কতটা মারাত্মক হতে পারে শব্দ দূষণ?

ear plug

বর্তমান পৃথিবীতে নানাবিধ সমস্যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল দূষণের সমস্যা। এখন দূষণ বললেই প্রথমে মনে আসবে বায়ুদূষণ, জলদূষণ, মৃত্তিকা দূষণ ইত্যাদির নাম। এগুলো তো মারাত্মক বটেই, কিন্তু এগুলোর সঙ্গে যে দূষণের নাম আমরা করি না তা হল শব্দ দূষণ।

একটা ঘটনা দিয়ে শুরু করি,

সত্তর বছরের এক্রাম আলির হার্টের অসুখ, ডাক্তার খুব সাবধানে বাড়িতে থাকতে বলেছেন। কিন্তু এত কিছু করেও শেষ রক্ষা হল না, শব্দবাজির শব্দে ঘুমের মধ্যে তার এন্তেকাল হয়ে গেল।

শুনলে হয়তো মনে হবে যে শব্দবাজির এত ক্ষমতা? কিন্তু বাস্তব এটাই।

শব্দ দূষণ বললে কী মনে হয়?

অবাঞ্ছিত আওয়াজ। অবাঞ্ছিত শব্দ। যে সমস্ত শব্দ আমাদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করে ঘুম, মনোযোগ, ভাবনা চিন্তা ও স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে ও কানের সমস্যার সূচনা করে।মানুষের কান একটা নির্দিষ্ট সহ্যসীমা পর্যন্ত শব্দ সহ্য করতে পারে। এর বেশি হয়ে গেলেই সেই শব্দ দূষণের আওতায় পড়ে যায়। শব্দ মাপার একককে বলা হয় ডেসিবল, সংক্ষেপে । বিজ্ঞানীদের মতে ৭০ ডেসিবলের নিচে যে সমস্ত শব্দসমূহ তা কখনই দূষণ সৃষ্টি করে না। কিন্তু ৮৫ ডিবির বেশি শব্দ যদি দৈনিক ৮ ঘণ্টা করে মানুষের কানে পৌছোঁয় তবে স্বাভাবিকভাবেই তা প্রভূত ক্ষতি করে। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের মতে, ১০০ ডিবির বেশি শব্দ কানে পৌঁছলে কানের যন্ত্রণা শুরু হয়। সেক্ষেত্রে পরিণত মানুষের জন্য ১৪০ ডিবি ও শিশুদের জন্য ১২০ ডিবির শব্দসীমা লঙ্ঘন ভীষণ ক্ষতিকর।

শব্দসীমার সঠিক মাপ

কিন্তু শব্দসীমার সঠিক মাপ আমরা অনেকেই জানি না। নিম্নলিখিত তালিকায় সেই কোন পরিচিত শব্দের কী ডেসিবল তা বয়ান করা হল-

ফিসফিস করে কথা বলার শব্দ- ৩০ ডেসিবল

ফ্রিজের গুনগুন শব্দ- ৪৫ ডেসিবল

স্বাভাবিক কথা বার্তার শব্দ- ৬০ ডেসিবল

ট্রাফিকের শব্দ- ৮৫ ডেসিবল

মোটর সাইকেলের শব্দ- ৯৫ ডেসিবল

সাইরেন বা প্লেনের শব্দ- ১২০ ডেসিবল

রেসিং বা বুম কারের শব্দ- ১৪০ ডেসিবল

শব্দবাজি ও আগ্নেয়াস্ত্রের শব্দ- ১৫০ ডেসিবল

বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশ এমন শব্দচাপ ও লঙ্ঘিত শব্দসীমার সম্মুখীন হয় যে এদের মধ্যে ‘পার্মানেন্ট নয়েজ ইনডিউসড হিয়ারিং লস’ অসুখটি দেখা যায়। হ্যাঁ, কর্মক্ষেত্রের শব্দ দূষণ অনেকও ক্ষেত্রেই আমাদের ক্ষতিগ্রস্থ করে। কিন্তু তার থেকেও বেশি ক্ষতিগ্রস্থ করে সামাজিক শব্দ দূষণ।

শব্দ কীভাবে আমাদের কানে প্রবেশ করে

বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মাইক বাজানো, যান বাহনের শব্দ, নিজস্ব এম পি থ্রি প্লেয়ার চালিয়ে ভীষণ জোরে গান শোনা। শব্দবাজি, নানাবিধ গেম খেলার সময় ব্যবহৃত শব্দ ইত্যাদি ক্রমশ মানুষের শ্রবণ ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। এই ব্যাপারে সচেতন হতে গেলে আগে বুঝতে হবে শব্দ কীভাবে আমাদের কানে প্রবেশ করে-

বহিকর্ণে শব্দ প্রবেশ করলে তা প্রথমে কর্ণনালিকা দিয়ে কর্ণকুহরে প্রবেশ করে। তারপর সেই শব্দ মধ্যকর্ণ ও অন্তকর্ণে পৌঁছয়। মধ্যকর্ণে মেলিয়াস ইনকাস ও স্টেপিস নামক তিনটে হাড়ের মাধ্যমে শব্দধ্বনি অন্তকর্ণে পৌঁছয়।

শব্দ দূষণের ফলাফল

অন্তকর্ণে অবস্থির কোচেলা নামক অঙ্গটি শব্দধ্বনিকে নার্ভ ইমপালসে পরিণত করে মস্তিষ্কে পৌছিয়ে দেয়। এভাবেই আমরা শুনতে পাই। শব্দ দূষণের মাত্রা বেশি হয়ে গেলে কোচেলা বিদীর্ণ হওয়া, কানের পর্দা ফেটে যাওয়া, মেলিয়াস, ইনকাস ও স্টেপিসে চোট ইত্যাদি হতে পারে। কান খুব সূক্ষ্ম অঙ্গ, অল্প আঘাতেই ভীষণ সমস্যা হতে পারে।

তবে শব্দ দূষণের ফলাফল যেমন বধির হয়ে যাওয়া,প্রত্যক্ষ পরোক্ষ ফলাফল নিদ্রাহীনতা, কার্ডিয়াক প্রবলেম, হাইপার টেনশন, শ্বাস কষ্ট, মানসিক সমস্যা ইত্যাদি দেখা যায়।

আল্লাহ আমাদের জীবন ও দেহ দান করেছেন সুন্দর ভাবে পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্য। সেই বিষয়ে আমাদের সবসময় খেয়াল রাখা উচিত।