বোমাবর্ষণ থেকে রক্ষা করেছিল জাপানের কোবে মসজিদ 

মসজিদ Contributor
জানা-অজানা
জাপানের কোবে মসজিদ
© Mirko Kuzmanovic | Dreamstime.com

সালটা ১৯৪৫, দ্বিতীয়  বিশ্বযুদ্ধ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। আমেরিকা, ব্রিটেন ও রাশিয়ার মিত্রশক্তি প্রায় পরাজিত কর ফেলেছে জাপান ও জার্মানির অক্ষশক্তিকে… এমন অবস্থায় ইউ এস এর নিক্ষিপ্ত বোমায় কেঁপে ঊঠল জাপানের কোবে শহর। ভীত সন্ত্রস্থ মানুষ আশ্রয় নিল এমন এক স্থানে যা কখনও এয়ার রেইড বাঙ্কার হবে বলে কেউ ভাবতেই পারেনি। জায়গাটি ছিল জাপানের কোবে মসজিদ। আল্লাহর অশেষ করুণায় সেদিন জাপানের কোবে শহরের প্রাচীন এই মসজিদ রক্ষা করেছিল শত মানুষের প্রাণ।

জাপানে ইসলামের সূচনা 

ঐতিহাসিকদের খেরোর খাতা খুললে দেখা যাবে, সপ্তদশ শতকে ইসলাম প্রথম পা রাখে এশিয়ার এই দ্বীপদেশে। মূলত আরব বণিকরা বাণিজ্যের উদেশ্যে জাপানে পা রেখেছিল। তারপর এখানকার রমণীদের সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হয়। তবে, ১৯ শতকে সহি ভাবে আমাদের পবিত্র ধ্ররম জাপানে প্রতিষ্ঠিত হয়।

তূর্কী অটোমান সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ ১৮৮৯ শতকে বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে ‘এরতুগাল’ জাহাজ প্রেরণ করেন জাপানে। সেই জাহাজ জাপান থেকে ফেরার পথে সমুদ্রে ডুবে যায়। ৯৬ জন মুসলমান সৈন্য মাত্র জীবিত ছিলেন সেই জাহাজডুবিতে। জাপান সরকার সেই জাহাজডুবিতে মৃত মুস্লমান সৈন্যদের উদ্দেশে সমাধিসৌধ স্থাপন করে। এখনও অবধি জাপান ও তুরস্কের বন্ধুত্বের সম্পর্ক অটুট।

১৯৩০ সালে এক বিপুল পরিমাণ তাতার মুসলমান রিফিউজিরা রাশিয়া থেকে জাপানে পা রাখে। কথিত আছে, জাপানে ইসলামের ভিত তারাই তৈরি করে।  ১৯৩৮ সালে টোকিয়ো শহরে গড়ে ওঠে টোকিয়ো মসজিদ। যদিও, ঐতিহাসিকদের দাবী, তার বহু আগে ১৯০৫ সালে ওসাকাতে একটি ছোট মসজিদ স্থাপিত হয়েছিল। রাশিয়া ও জাপানের যুদ্ধে যে মুসলমান সৈন্যরা অংশগ্রহণ করেছিলেন, তারা নিজেদের উপাসনার জন্য ওসাকাতে এই মসজিদটি তৈরি করেন। যদিও, তৈরি হওয়ার বেশ কিছুদিন পরেই সেটা ধূলিসাৎ হয়।

সুতরাং, নানা আলাপ আলোচনার পর পণ্ডিতরা ঠিক করেছেন, জাপানে ইসলামের সূচনাকালে যে সমস্ত মসজিদ তৈরি হয়েছিল, তার মধ্যে একমাত্র কোবে মসজিদই বর্তমান।

জাপানের কোবে মসজিদ ও রক্ষাকারী খেতাব 

উনিশ শতকে জাপানের কোবে অন্যতম বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিল। তবে, ১৯২০-এর পর থেকে এই শহরে ইসলামী প্রভাব বৃদ্ধি পেতে থাকে। অতঃপর ১৯২৮ স্ত্যহানীয় মুসলমানরা সিদ্ধান্ত নেয় নিজেদের উপাসনার জন্য মসজিদ তৈরি করবে। সেই মতো ১৯৩৫-এ জাপান সম্রাটের অনুমতি নিয়ে কোবে মসজিদ স্থাপিত হয়। আকার বা আয়তনের দিক থেকে হয়তো কোবে মসজিদ টোকিয়ো মসজিদের থেকে বেশ খানিকটা ছোট, কিন্তু এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম।

কোবে মসজিদের গঠন এতই শক্ত যে ১৯৩৪-এ জাপানি নৌসেনা মসজিদটি নিজেদের কেন্দ্র বানানোর জন্য দখল করে। এরপর ১৯৪৫-এর বোমার আক্রমণও সহজে সামলায় এই মসজিদ।

১৯৯৫ সালে জাপানে ভয়াবহ হানশিন ভূমিকম্প ঘটে, সারা জাপানে প্রায় ৬৪৩৪ জন মানুষের মৃত্যু হলেও কোবে মসজিদের গায়ে কিন্তু আঁচড়টিও লাগেনি।

কীভাবে যাওয়া যায় জাপানের কোবে মসজিদ? 

জাপানের কিতানো চো অঞ্চলের কোবে শহরের একদম মধ্যস্থলে অবস্থিত এই মসজিদ। কোবে সানোমিয়া স্টেশনের থেকে মাত্র দশ মিনিটের হাঁটা পথ।

মসজিদের বিবরণ

চেকোস্লোভাকিয়ার স্থপতি ইয়ান জোসেফ সাগারের নকশায় বানানো এই মসজিদ শুরু থেকেই নিজের মহিমায় আলোকিত। ইয়ান ১৯২৩ সালে জাপানে পা রাখেন। তাঁর নকশা করা এই মসজিদ খুব সরল ইন্দো-ইসলামী স্থাপত্য মেনে তৈরি। জ্যামিতিক ও ইসলামী নকশা কাটা এই মসজিদ মূলত তিনতলা, মসজিদের ছাদে বৃহৎ আকারের ডোম ও দুই পাশে দুটি মিনার রয়ছে।

মসজিদের ভিতরটি আবার তুর্কী মতে গঠিত। একটি মিহরাব রয়েছে, আর রয়েছে অপূর্ব সাদা পাথরের মেঝে ও দেওয়াল। দেওয়ালে সোনার পাতের কারুকাজ করা। সমগ্র মসজিদটি অপুর্ব সুন্দর বাগান দ্বারা পরিবেষ্টিত।

সবচেয়ে আগে যা চোখ টানে প্রধান উপাসনা গৃহের মস্ত বড় ক্রিস্টালের ঝাড়বাতি। মেয়েদের জন্য এই মসজিদের দোতলায় আলাদা প্রার্থনা গৃহ রয়েছে।

জাপানের কোবে মসজিদ সারা বছর খোলা। মুসলমান ও অমুসলমান দুই ধরনের মানুষই সেখানে গিয়ে প্রার্থনা করতে পারেন। বিশেষ করে , অমুসলিমদের  জন্য ইসলামের পবিত্র ধর্ম সম্পর্কে জানার সুযোগ করে দেয় এই মসজিদ।

১৭০০ শতকে ইসলামের যে ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল, তার ইতিহাস আজও বয়ে নিয়ে চলেছে কোবে শহরের নিরাভরণ এই শান্ত মসজিদ।

Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.