ওয়াটার বার্থ: জলের মধ্যে জন্ম দেওয়ার পদ্ধতি কতটা কার্যকর?

স্বাস্থ্য ০৮ জানু. ২০২১ Contributor
জানা-অজানা
ওয়াটার বার্থ
© Anastasiia Tymashova | Dreamstime.com

শিশুরা আল্লাহর রহমত। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে যে আল্লাহ আমাদের প্রতি উপহার স্বরূপ শিশুদের প্রদান করেন। তাই যেকোনও মানুষের কাছে শিশুর জন্ম এক মহামূল্যবান পবিত্র মুহূর্ত।
২০২০ আমাদের কাছে এক অভিশপ্ত বছর ছিল, আর ২০২১ এসেছে নতুন সম্ভাবনা নিয়ে। আর নতুন সম্ভাবনা শিশু ছাড়া আর কে-ই বা এনে দিতে পারে। বিজ্ঞানীরা আন্দাজ করছেন ২০২১ সালে পৃথিবীতে সম্ভাবনা ও আশার আলো নিয়ে অজস্র শিশু জন্মাবে।
তাই, যদি আপনি সন্তানসম্ভবা হন তাহলে আপনি ২০২১ সালে ওয়াটার বার্থ বা জলের মধ্যে জন্ম দেওয়ার পদ্ধতি চেষ্টা করতে পারেন।

প্রসবের আগে ওয়াটার বার্থ সম্পর্কে বিশদে জানুন

ওয়াটার বার্থ ব্যাপারটা সম্পর্কে, সত্যি কথা বলতে কী,আমার নিজের কোনও সম্যক ধারণা ছিল না। আমার ডাক্তার আমাকে প্রথম এই বিষয়ে জানিয়েছিলেন। তারপর আমি নিজে এই বিষয়ে খানিক পড়াশুনো করলাম।
ওয়াটার বার্থের নানাবিধ উপকারিতা আমাকে চমৎকৃত করার পর আমি ডাক্তারকে খুব দৃঢ়ভাবে বলেছিলাম আমি ওয়াটার বার্থই চাই। শুধু, সন্তান যে মুহূর্তে জন্মাবে তার আগের মুহূর্তে আমি জল থেকে উঠে আসতে চাই।
ডাক্তার আমার কথায় সম্মত হয়েছিলেন। আমি বলতে পারি, আজ পর্যন্ত আমার জীবনের অন্যতম আনন্দময় মুহূর্তের একটি হল আমার মেয়ের জন্মের মুহূর্ত। আর সেটার সঙ্গে কোনও চরম ব্যথার অনুভূতি নেই।
এর একটাই কারণ, আমি ওয়াটার বার্থ পদ্ধতিতে জন্ম দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।

জলের প্রসবের ইতিহাস

অনেকে মনে করেন, হাসপাতালে জন্ম দেওয়ার সময় অতিরিক্ত ওষুধপত্রর প্রভাবে সন্তানকে জন্ম দেওয়ার যে তৃপ্তি, তার অনেকটাই আমাদের বিস্মৃতির অন্তরালে চলে যায়। আমরা বেশ খানিকটা সময় আচ্ছন্ন থাকি।
যদি হাসপাতালে এবং বাড়িতে ওয়াটার বার্থের ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে অনেক কম ওষুধে সজাগ অবস্থাতেই সন্তান জন্ম দিতে পারা যাবে।
ওয়াটার বার্থ পদ্ধতি খুব সহজ। লেবার পেন শুরু হলে মা কে গরম জলের টাবের মধ্যে বসিয়ে দিতে হবে। গরম জলের প্রভাবে মায়ের তলপেটের পেশির সঞ্চালন হবে সহজে, ফলে ব্যথা কমবে। সন্তান জন্ম হয়ে উঠবে প্রায় ব্যথাহীন ও আনন্দময়।  আমাদের কাছে ওয়াটার বার্থ একটি নতুন জিনিস, একটি নতুন মুভমেন্ট। কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে সারা বিশ্বের নানা দেশে ওয়াটার বার্থের প্রচলন রয়েছে। জাপানে একসময় মহিলারা সমুদ্রজলে পরিপূর্ণ পুলে সন্তান জন্ম দিতেন।
ফিনল্যান্ডে সওনার মধ্যে সন্তান জন্ম দেওয়ার প্রচলন রয়েছে।

ওয়াটার বার্থের বহুবিধ উপকার

ওয়াটার বার্থের মূল সুবিধা হল লেবার পেনের ব্যথা অনেকটা কমে যায়। নতুন মা অনেক সহজে সন্তানের জন্ম দিতে পারে।
এছাড়াও, জলের প্লবতার জন্য মা তার যেকোনও পজিশনে বসে বা আধশোয়া হয়ে সন্তানের জন্মের জন্য অপেক্ষা করতে পারে। অর্থাৎ বলা যায়,

প্রথমত, লেবার পেনের তীব্রতা কমে।

দ্বিতীয়ত, জলের মধ্যে ওজন সংক্রান্ত সমস্যা অনেকটাই কমে যায়।

তৃতীয়ত, গরম জলের প্রভাবে পেশি ও লিগামেন্টের স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধি পায়।
পেশির সঞ্চালন সহজে হওয়ার ফলে সন্তান জন্মের জটিলতা অনেকটাই দেখা যায় না।

এছাড়াও, কিছু কিছু গবেষণাতে দেখা গিয়েছে লেবার পেনের ব্যাপ্তি অনেকটাই কমে যায়। এরফলে সন্তান জন্ম হয়ে ওঠে আরও আনন্দদায়ক।

কিছু  সাধারণ প্রশ্ন

যে সমস্ত মানুষের কাছে ওয়াটার বার্থ একেবারে নতুন জিনিস, তাদের প্রথম প্রশ্নই হয় বাচ্চার সুরক্ষা সংক্রান্ত। যদি সদ্যোজাত জলে ডুবে যায়।
যদি গরম জলের ফলে শিশুর কোনও ক্ষতি হয়, ইত্যাদি। জোহানেসবার্গের সাদিয়া সায়েদ একজন ধাত্রী ও নার্স। তিনি বলেন, ‘ এই ভয় হওয়াটা স্বাভাবিক। বিশেয করে যারা এই পদ্ধতির সঙ্গে একেবারে পরিচিত নন। কিন্তু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ধাত্রী বা নার্সের হাতে ওয়াটার বার্থ সবসময় সুরক্ষিত।”

 

শিশু মাতৃগর্ভ থেকে বেরিয়ে প্রশ্বাস নিতে পারে দুটি কারণে।

১। পারিপার্শ্বিক তাপমাত্রার পরিবর্তনের ফলে। গর্ভে একরকম তাপ থাকে, বাইরে আরেকরকম। শিশু এই তারতম্য ধরতে পারে ও শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিতা হিসাবে কেঁদে ওঠে।
২। জন্মপথের চাপ যেহেতু তাকে মায়ের জন্মস্থান থেকে নির্গত করে।

যেহেতু জলের তাপমাত্রা ও চাপ গর্ভের তাপমাত্রা ও চাপের সঙ্গে সমান রাখা হয়, তাই শিশু জলের মধ্যে জন্মালেও জল থেকে তোলা না পর্যন্ত প্রশ্বাস গ্রহণ শুরু করে না।
এছাড়া ডাক্তার নার্সরা তৎপর থাকেন শিশুর জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই তাকে জল থেকে তুলে তোয়ালেতে মুড়ে নিতে।
সুতরাং, সঠিকভাবে শিক্ষিত কোনো চিকিৎসক, নার্স বা ধাত্রী ছাড়া কখনওই ওয়াটার বার্থে সম্মত হওয়া উচিৎ নয়।

কিছু সতর্কতা

সন্তান জন্ম দেওয়া মুখের কথা নয়। আমাদের শরীরের মধ্যে একটি প্রাণ ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠছে। তারপর শরীর থেকে বাইরের পৃথিবীর আলো দেখছে।
এই অভিজ্ঞতা যেমন আনন্দে, তেমনই সবসময় সাবধানতা অবলম্বন করা উচিৎ। ওয়াটার বার্থও তার ব্যতিক্রম নয়।
ডাক্তাররা বরাবর বলে এসেছেন, সাধারণ কিছু সতর্কতা মেনে চললেই আমরা ওয়াটার বার্থ পদ্ধতিতে সন্তানের জন্ম দিতে পারব।

এই সতর্কতাগুলি হল,

১। একজন শিক্ষিত ও অভিজ্ঞ হেলথকেয়ার প্রোফেশনাল যেন জন্মের সময় থাকে।
২। গরম জলের টাব ও জল যেন পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত থাকে
৩। নতুন মা ও শিশুকে মনিটর করার ব্যবস্থা যেন সঠিক ভাবে প্রয়োগ হয়
৪।  টাব থেকে শিশুকে তুলে নেওয়ার বা মা-এর বেরোনোর পথ যেন সুগম ও সহজ হয়।
৫। জলের তাপমাত্রা যেন কিছুতেই ৯৭ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি না হয়।
৬। লেবার পেন ও সন্তান জন্মের সময় যেন নতুন মা কে প্রচুর পরিমাণ জল খাওয়ানো হয়।

ওয়াটার বার্থ আসলে এক অনন্য নতুন অভিজ্ঞতা। বিশেষ করে সন্তান জন্মের জটিলতা কমিয়ে দেওয়ায় এর জুড়ি নেই। পেনকিলার ও অন্যান্য ওষুধ যে ব্যথা বা অস্বস্তি কমাতে পারেনা, সাধারণ গরম জল সেই ব্যথা কমিয়ে সন্তান জন্মের অভিজ্ঞতা করে তোলে সহজ।
সুজান নাপিয়েরলা, যিনি ‘ওয়াটার বার্থঃ আ মিডওয়াইফস পার্স্পেক্টিভ’ নামক বই-এর লেখিকা, বলেছেন, এই পদ্ধতিতে মা ও সন্তান জীবন শুরু করে এক অনুপম যন্ত্রণাহীন আনন্দের সঙ্গে।