কর্ডোবার যে সন্তানেরা ইসলামের নাম উজ্জ্বল করেছেন

cordoba and roman bridge
ID 55004532 © Madrugadaverde | Dreamstime.com

স্পেনের মধ্য আন্দালুসিয়া অঞ্চলের অন্তর্গত কর্ডোবা শহরটি মুসলিম উমাইয়া শাসকদের অধীনে মধ্যযুগীয় বিশ্বের অন্যতম জ্ঞানোদ্দীপ্ত শহরে পরিণত হয়েছিল। সেই আমলেই এই শহরের রাস্তার ধারে ছিল আলোর বন্দোবস্ত, প্রতিটি পাড়ায় ছিল জনগণের জন্য স্নানাগার, ছিল হাসপাতাল আর গ্রন্থাগার। শোনা যায়, এই গ্রন্থাগারগুলিতে সমগ্র উত্তর ইউরোপের তুলনায় বেশি বই ছিল। প্রকৃতপক্ষে, কর্ডোবা ছিল পশ্চিম গোলার্ধে প্রতিষ্ঠিত একমাত্র খিলাফত নগরী। এটি এমন একটি জায়গা, যা বিশ্বের বহু নামজাদা ব্যক্তিত্বের জন্ম ও কর্মস্থান ছিল। তাঁদের মধ্যে কয়েক জন ‘কর্ডোবার সন্তান’-এর প্রতিকৃতি আজও পুরো শহর জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। 

খলিফা, দ্বিতীয় আল হাকিম 

ইউরোপের সর্বপ্রথম খলিফার পুত্র, দ্বিতীয় আল হাকিম বিখ্যাত ছিলেন জ্ঞানের প্রতি তাঁর ভালবাসার জন্য। জানা যায়, বহু দূরের কুফা এবং কনস্ট্যান্টিনোপল থেকেও তিনি বই কিনতেন। তাঁর উৎসাহেই বহু গুরুত্বপূর্ণ ল্যাটিন ও গ্রীক রচনার অনুবাদ হয়েছিল আরবি-তে। বলা হত, আল হাকিমের গ্রন্থাগার ছিল মহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বেশি ভালো বই ছিল। কর্ডোবার সমকালীন সবচেয়ে উদারমনস্ক মহিলা, কর্ডোবার লুবনা ছিলেন তাঁর ব্যক্তিগত সচিব। তিনি দরিদ্র শিশুদের জন্য ২০টিরও বেশি স্কুল তৈরি করেছিলেন, শহরের প্রধান মসজিদটির প্রসারণ ঘটিয়েছিলেন। তিনি ৯৭৬ সালে মারা যান।

আল গাফেকি – চিকিৎসক ও চক্ষু বিশেষজ্ঞ

সমসাময়িক মুসলিম চিকিৎসকদের সব ধরনের কাজ সম্পর্কে পড়াশোনা করলেও, দ্বাদশ শতাব্দীর এই চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ চক্ষু বিশেষজ্ঞ হিসেবে বিশেষ দক্ষতার জন্য, বিশেষত ছানি অপসারণের দক্ষতার জন্য পরিচিত ছিলেন। আল গাফেকি সম্ভবত প্রথম আধুনিক ‘অপটিশিয়ান’ ছিলেন যিনি দৃষ্টিশক্তি ভাল রাখার ক্ষেত্রে ডায়েটের গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন। তাঁর সর্বাধিক বিখ্যাত রচনা, গাইড টু দ্য ওকুলিস্ট-কে এক অসামান্য ঐতিহাসিক, বৈজ্ঞানিক এবং সাহিত্যিক সৃষ্টি হিসাবে দেখা হয়েছিল। এর একটি অনুলিপি মাদ্রিদের কাছে এল এসকোরিয়াল মঠের গ্রন্থাগারে রয়েছে।

ইবন হাজেম, কবি-দার্শনিক ও ধর্মবিদ

মূলত জাহিরি মাজহাব (ধর্মীয় সম্প্রদায়)-এর প্রচারের জন্য বিখ্যাত ছিলেন ইবন হাজেম, যাঁকে লোকে চিনত আল আন্দালুসী আজ জাহিরী নামেও। ইবন হাজেমের জন্ম হয়েছিল দ্বিতীয় আল হাকিমের রাজত্ব শেষের পরেই। তিনি স্পেনীয় উমাইয়া সাম্রাজ্যের অবসানের সূচনার সাক্ষী ছিলেন। একজন সরকারী কর্মচারীর পুত্র হিসাবে, ইবন হাজেমকে রাজদরবারের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে লালন করা হয়েছিল, ফলে তিনি বিভিন্ন যুগান্তকারী কাজগুলি সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করেছিলেন এবং শহরের অভিজাতদের সাথে তাঁর সখ্যতা ছিল। যাই হোক, আল আন্দালুসে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে, সাম্রাজ্যের নানা এলাকায় অবৈধ ভাবে গড়ে ওঠা তাইফা রাজ্যগুলি সম্পর্কে কঠোর সমালোচনা করার ফলে ইবন হাজেম দেশত্যাগ করে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। তিনি রাজনীতি, ইতিহাস, ধর্মতত্ত্ব এবং সাহিত্য নিয়ে ৪০০ টিরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন, তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত রচনা হচ্ছে দ্য রিং অফ ডাভ – যাকে মধ্যযুগীয় সাহিত্যের একটি মাইলফলক হিসেবে গণ্য করা হয়, যা পরবর্তীকালে অন্যান্য রোমান্টিক রচনাকে প্রভাবিত করেছিল। তিনি ১০৬৪ সালে মন্টিজা গ্রামে (হুয়েলভা-তে) মারা যান।

ইবন রুশদ– দার্শনিক, ধর্মতত্ত্ববিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিকিৎসক

Muraille avec statue d'Ibn Rushd, penseur de la période Abbasside

ইবন রুশদ-কে পশ্চিমী বিশ্ব চেনে তাঁর ল্যাটিন নাম আভেরোয়েস হিসেবে। আবু-এল-ওয়ালিদ মহম্মদ ইবন আহমদ ইবন রুশদ ছিলেন কর্ডোবার অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র। ১১২৬ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই বিখ্যাত পলিম্যাথ ছিলেন কর্ডোবার শিক্ষিত অভিজাতদের অন্যতম। তিনি সেভিয়া এবং কর্ডোবা – উভয় স্থানেই কাজি অর্থাৎ বিচারকের ভূমিকা পালন করেছিলেন। তবে পরবর্তীকালে কর্ডোবায় তিনি প্রধান কাজির পদলাভ করেছিলেন। অ্যারিস্টটলের দর্শন এবং ইসলামী ধর্মতত্ত্ব, এই দুই ধারার মিশ্রণ ঘটানোর চেষ্টা করে ইবন রুশদ অনেকগুলি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত রচনা হল, কমেন্টারি অন অ্যারিস্টটল, যাকে মধ্যযুগীয় ইউরোপে হেলেনিক চিন্তাধারার ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রভাবশালী বলে মনে করা হয়। তিনি ১১৯৮ সালে মরোক্কোর মারাকেচে মারা যান।

শেষ কথা

কর্ডোবা যাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হল, প্রথমে মালাগা বিমানবন্দরে চলে আসা। তার পরে উত্তর দিকের ট্রেন ধরা। এই অট্টালিকার শহরটি এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, তবে অতীতে যখন আল আন্দালুস বিশ্বের সবচেয়ে জ্ঞানোদ্দীপ্ত শহর ছিলতখনকার কিছু কাহিনি আজও জানা যায় স্থানীয় যাদুঘরের সংরক্ষিত সংগ্রহগুলির মাধ্যমে।