুশিল্প। সপ্তদশ শতকের তূর্কী পর্যটক ইভিলিয়া সেলেবির লেখা থেকে জানা যায় মধ্যযুগের ইসলামে এর গুরুত্বের কথা। সেলেবি বলেছেন, এমব্রয়ডারি আসলে দুই হাতের দশ আঙুলের শিল্প। বিশেষ করে, মধ্যযুগের মুসলমান অভিজাতদের কাছে এর আদর ছিল প্রভূত।

দামাস্কাস, কায়রো বা ইস্তানবুলের মতো শহরগুলিতে হিজাব, বোরখা, রুমাল, পতাকা, নানাবিধ আবরণ এমনকি চামড়ার বেল্টেও দেখা মিলত সূক্ষ্ম সুতোর কারুকাজের। কোনও কোনও শিল্পী বেছে নিতেন সোনা বা রুপোর সূক্ষ্ম মাকড়সার জালের মতো মিহি সুতো। এমনকি, মক্কার পবিত্র কাবা পাথরের চারপাশের সুতোর কাজ করা নানা বস্ত্র সাজানো রয়েছে।

তখনকার দিনে, এক একটি সেলাইশিল্প অন্নসংস্থান করত প্রায় ৮০০ মানুষের।

ইসলামী এমব্রয়ডারি ও তার ইতিহাস

মধ্য এশিয়ার ছোট ছোট স্বাধীন ইসলামী রাজ্যগুলো থেকেই মধ্য প্রাচ্যে সুতোর কাজের প্রচলন শুরু হয়। যদিও, অনেকেই এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য উভয়কেই এমব্রয়ডারির জন্মস্থান বলে মনে করেন। তবে, ইতিহাস বলে অন্য কথা। বাইজান্টিয়াম ও সাসানিয় উভয় সাম্রাজ্যের শাসকদের কাছে খুব আদরণীয় ছিল এমব্রয়ডারি বা সূচিশিল্প। বিশেষ করে, সাসানিয় শাসকরা নিজেদের পোশাকের উপর সুতোর কাজ করা মানুষ বা প্রাণীর ছবি পছন্দ করতেন। বয়নশিল্পের পণ্ডিতদের মতে, বর্তমানের টি শার্ট মোটিফের সঙ্গে এর মিল রয়েছে।

তবে আমাদের প্রিয় নবী রাসুল (সাঃ) সুতোর কাজের নকশা হিসেবে গাছ পালা ও ফুলই বেশি পছন্দ করতেন। সে কারণে এখনও ইসলামে সূচিশিল্পে ফ্লোরাল নকশার রমরমা।

ষোড়শ শতকে, মোগল শাসক আকবরের জীবনীকার আবু আল-ফজল লিখলেন তাঁর বিখ্যাত বই, আইন-ই-আকবরি। সেখান থেকেই আকবরের ও সমগ্র মোগল পরিবারের এমব্রয়ডারি তথা সূচিশিল্পের প্রতি আকর্ষণের কথা জানা যায়।

ইসলামী সংস্কৃতিতে এমব্রইয়ডারির স্থান বেশ উঁচুতে। ধরে নেওয়া হয়, সূচিশিল্পের মাধ্যমে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও বস্তুকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি নেওয়া হয়। সেই জন্যই মসজিদে সূচিশিল্পের কাজ করা ট্যাপেস্ট্রি টাঙানো থাকে। নবজাতকের গায়ের আবরণে সুতোর কাজ করে কুরআনের সুরা লেখা হয়।

এমব্রয়ডারির বিভিন্ন ধরন

সমগ্র ইসলামী সংস্কৃতি জুড়ে নানা রকম সূচিশিল্পের বিবরণ ও উদাহরণ পাওয়া যায়। যেমন, উইঘুর মুসলমান রমণীরা ফেল্টের সুতোর কাজ করা আচ্ছাদন ব্যবহার করেন তাঁদের হিজাবের নীচে।

মরক্কো ও টিউনিশিয়াতে পরদা ও আয়নার ঢাকার কাপড়ে সাটিনের সুতোর সূক্ষ্ম কারুকাজ করা হয়। সাটিনের সুতোর ব্যবহার দেখা যায় আরব বেদুইনদের মধ্যেও। এটিকে বলা হয় খিয়ায়ত আল মাদ্রাসা, কারণ মূলত মাদ্রাসায় পাঠ নেওয়ার সময় এই সেলাইটি শেখানো হয়। এই এমব্রয়ডারিটি বিছানার চাদর, পর্দা বা দস্তকরখানের উপর করা হয়। মেয়েদের কোমল হাতের প্রভাবে ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে রংবাহারি ফুল অথবা পাতার নকশা।

ক্রস স্টিচ, হেরিংবোন স্টিচ, কাউচিং ও চেন স্টিচ দেখা যায় সিরিয়া, জর্ডন, প্যালেস্টাইন ও সিনাই অঞ্চলে। আফগানিস্তানে কাউচিং ও হেরিংবোন স্টিচের মাধ্যমে নববধূর পোশাক সজ্জিত করা হয়।

মধ্য এশিয়ায় সূচিশিল্পের মাধ্যমে বানানো হয় নানা সুজনি। এই সুজনিগুলি শাদি বা কোনও উৎসবে ব্যবহার করা হয়। শাদির পর বর-কনের বিছানায় বিছিয়ে দেওয়া হয় সুতোর কাজ দিয়ে ডালিম আঁকা সুজনি। পবিত্র ইসলামে ডালিম মানে শিশু জন্মের বার্তা দেওয়া।

এমব্রয়ডারির অর্থ

প্রাচীন ইসলামী সংস্কৃতিতে সূচিশিল্পের মতো অর্থবোধক শিল্প খুব কমই রয়েছে। জীবনের সমস্ত পর্যায়ের ইঙ্গিত পাওয়া যায় রংবেরঙের সুতোর কাজে। জন্ম, পরিণত হওয়া, মৃত্যু ও পুনর্জন্ম… সবই ফুটে ওঠে সূচ ও সুতোর কারুকাজে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কার্পেট ও পরদায় প্রায়শই একটি পবিত্র গাছের কারুকাজ দেখা যায়। এটি আসলে জীবনবৃক্ষ। মানবজীবনের বিভিন্ন আঙ্গিক তুলে ধরে এই শিল্পকর্মটি।

এক নজরে এই শিল্পটির দিকে তাকালে বোঝা যায়, সুতোর ফাঁকে ফাঁকে ইসলামী ইতিহাস ও সংস্কৃতির ঐতিহ্য বহন করে চলেছে এমব্রয়ডারি।