কন্যা সন্তানের জন্য আদর্শ পিতা হন

father daughter praying
ID 180772482 © Odua | Dreamstime.com

আমরা সকলেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এর সেই বিখ্যাত হাদিসটি জানি যেখানে তিনি পিতার কথা উল্লেখ করার আগে তিনবার মায়ের কথা উল্লেখ করেছিলেন, এমনকি এটিকে কেন্দ করে একটি ইসলামী সঙ্গীতও আছে যা আমরা আমাদের বাচ্চাদেরকে শেখাই! মা ও সন্তানের মধ্যকার সম্পর্কের কোনো তুলনা হয় না। যাইহোক সন্তান প্রতিপালনে পিতার ভূমিকাকেও ছোট করে দেখার কিছু নেই। পিতা সন্তান প্রতিপালনে বিশেষ করে কন্যাসন্তানের ক্ষেত্রে অনেক ত্যাগ স্বীকার করে থাকেন।

ইসলাম আগমনের পূর্বে নারীদেরকে নিছক পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হত। কুরআনে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে, “তাদের কাউকে যখন কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেয়া হয়, তখন তার মুখ কালো হয়ে যায় আর সে অন্তর্জ্বালায় পুড়তে থাকে” (আল কুরআন-১৬:৫৮)

নারীদের সম্মানহীনতার এ মুহূর্তে নবীজী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর মেয়ে ফাতেমা(রাযিঃ) এর সাথে পিতা-কন্যার সম্পর্কের এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

যখন কন্যা সন্তানকে বোঝা মনে করা হত সেসময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কন্যা সম্পর্কে বলেছিলেন, “ফাতেমা আমার অংশ; যে তাঁকে সন্তুষ্ট করে, সে আমাকে সন্তুষ্ট করে। আর যে তাঁকে কষ্ট দেয়, সে আমাকেও কষ্ট দেয়”। এর ফলস্বরূপ, ফাতেমা(রাযিঃ) উম্মে আবিহা (তাঁর পিতার জননী) উপাধি লাভ করেছিলেন।

পিতা ও কন্যার মধ্যে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সম্পর্কের মাধ্যমে যুবতী মেয়েরা শারীরিক ও মানসিকভাবে নিজেদের আত্ম-প্রতিমার প্রতি আরও সন্তুষ্ট হয়ে ওঠে। এর ফলস্বরূপ, মেয়েরা তাদের জীবনসঙ্গী বা স্বামী বাছাই করার ক্ষেত্রে আরও ভাল সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হন এবং সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রেও আরও সচেষ্ট হন। ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাও এটা স্বীকার করে যে, পিতারাই আসলে তাদের কন্যাদের বৈবাহিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মায়েদের তুলনায় বেশি প্রভাব ফেলে!

এটি আকর্ষণীয়ভাবে লক্ষণীয় যে, ইসলামের সেরা দুইজন মহিলা – ফাতিমাতুয-যুহরা(রাযিঃ) ও যয়নাব আল-কুবরা(রাযিঃ) অল্প বয়সে তাদের মাকে হারিয়েছিলেন এবং তাদের পিতার দ্বারাই তারা প্রতিপালিত হয়েছেন। ফাতিমা(রাযিঃ) এর সাথে নবীজী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের সম্পর্কের তুলনা হতে পারে একমাত্র আলি(রাযিঃ) এর সাথে তাঁর মেয়ে যয়নাব(রাযিঃ) এর সম্পর্কের।

যদিও জায়নব(রাযিঃ) তাঁর মা ফাতেমা(রাযিঃ) এর চেয়েও আরও বেশি ব্যক্তিগতভাবে জীবনযাপন করতেন, তবু পিতার সাথে কাটানো সময়গুলিতে তাঁকে অনেক ত্যাগ, দুঃখ এবং অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। তিনি ‘দুঃখের জননী’ হিসেবে খ্যাত হয়ে ওঠেন।

তাঁর পরিবারের লোকেরা তাঁকে এইভাবে সুরক্ষিত করে রেখেছিলেন যে, তাঁর মৃত্যুর পরেও তাঁর পিতা উদ্বিগ্ন ছিলেন যেন তার মেয়েদের কান্নার আওয়াজ বাইরে থেকে না শোনা যায়। তাই এটি খুব আশ্চর্যজনক বলে মনে হয় যখন কারবালায় কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে, যয়নব(রাযিঃ) দৃশ্যমানভাবে কোনো পুরুষকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মত শক্তি, সাহস ও স্থিতিশীলতাময় একজন মহিলায় রূপান্তরিত হয়েছিলেন। তবুও, এটি কোনো অলৌকিক রূপান্তর ছিল না; বরং এটি তারই একটি দিক যা আলী(রাযিঃ) তার নিজের উচ্চতর চরিত্রের মাধ্যমে তাঁর মধ্যে লালন করেছিলেন যা সুকৌশলে বিনিদ্রিত ছিল এবং প্রয়োজনীয় অবস্থার অপেক্ষায় ছিল।

ইসলামি শিক্ষা অনুসারে, পিতার দায়িত্ব কেবল কন্যাকে ভালোবাসাই নয় বরং তাদেরকে উত্তমরূপে আল্লাহর দিকে পথনির্দেশ করার দায়িত্বও রয়েছে। এবং কন্যাদের দায়িত্ব সম্মানের সাথে পিতার সাথে আচরণ করা।

অধিকার সম্পর্কিত একটি কিতাব (রিসালাতুল হক)-এ ইমাম সাজ্জাদ বলেছেন, “তোমার পিতার অধিকার হল তুমি এটি জানবে যে, তিনি তোমার মূল। তাকে ছাড়া তোমার কোনো অস্তিত্বই সম্ভব ছিল না। তুমি নিজের মধ্যে সন্তুষ্টজনক যা দেখবে, জেনে রেখো তা তোমার পিতার আশির্বাদেরই ফসল”

ইমাম সাজ্জাদ আরও বলেছেন, “আপনার সন্তানের অধিকার হল আপনার জানা উচিত যে, সে আপনার থেকেই উৎসারিত এবং দুনিয়াতে তার ভাল-মন্দ উভয়ের জন্যই আপনাকে দায়ী করা হবে। আপনার উপর যার দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে তার জন্য আপনি দায়ী। যেমন তাকে ভাল আচরণ শিক্ষা দেওয়া, তাকে তার পালনকর্তার দিকে দিকনির্দেশ দেওয়া এবং তাঁর আদেশ পালনে সহায়তা করা…”

পিতা হলেন পথিকৃৎ

যদিও অনেক পিতা এটা বিশ্বাস করেন যে, কন্যাদের তাদের মায়ের সাথে সর্বাধিক সময় কাটানো উচিত, তবে এটি সর্বদাই সঠিক না। একজন মেয়ের জীবনে তার পিতা দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে, বিশেষত তার গঠনমূলক বছরগুলিতে এর গুরুত্ব অনেক বেশি। পিতাকে শ্রদ্ধা করার ভিতর দিয়েই সে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি শ্রদ্ধা করতে শিখে। তাদের সম্পর্কে সঠিক ধারণা তার মাঝে সৃষ্টি হয়। সুতরাং, পিতার প্রভাব কন্যা সন্তানের জীবনে অনেক বেশি। তাই পিতাদের উচিত এই বাস্তবতার দিকে আলোকপাত করা।