করযে হাসানা (ইসলামী ঋণ) এবং রিবা (সুদ)-এর মধ্যে পার্থক্য

dreamstime_s_172982930

সুদী কারবার বর্তমান সমাজে মহামারির ন্যায় ছড়িয়ে পড়েছে। অবস্থা এরূপ হয়েছে যে, সুদ ছাড়া বড় কোনো আর্থিক লেদদেন কল্পনাও করা যায় না। ফলে অভিশপ্ত এ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার গ্যাঁড়াকলে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে মানবজীবন।

ঋণের নামে সুদী লোন বিতরণকারী প্রচুর ব্যাংক, সমিতি ও নানা ধরনের প্রতিষ্ঠান বর্তমান দেশগুলোতে গড়ে উঠেছে। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সাবলম্বী হয়েছেন এমন লোক পাওয়া যাবে কিনা তা বলা মুশকিল। তবে সর্বশান্ত হয়েছে এমন মানুষের সংখ্যা অগণিত। তাই বিষয়গুলো নিয়ে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করা খুবই প্রয়োজন।  

একজন মুমিনের জন্য কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে তা কুরআন-হাদিসের আলোকে যাচাই করে নেওয়া জরুরী। ব্যাংকের ঋণের ক্ষেত্রে সুদ যেহেতু অন্যতম হাতিয়ার, তাই কোনো মুসলিম এতে অংশগ্রহণ করতে পারেন না। কারণ ইসলামে সুদ সুস্পষ্ট দলিলের আলোকে হারাম।

সুদের ভয়াবহতা

কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে সুদের ভয়াবহতার কথা বর্ণিত হয়েছে। যেমন, “যারা সুদ খায়, তারা হাশরের ময়দানে দন্ডায়মান হবে ঐ ব্যক্তির মতো; যাকে শয়তান স্পর্শ করে পাগল করে দিয়েছে। তাদের এরূপ অবস্থার কারণ, তারা বলেছে- ‘ক্রয়-বিক্রয়ও তো সুদী লেনদেনের মতোই’। অথচ আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয়কে করেছেন হালাল আর সুদকে করেছেন হারাম।” (আল কুরআন-২:২৭৫)

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, “তোমরা যদি সুদী লেনদেন পরিহার না করো, তবে আল্লাহর তরফ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শুনে নাও।” (আল কুরআন-২:২৭৯)

হাদিসের বর্ণনায়ও সুদের অনেক ভয়াবহতার কথা উল্লেখ রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম অভিশম্পাত করেছেন সুদদাতা, সুদগ্রহীতা, সুদের সাক্ষি ও সুদী লেনদেন লেখকের ওপর।”

এছাড়া হাদিসে উদ্ধৃত হয়েছে, “সুদের মধ্যে গোনাহের ৭৩টি স্তর রয়েছে। তন্মধ্যে সবচেয়ে নিম্নস্তরের গোনাহ হলো- আপন মায়ের সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া।”  

কুরআনের এসব আয়াত ও রাসূলের হাদিসের আলোকে এ কথাটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় যে, সুদ আর্থিক লেনদেনের একটি জঘন্য ও অভিশপ্ত পথ। সুদখোরের সঙ্গে স্বয়ং আল্লাহ যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন! তাই সুদী লেনদেনের সঙ্গে কোনোভাবেই একজন মুমিন সম্পৃক্ত পারে না।  

এ যুগে সুদের সংস্পর্শের বাইরে থাকা কিভাবে সম্ভব?

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সুদভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে সারাবিশ্বব্যাপী চলছে সেখানে এ যুগে সুদের সংস্পর্শের বাইরে থাকা কিভাবে সম্ভব? ইসলাম এর সহজ ও সুন্দর সমাধান দিয়েছে। ইসলামের মতে, এক্ষেত্রে করযে হাসানা বা সুদমুক্ত ঋণ হলো এই সুদী কারবারের বিকল্প।  

করযে হাসানা অতিপূণ্যময় একটি আমল এবং মানবতার কল্যাণে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনকারী। ইসলামের দৃষ্টিতে ঋণদাতা খুবই ভাগ্যবান একজন মানুষ।  

নবী করিম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। সে তার ওপর কোনো জুলুম করবে না। তার সাহায্য ত্যাগ করবে না। যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণ করে দেয়, আল্লাহ তার প্রয়োজন পূরণ করে দেন। আর যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের একটি বিপদ দূর করে দেয়, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার বিপদসমূহ থেকে একটি বিপদ দূর করে দেবেন।”

ঋণ দেওয়ার অর্থ হল সমস্যায় জর্জরিত ও মুখাপেক্ষী কাউকে আর্থিকাভাবে সাহায্য করা। অর্থাভাবে তার উপর যে বিপদ নেমে আসত, ঋণ দিয়ে সে বিপদ দূর করা। তাই ঋণের ব্যাপারটিও বর্ণিত হাদিসের আওতায় অবশ্যই পড়বে। কাজেই এ কথা বিনা দ্বিধায় বলা যায় যে, আল্লাহ তা’আলা ঋণদাতার প্রয়োজন পূরণ করে দেবেন এবং হাশরের ময়দানে তার বিপদ দূর করে দেবেন। আর আল্লাহ তা’আলা যার প্রয়োজন পূরণ করে দেবেন এবং কিয়ামতের কঠিন দিনে যার বিপদ দূর করবেন; তার চেয়ে সৌভাগ্যবান আর কে হতে পারে?

সুতরাং এ কথা বলা যায়, করযে হাসানা খুবই পূণ্যময় একটি আমল ও অতি উত্তম একটি ইবাদত। আর ঋণগ্রহীতা যদি কোনো কারণে ঋণ আদায়ে অক্ষম হয়ে পড়ে তবে তার ঋণ মাফ করে দেওয়া আরও উত্তম একটি আমল।  

ঋণগ্রহণ ও পরিশোধ

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, দুনিয়ায় এমন মানুষের সংখ্যা খুবই বেশি, যারা ঋণ নেওয়ার পর তা আদায়ের কথা বেমালুম ভুলে যায়। অনেকে আবার সামর্থ্য থাকার পরও ঋণ পরিশোধ করে না, কালক্ষেপণ করে। এরকম মানুষের কারণে অনেকেই করযে হাসানা দেওয়ার সাহস হারিয়ে ফেলেন। তাই এক্ষেত্রে প্রয়োজন ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতা উভয়ে খুব ভাল পরিচিত হওয়া এবং উভয়ের অন্তরে আল্লাহর ভয় জাগ্রত থাকা।

তাই আসুন, ইসলামি শরিয়তের পক্ষ থেকে ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতা উভয় শ্রেণির জন্য যেসকল নির্দেশনা রয়েছে তা সমাজে বাস্তবায়ন করি। করযে হাসানাকে প্রচারের মাধ্যমে অগ্রসর করি, সুদমুক্ত অর্থব্যবস্থা গড়ে তুলি।