করোনা যেন বাংলার টিউলিপ চাষকে নিরুৎসাহ না দেয়

tulip garden
ID 14221847 © Mb2006 | Dreamstime.com

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে জাপানে কেটে ফেলা হয়েছে এক লাখেরও বেশি টিউলিপ। জাপানের রাজধানী টোকিও থেকে ৫০ কিলোমিটার পূর্বে সাকুরা ফুরুসাতো স্কোয়ারে এখন কোনো টিউলিপ নেই। রয়েছে কেটে ফেলা সবুজ ডালপালা। শুধু ফুল কেটে ফেলাই নয়, উদ্যান কর্তৃপক্ষ বার্ষিক টিউলিপ উৎসবও বাতিল করেছে। আর ফুলগুলো স্থানীয় কিছু কিন্ডারগার্টেনে দান করে দেয়া হয়েছে। করোনা সংকটে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে ও জনসমাগম যেন না হয় সে জন্য পর্যটকদের নিরুৎসাহিত করতে এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, নেদারল্যান্ডসে বর্ণিল টিউলিপের বাগান দেখতে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক পর্যটক ভিড় করে। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে সব দেশেই এখন ভ্রমণে বিধিনিষেধ রয়েছে। তাই এ বছর টিউলিপ প্রেমীদের মিস করছে ইউরোপের এই দেশ। নেদারল্যান্ডসের পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল হল্যান্ডে একটি ডাচ পরিবারের টিউলিপ ফুলের বাগান আছে। এর নাম ‘ডাচ ড্যাফোডিলস’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তাদের একটি পেজ রয়েছে। এতে একটি পোস্ট দিয়ে আশাব্যঞ্জক বার্তা দিয়েছে তারা।

হতাশ ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে ‘ডাচ ড্যাফোডিলস’ টিউলিপের মাধ্যমে বার্তা দিয়েছে। ইউরোপসহ বিশ্বের সব টিউলিপ উৎসব নিয়ে ট্রাভেল ব্লগ ‘টিউলিপস ইন হল্যান্ড’ কর্তৃপক্ষের সহায়তায় টিউলিপের বাগানে ফুলের ওপর পরিবারটি লিখেছে, ‘সি ইউ নেক্সট ইয়ার’ (দেখা হবে আগামী বছর)। এর সঙ্গে আছে হৃদয় আকৃতি।

এই চিত্রগুলির সঙ্গে মনে পড়ে যাচ্ছে সম্প্রতি বাংলাদেশেও টিউলিপের চাষ দেখেছি আমরা। গাজীপুরের শ্রীপুরে এক খণ্ড ফসলি জমিতে স্থানীয় এক দম্পতির প্রচেষ্টায় বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো টিউলিপ ফুলের বাগান গড়ে উঠেছে। বর্তমানে প্রায় এক হাজার টিউলিপ ফুলের মালিক কেওয়া দক্ষিণখান গ্রামের শেলি এবং তার স্বামী দেলোয়ার হোসেন। বাংলাদেশের আবহাওয়াতেও যে টিউলিপ ফুল ফোটানো সম্ভব বলে প্রমাণ করেছেন ফুলচাষী দেলোয়ার হোসেন।

গতবছর ডিসেম্বরের শেষদিকে তারা টিউলিপের এক হাজার বাল্ব রোপণ করেছিলেন। বাল্বগুলোর প্রত্যেকটি ২২ দিনের মধ্যে একেকটি টিউলিপের চারায় পরিণত হয়েছে। প্রায় ১৫ বছর ধরে ফুল চাষ করেন দেলোয়ার ও শেলি। বিদেশি ফুল চাষ করা যায় কি না চেষ্টা করে দেখতে তারা শুরুতে গ্লাডিওলাস নিয়ে পরীক্ষা শুরু করেন। পরে তারা লিলিয়াম এবং জারবেরা ফুল চাষের দিকে ঝোঁকেন।

২০১৭ সালে এই দুজন নেদারল্যান্ডের রয়েল ভ্যান জ্যানটেন নামের একটি প্রতিষ্ঠানে ফুল চাষের প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। সেখান থেকে তারা লিলিয়ামের ৬০ হাজার বাল্ব এবং চাষের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে দেশে ফেরেন। দেশে ফিরেও প্রতিষ্ঠানটির সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন তারা। প্রতিষ্ঠানটি তাদেরকে বিনামূল্যে এক হাজার টিউলিপের বাল্ব দেয়।
শেলি জানান, ‘জমিতে বাল্বগুলো রোপণ করার ২২ দিনের মধ্যেই ফুল ফুটতে শুরু করেছে। প্রতিদিনই এখানে অনেক দর্শনার্থী আসেন। তারা টিউলিপ বাগানে ঘুরতে চান। ফুল প্রতি ৮০ টাকা দাম দিতে চেয়েছেন কয়েকজন সম্ভাব্য ক্রেতা। কিন্তু আমরা কোনো ফুল বিক্রি করিনি।’

ফেব্রুয়ারী মাসে দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘টিউলিপ গাছের পরিচর্যা ও ফুল ফোটার জন্য কমপক্ষে ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে তাপমাত্রার প্রয়োজন। সেখানে আমাদের এলাকায় শীতে সর্বনিন্ম ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা থাকে। এর মধ্যেই এই ফুলটি ফুটেছে। দেশে যেহেতু এটাই প্রথম ফলন এবং আমার বাগানেই তা ঘটেছে তাই আমি বিক্রি করবো না। অনেক দর্শণাথী এসে ফুলগুলো দেখছেন। এটি আমাদের অর্জন, দেখতে ভালো লাগে, মানুষ আসছে দেখার জন্য। এতেই আমাদের আনন্দ। ফুল না ফুটলে হয়তো এ আনন্দ আমি টাকা দিয়ে কিনতে পারতাম না।’

টিউলিপ মূলত বর্ষজীবী গাছ ও শীতপ্রধান দেশের বসন্তকালীন ফুল। টিউলিপের প্রায় ১৫০ প্রজাতি এবং এদের অসংখ্য সংকর রয়েছে। ব্যক্তিগত উদ্যোগে কেউ কেউ চেষ্টা করেছেন টিউলিপের ফুল ফোটাতে। কেউ হয়ত সফল হয়েছেন অথবা কেউ ব্যর্থ হয়ে ভাবছেন এ পথে আর এগোবেন না। শীতপ্রধান দেশের মতো বাংলাদেশে আপনি একবার টিউলিপ লাগিয়ে বিনা পরিশ্রমে বাকি কয়েক বছর ধরে তার সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন না। আপনাকে প্রতি বছর লাগাতে হবে বাল্ব। প্রতি বছর দিতে হবে কোল্ড শক। যদিও হল্যান্ডের বেশিরভাগ গার্ডেনার টিউলিপকে অ্যানুয়াল ফুল হিসেবে জন্মাতে পছন্দ করেন। অন্যদিকে, বাংলাদেশে টিউলিপ বাল্বকে মাটিতে লাগানোর আগে অবশ্যই কোল্ড শক দিতে হবে এবং  টিউলিপের বাল্বকে বছরের সবচাইতে ঠান্ডা সময়ে লাগাতে হবে। টিউলিপ ফোটা শেষ হয়ে গেলে একটি নির্দিষ্ট সময়ে বাল্বকে উঠিয়ে ফেলতে হবে এবং পরবর্তী সময়ে চাষের জন্য অবশ্যই আবার প্রি-কুল করতে হবে। আসলে শীতপ্রধান দেশে কোল্ড শক দেয়ার জন্য ফ্রিজে রাখার দরকার পড়ে না, প্রকৃতি স্বাভাবিক নিয়মেই এই কাজটি করে থাকে। এসব দেশের তাপমাত্রা জিরোর নিচে চলে যায় শীতকালে। ফলে প্রাকৃতিকভাবেই ভারনালাইজেশনের কাজ হয়ে যায়। আর সে কারণেই গ্রীষ্মপ্রধান দেশে বাল্বগুলোকে ফ্রিজে রেখে ওদের অনুরূপ একটা পরিবেশ দেয়া দরকার হয়। সুন্দর ফুল ফোটানোর জন্য বেশির ভাগ টিউলিপের ক্ষেত্রে দরকার হয় ৮ থেকে ১৪ সপ্তাহের শীতল তাপমাত্রা।

আমরা আশা করব করোনা পরবর্তী পৃথিবীতে মানুষ যখন ঘর থেকে বেরিয়ে সৌন্দর্যনীয় স্থানগুলি উপভোগ করবেন তখন ভ্রমণ তালিকায় বাংলাদেশের এই টিউলিপ বাগানকে অবশ্যই রাখবেন। যাতে এই ফুলের আকর্ষণ বঙ্গদেশের আরও  চাষীভাইদের এই ফসল উত্পাদনে উৎসাহিত করে।