SalamWebToday নিউজলেটার
Sign up to get weekly SalamWebToday articles!
আমরা দুঃখিত কোনো কারণে ত্রুটি দেখা গিয়েছে:
সম্মতি জানানোর অর্থ, আপনি Salamweb-এর শর্তাবলী এবং গোপনীয়তার নীতি মেনে নিচ্ছেন
নিউজলেটার শিল্প

কর্ডোবার প্রথম মসজিদ: ইউরোপে ইসলামের ভিত্তিপ্রস্তর

মসজিদ ০৮ ফেব্রু. ২০২১
ফোকাস
কর্ডোবার প্রথম মসজিদ
The Mosque-Cathedral of Cordoba is the most important monument of all the Western Islamic world. © Vlad Ghiea | Dreamstime.com

ঐতিহাসিকরা বলেন, উত্তর আফ্রিকার জিব্রাল্টার প্রণালী পার হয়ে ইসলাম পা রেখেছিল পশ্চিম ইউরোপে। তারপর যে ইউরোপীয় দেশে প্রথম শান্তির বাণী ছড়িয়ে দিয়েছিল তা হল স্পেন। স্পেনের দক্ষিণতম প্রান্তের আন্দালুসিয়া ও কর্ডোবা সুমহান ইসলামিক ঐতিহ্যে সমুজ্জ্বল হতে শুরু করে সেই ৭১২ খ্রিস্টাব্দ থেকেই।

উম্মাইয়াদ বংশের প্রতিষ্ঠা কর্ডোবার প্রথম মসজিদ

অষ্টম শতকের মধ্যভাগে আন্দালুসিয়া ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলে উম্মাইয়াদ বংশের শাসন শুরু হয়। প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর মৃত্যুর পর যে চারটি পবিত্র রাজবংশ ইসলামী দুনিয়া শাসন করেছিল, উম্মাইয়াদ সেগুলির মধ্যে অন্যতম।

কর্ডোবা ও আন্দালুসিয়া প্রাথমিকভাবে এই বংশের অধীনে ছিল, কিন্তু ৭৩১ সনের আগে পর্যন্ত কর্ডোবায় কোনও সুলতান পা রাখেননি। ৭৩১ সনে, সুলতান প্রথম আবিদ আল রহমান কর্ডোবা ও আন্দালুসিয়ার শাসনভার নিজের হাতে তুলে নেন, এবং সিদ্ধান্ত নেন যে ইউরোপের প্রথম মসজিদ স্থাপন করবেন।

কর্ডোবার প্রথম মসজিদ- আবিদ আল রহমানের স্বপ্নপূরণ

এখন অবশ্য আপনি কিছুতেই কর্ডোবার বিখ্যাত এই মসজিদে নমাজ আদায় করতে পারবেন না। এর কারণ, এখন আর সেটি মসজিদ হিসাবে পরিচালিত হয় না। কর্ডোবায় পা রেখে এই বিষয়ে প্রশ্ন করলে বরং দুইরকম উত্তর পাবেন।

কেউ আপনাকে শুধু ‘ক্যাথিড্রাল’-এর দিক দেখিয়ে দেবে, কেউ অবশ্য পুরো নামটা বলবে, ‘মেজকুইটা-ক্যাথিড্রাল’। আবিদ আল রহমানের স্বপ্নের মসজিদ বর্তমানে একটি ক্যাথলিক চার্চে পরিণত হয়েছে। তাতে অবশ্য এই মসজিদের মহিমা ও অনুপম ইতিহাস কিছু মাত্র পালটায় না।

কর্ডোবা ও বিস্তৃত অঞ্চলে নিজের সাম্রাজ্য স্থাপন করার পর আল রহমান সিদ্ধান্ত নেন তিনি আন্দালুসিয়ার মুসলমানদের জন্য মসজিদ তৈরি করবেন। নিজের প্রাসাদের সংলগ্ন একটি ব্যাসিলিকা তিনি স্থানীয় খ্রিস্টানদের থেকে কিনে নেন। কথিত আছে, সুলতান কিন্তু খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে কোনও বৈরীভাব পোষণ করতেন না। উলটে, সর্বধর্ম সমন্বয়ের আদর্শ উদাহরণ ছিলেন। এরপর, ৭৮৫ সনে, ইউরোপের প্রথম বিখ্যাত মসজিদ- মেজকুইটা দা কর্ডোবা স্থাপিত হয়। ঐতিহাসিকদের মতে, এটিকে ইউরোপের সমস্ত মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর হিসাবে গণ্য করা উচিত।

কর্ডোবার প্রথম মসজিদ ও তার মাহাত্ম্য

মেজকুইটা দা কর্ডোবার সমাপ্তির পর কথিত আছে সুলতান নিজে মুগ্ধতায় মিনিট দশেক নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন সেটির সামনে। তৎকালীন যুগে, পৃথিবীর বৃহত্তম মসজিদ হিসাবে এটি পরিগণিত হত। ইবন রুশদি ও আল- ইদ্রিসির মতো পণ্ডিতেরা বলেছেন, ‘মেজকুইটার সৌন্দর্য শব্দে প্রকাশ করা অতীব কঠিন!’ দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এসে এই মসজিদে প্রার্থনা করত ও মুগ্ধ হত। বিশেষ দ্রষ্টব্য ছিল মসজিদ ঘিরে খেজুরবাগান ও জলাশয়।

আবিদ রহমানের প্রিয় মরূদ্যানের ন্যায় মসজিদের বাগানের নকশা করা হয়েছিল। কথিত আছে, সেই কারণেই সুদূর মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমি থেকে উটের পিঠে ও জাহাজে খেজুর গাছের চারা আনিয়েছিলেন তিনি।

মসজিদের স্থাপত্যশৈলী

মসজিদের অপরূপ বাগান অবশ্য এখনও আছে, তবে খেজুর গাছে জায়গা নিয়েছে নানাপ্রকার লেবু গাছ। লেবুফুলের সুমিষ্ট গন্ধ আমোদিত করে রাখে ছায়াঘেরা পথ। সেই পথ দিয়ে মেজকুইটা ক্যাথিড্রালের ভিতরে প্রবেশ করলে দেখা যাবে প্রধান হলের চারপাশে বড় বড় কাচে ঘেরা জানলা। সিলিং-এ কাচের স্কাইলাইট। আবিদ রহমানের মূল উদ্দেশ্য ছিল মসজিদের মধ্যে যেন কখনও আলো বাতাসের অভাব না হয়।

কর্ডোবার মসজিদের সবচেয়ে দর্শনীয় স্থান হিসাবে আবিদ রহমান এক বিশেষ ‘খেজুরবাগান’ তৈরির নির্দেশ দিয়েছিলেন।

মসজিদের দেওয়ালে ঘোড়ার নালের মতো আর্চ একের উপর আরেকটা অবস্থান করানোর মাধ্যমে এই কংক্রিটের খেজুরবাগান স্থাপত্যশৈলী দর্শকদের মন জয় করে নেবেই।

মসজিদের আরেকটি দৃষ্টিনন্দন বিষয় হল আবিদ আল রহমানের নিজের নকশায় বানানো মিনার। যদিও এটি বর্তমানে ক্যাথিড্রালের ‘বেল-টাওয়ার’ হিসাবে ব্যবহৃত হয়। কথিত আছে, মসজিদের মিহরাবটি দ্বিতীয় আল হাকিমের নকশা অনুসারে বানানো। যদিও, সেই মিহরব বর্তমানে আর দেখা যায় না। ১৯৩২ সালে প্রত্মতাত্ত্বিকরা ক্যাথিড্রালের নীচে খনন করে এই মিহরাবের অংশবিশেষ খুঁজে পেয়েছেন।

আদতে মসজিদের চারটি প্রবেশদ্বার ছিল, এর মধ্যে পশ্চিমের দ্বার দিয়ে সুলতান ও অভিজাতরা প্রার্থনার জন্য প্রবেশ করতেন বলে জানা গিয়েছে।

মসজিদ থেকে ক্যাথিড্রাল হওয়ার বিবরণ

১২৩৬ খ্রিস্টাব্দে খ্রিস্টানরা যখন আন্দালুসিয়া ও কর্ডোবা মুসলমানদের থেকে দখল করে নেয় তখনও কিন্তু মেজকুইটা দা কর্ডোবা তার মসজিদ মাহাত্ম্য বজায় রাখতে পেরেছিল। পরবর্তীতে মসজিদের মধ্যে একটি ছোট চ্যাপেল স্থাপন করা হয়। তখনও মুসলমান ও খ্রিস্টানদের মধ্যে সৌহার্দ্যের ভাব বজায় ছিল। কিন্তু ষোড়শ শতকে, উগ্র ক্যাথলিক ধর্মে বিশ্বাসীদের চাপে স্পেনের সম্রাট প্রথম কার্লোস মেজকুইটার খ্রিস্টীয়করণে সম্মতি প্রদান করেন। সূক্ষ্ম কারুকাজের এই মসজিদের উপাসনাগৃহে গড়ে তোলা হয় এক বিপুল আকারের ক্যাথিড্রাল।

কথিত আছে, সম্রাট কার্লোস মন থেকে এই পরিবর্তণ মেনে নিতে পারেননি, তিনি বলেছিলেন, ‘ ধর্মের হানাহানির জন্য তোমরা এমন এক স্থাপত্য নষ্ট করলে যা পৃথিবীর এক ও অদ্বিতীয় ছিল।’