কত প্রকারের বাকরখানি খেয়েছেন আপনি?

bakhorkhani

অধুনা বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহর ঐতিহাসিক বিভিন্ন দিক থেকে বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ। ঢাকা শহর জুড়ে রয়েছে কত না জানা, না বলা ইতিহাসের রেখাচিত্র। ঢাকা শহরের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য প্রসঙ্গের সূত্র ধরেই ভোজনবিলাসী ঢাকার একটা সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্যের কথা আজ আমরা আলোচনা করব। ভোরের আজান শেষে ঢাকাবাসী অনেক মানুষেরই দিন শুরু হয় চা-এর সঙ্গে মুচমুচে বাকরখানি-র সুস্বাদু আস্বাদে। বাকরখানি ঢাকাসহ বাংলাদেশের একটি অতি জনপ্রিয় খাবার। এটি হল একটি বিশেষ ধরনের রুটি। সাধারণ রুটির থেকে বাকরখানি তৈরির প্রক্রিয়া এবং খাবারের স্বাদও অনেকটা আলাদা। বাকরখানির রয়েছে একটা প্রাচীন ইতিহাস। রন্ধনবিশারদদের অনেকেই মনে করেন যে মোঘল শাসকদের হাত ধরে বাকরখানির জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়েছিল ভারত এবং ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে।

ঢাকা অঞ্চলে ‘শুখা’ নামেও পরিচিত

পুরনো ঢাকার অতিগলিতে এখনও সকালবেলাতে মানুষ বাকরখানি খায়। মূলত কোর্মা, শিক-কাবারের সঙ্গে বাকরখানি খাবারের একপ্রকার চল সেখানে রয়েছে। ঢাকার বিভিন্ন অঞ্চলে বাকরখানি আবার ‘শুখা’ নামেও বেশ জনপ্রিয়। যেহেতু বাকরখানি এই খাবারটির উৎপত্তি বেশ প্রাচীন বলেই ধরা হয়ে থাকে, তাই অনেকেই মনে করেন খুব সম্ভবত আফগানিস্তানেই এর প্রথম প্রচলন শুরু হয়। এখনও অবশ্য আফগানিস্তান এবং রাশিয়ার মুসলিম অধ্যুষিত বিভিন্ন অংশে বাকরখানি খাওয়ার একপ্রকার চল রয়েছে।

বাকরখানি তৈরির প্রক্রিয়াটিও বেশ বিস্তৃত। সাধারণত গম, দুধ, লবণ, চিনি, ডালডা, ঘি, পনির এবং খামি সংযোগে বাকরখানি প্রস্তুত করা হয়।

নামকরণ

বাকরখানির নামকরণ এবং উৎপত্তি প্রসঙ্গে শোনা যায়, মূলত নবাবী আমলের শেষের দিকে প্রভাবশালী এক জমিদার আগা বাকর খাঁ-র নাম অনুসারে এই পদটির নামকরণ করা হয়েছিল। রন্ধনবিশারদেরা আবার বাকরখানি নামকরণের মূলে বহু প্রাচীন এক প্রণয়োপাখ্যানের সূত্র খুঁজে পেয়েছেন। জমিদার আগা বাকর বরিশাল অঞ্চলের একজন প্রতিষ্ঠিত জায়গিরদার ছিলেন। তাঁর প্রেয়সী ছিলেন আরামবাগের নতর্কী খনি বেগম। কিন্তু তাঁদের প্রেম শেষপর্যন্ত পরিণতি পায়নি। আগা বাকর পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয় মুর্শিদ কুলি খাঁ-র কন্যাকে বিবাহ করেন। তবে, তাঁদের সম্পর্কের স্মৃতিচিহ্ন থেকে যায় বাকের-খনি বা বাকরখানি পদের মাধ্যমে। সুতরাং, এই ঘটনার সত্যতাকে গ্রহণ করলে দাঁড়ায় মোটামুটিভাবে অষ্টাদশ শতকে এই পদটির জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল।

প্রথম প্রচলন

একইসঙ্গে অনেকের মতে সিলেটে প্রথম বাকরখানির প্রচলন শুরু হয়েছিল। স্বভাবত এত সকল তত্ত্ব এবং তথ্যের ভিড়ে যুক্তি-প্রতিযুক্তির মাঝে ঘটনার সত্য-মিথ্যা যাচাই করা বেশ কঠিন। কিন্তু যেহেতু প্রত্যেকটি তথ্যেরই ঐতিহাসিক যুক্তি রয়েছে কাজেই কোনওটিকেই সেইভাবে অস্বীকার করা যায় না। বরং, বহুসূত্রের মান্যতা ধরেই এগিয়ে চলাটাই এক্ষেত্রে শ্রেয়। আরেকটি কথা এই প্রসঙ্গে অবশ্যই উল্লেখ করতে হয়ে বাকরখানির রয়েছে মোটামুটি তিনধরনের প্রকারভেদ যেমন-গও জোবান, শুকি এবং নিমশুকি। ‘ঢাকা পাচাশ বারস পহেলে’ বইটিতে হাকিম হাবিবুর রহমান বাকরখানির আলোচনা প্রসঙ্গে এই তিন ধরনের প্রকারের কথা উল্লেখ করেছিলেন।

বাকরখানি যারা খেয়েছেন তারা নিঃসন্দেহে এর স্বাদ সম্পর্কে বেশ ওয়াকিবহাল। তবে, এমন অনেক পাঠক অবশ্য রয়েছেন যারা বাড়িতে বাকরখানি বানাতে ইচ্ছুক। তাই তাঁদের জন্য রইল প্রয়োজনীয় রেসিপি।

বাকরখানি বানানোর প্রক্রিয়া

উপকরণ- ডোয়ের জন্য- ১ কাপ ময়দা, ১/২ চা-চামচ লবণ, ১ টেবিল-চামচ সয়াবিন তেল।

এছাড়া ১/২ কাপ সয়াবিন তেল, ১/৪ ভাগ পরিমাণ ডালনা।

প্রণালী- প্রথমে ময়দা, লবণ এবং তেল একটি পাত্রের মধ্যে নিয়ে ভাল করে পুরো মিশ্রণটিকে মিশিয়ে নিতে হবে। লক্ষ রাখতে হবে মিশ্রণের প্রতিটি উপকরণ যেন একটি অপরটির সঙ্গে ভালভাবে মিশে যায়। এরপরে একটু একটু করে পানি যোগ করে ডো-এর মতো তৈরি করে নিতে হবে। সাধারণ রুটির ডো প্রস্তুত করতে যে পদ্ধতি মেনে চলা হয়, এক্ষেত্রেও ঠিক সেইভাবেই মিশ্রণটিকে মাখতে হবে। ডো-যেন তুলনামূলকভাবে নরম হয় তা দেখতে হবে। এরপর ভেজা নিঙড়ানো কাপড় দিয়ে ডো-টিকে চাপা দিয়ে রাখতে হবে। প্রয়োজনে ভেজা কাপড়ও আপনারা ব্যবহার করতে পারেন। এরপর ৩০ মিনিট মতো রেখে দিতে হবে।

অন্য একটি পাত্রে সয়াবিন তেল এবং ডালনা নিয়ে ভাল করে মিশ্রণদুটিকে মেশাতে হবে। গলিয়ে নিতে হবে। অন্যদিকে দেখবেন ৩০ মিনিটের মধ্যে ডো-টিও ভালমতো তৈরি হয়ে গেছে। এরপর তেল ও ডালডার মিশ্রণটিকে বেলন চাকিতে ভাল করে মাখিয়ে নিতে হবে। রুটি বেলার সময়ে কোনও ময়দা ব্যবহার করা চলবে না। রুটি বেলার সময়ে পাতলা করে এবং বড় করে বেলতে হবে। বাকরখানির লেয়ার বানানোর জন্য এটি প্রয়োজন। এরপর গোল করে রুটি বেলা হয়ে গেলে রুটির উপরে তেলের মিশ্রণটি সমানভাবে হাত দিয়ে মাখিয়ে নিতে হবে, কোথাও যেন পরিমাণ কম-বেশি না হয় সেইদিকে আমাদের লক্ষ রাখতে হবে। এরপর উপর থেকে ময়দা ছিটিয়ে দিতে হবে। এরপর আবার তেলের মিশ্রণ এবং তারপর আবার ময়দা ছড়িয়ে দিতে হবে। প্রতিবারই লক্ষ রাখতে হবে ময়দা যেন তেলের মিশ্রণটিকে ভালভাবে শুষে নেয়।

ভাঁজের পদ্ধতি

এরপর ভাঁজ করতে হবে, একটা কোণা ধরে ভাঁজ করার প্রক্রিয়াটি শুরু করতে হবে। একটা কোণার সঙ্গে আরেকটা কোণা ভাল করে যোগ করে দিতে হবে। এরপর চাঁদের মতো অংশটির উপরে আবার ওই তেলের মিশ্রণটি দিতে হবে, সেইসঙ্গে ময়দা ছিটিয়ে দিতে হবে। আবারও তেল এবং ময়দা দিয়ে সেট করে দিতে হবে। এরপর আধখানা আকৃতির অংশটির দুইদিক বরাবর ভাগ করে, ভাঁজ করে নিতে হবে। ভাঁজ করে নেওয়া অংশের উপরে আবার তেল এবং ময়দার মিশ্রণ আপনাকে ছড়িয়ে দিতে হবে। এরপর বাকি অংশগুলো ভাঁজ করে নিতে হবে এবং ভাঁজ সম্পূর্ণ হলে রোল করে নিতে হবে। রোল বানানো হয়ে গেলে মাঝ বরাবার কেটে নিতে হবে। এর থেকে ছোট ছোট লেচি বানাতে হবে।

লেচি বানানোর সময়ে ভাঁজ বা লেয়ার খুলে এলে হাত দিয়ে চেপে বন্ধ করে দিতে হবে। হাত দিয়ে উপরের এবং নীচের অংশগুলো সমান্তরাল করে নিতে হবে। এরপর ছোট ছোট লেচিগুলো বেলতে হবে। ছোট ছোট আকার হবে এক্ষেত্রে। ছুঁড়ি দিয়ে মাঝ বরাবর তিনটে দাগ কেটে নিতে হবে। এরপর পুরো বিষয়টাকে বেকিং ট্রেতে নিতে হবে। ১৮০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের প্রি-হিট ওভেনে প্রায় ৩০ মিনিটের জন্য বেকড করতে হবে এই বাকরখানিগুলোকে। এইভাবেই প্রস্তুত করতে পারবেন ঢাকা স্পেশ্যাল বাকরখানি। পরিবেশন করুন গরম গরম চা-এর সঙ্গে।