কত দ্রুত আমাদের বিশ্বের সম্প্রসারণ হচ্ছে? বিজ্ঞানীরা বললেন উত্তর আছে ছায়াপথের কাছে!

আবিষ্কার ২২ মার্চ ২০২১ Contributor
জ্ঞান-বিজ্ঞান
বিশ্বের সম্প্রসারণ
Photo by Alex Andrews from Pexels

আজ থেকে প্রায় ১৩৭০ কোটি বছর আগে আমাদের বিশ্বের সৃষ্টি হয়েছিল বলে মনে করা হয় এবং যে তত্ত্ব এই তথ্য দেয় তার নাম বিগ ব্যাং থিওরি। সৃষ্টির পর থেকে আমাদের বিশ্বের ঠিক কী কী ঘটেছিল এবং এখনও কী ঘটে চলেছে তার খোঁজে বিজ্ঞানীরা সর্বদা তৎপর। আর এভাবেই অঙ্ক কষে বিজ্ঞানীরা বলেছিলেন যে সার্বিক ভাবে আমাদের বিশ্বের সম্প্রসারণ ঘটছে এবং তাও একটি সুনির্দিষ্ট গতিতে। ওরেমের জাতীয় বিজ্ঞান সংস্থার অধীন NOIRLab এর বিজ্ঞানী জন ব্লেক্সলে এবং তাঁর সহকর্মী উটা ভ্যালি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী জোসেফ জেনসেনের নতুন গবেষণায় জানা গেল সেই গতির হারের নতুন পরিমাপ। তাঁদের এই গবেষণা জায়গা পেল বিখ্যাত The Astrophysical Journal এর পাতায়।

কীভাবে ঘটছে আমাদের বিশ্বের সম্প্রসারণ?

১৩৭০ কোটি বছর আগে, মনে করা হয় সমস্ত ভর-শক্তি একটি কেন্দ্র বা ক্ষুদ্র পরিসরে জমা হতে থাকে। একটা সময়ে ভর এবং শক্তি এতটাই বেশি হয়ে যায় যে তা পুরো অস্থিতিশীল অবস্থার সৃষ্টি করে এবং সেই ভর ও শক্তি সুস্থির হবার লক্ষ্যে সম্প্রসারিত হতে থাকে। এই ঘটনাকেই বিগ ব্যাং বলা হয়। বিগ ব্যাংয়ের পরের ১০-৩২ সেকেন্ড থেকে দ্রুত প্রসারণ ঘটতে থাকে এবং আয়তন প্রায় ১০৭৮ গুণ বেড়ে যায়। সোজা ভাবে বললে এ যেন ১ ন্যানোমিটারকে হঠাৎ করে টেনে ১০.৬ আলোকবর্ষ লম্বা করার মত। এরপরের ৪০০ কোটি বছর ধরে আমাদের বিশ্ব খুব ধীরগতিতে সম্প্রসারিত হতে থাকে। আজ থেকে ৯৭০ কোটি বছর আগে এই সম্প্রসারণের হার হঠাৎ বেড়ে যায় এবং বিজ্ঞানীরা মনে করেন সেভাবেই আজও আমাদের বিশ্বের সম্প্রসারণ ঘটে চলেছে। আর এই সম্প্রসারণ নিয়ন্ত্রিত হয় হাবল ধ্রুবকের (Hubble constant, H0) দ্বারা।

কী জানা গেল এই গবেষণায়?

বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাবে বিজ্ঞানী এডউইন হাবলের দেয়া এই সম্প্রসারণ ধ্রুবকের মান নির্ণয় করার চেষ্টা করেছেন বিজ্ঞানীরা। বিগ ব্যাংয়ের সময়ে সৃষ্ট মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড এর ওঠানামা এবং সৃষ্টির আদিম সময়ে বস্তুর ভরের ঘনত্বের ওঠানামা থেকে প্রাপ্ত তথ্যের বিচারে এই ধ্রুবকের মান পাওয়া গেছিল ৬৭.৪±০.৫ কিমি/সেকেন্ড/মেগাপারসেক। অর্থাৎ প্রতি ১ মেগাপারসেক (পৃথিবী থেকে ৩৩ লক্ষ আলোকবর্ষ দূর) দূরত্ত্বে থাকা কোনো ছায়াপথের নিরিখে আমাদের বিশ্ব অতিরিক্ত ৬৭.৪±০.৫ কিমি প্রতি সেকেন্ড হারে সম্প্রসারিত হয়ে চলেছে। এই নতুন গবেষণায় জানা গেল এই ধ্রুবকের মান ৭৩.৩±২.৫ কিমি/সেকেন্ড/মেগাপারসেক। যেহেতু এই ধ্রুবকের মান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে দূরের কোনো ছায়াপথের দরকার পড়ে, তাই যত দূর অব্দি পরিমাপ করা যায় ততটাই নির্ভুল তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

আমাদের বিশ্বের বিবর্তন এবং ডার্ক এনার্জি পরিমাপের ক্ষেত্রে এই ধ্রুবকের মান সঠিক ভাবে নির্ণয় করা ভীষণ জরুরি। কারণ আমাদের বিশ্বের সমস্ত বস্তুর ভর এবং শক্তির দুই তৃতীয়াংশই হল এই ডার্ক এনার্জি এবং এই ডার্ক এনার্জি বিশ্বের সম্প্রসারণ গতির হারের সাথেই তাল মিলিয়ে সম্প্রসারিত হয়ে চলেছে । আর তাই বিশ্বের সৃষ্টির কারণ বা এর বিবর্তন খুঁজতে ডার্ক এনার্জি সম্পর্কে আরো তথ্যের যোগান দরকার। এই নতুন পদ্ধতিতে পৃথিবী থেকে ৩৩ কোটি আলোকবর্ষ দূর অব্দি সর্বমোট ৬৩টি ছায়াপথের তথ্য নেয়া সম্ভব হয়েছে বর্তমান প্রযুক্তিতে। এই বছরের অক্টোবর নাগাদ হাবল টেলিস্কোপের থেকে ১০০ গুণ বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ উৎক্ষেপণের দিকেই তাকিয়ে বিজ্ঞানীরা। হয়ত আরও নিখুঁত ভাবে আমরা জানতে পারবো বিশ্ব ঠিক কত দ্রুত গতিতে বিস্তৃত হচ্ছে এবং আমাদের ভবিষ্যৎই বা কী!