কানেম-বোর্নু থেকে হাউসাল্যান্ড, ইসলামের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করেছিল পশ্চিম আফ্রিকার প্রতিটি সাম্রাজ্য 

dreamstime_s_136862190

কানেম-বোর্নু সাম্রাজ্যে ইসলাম

ত্রয়োদশ শতাব্দীতে কানেম-বোর্নু বিস্তৃত ছিল চাদ লেকের নিকটবর্তী অঞ্চল থেকে শুরু করে উত্তর দিকে ফেজান পর্যন্ত বর্তমানে কানেমের অবস্থান চাদ প্রজাতন্ত্রের উত্তরে। কানেমের শাসক উম্মে-জিলমি (১০৮৫-১০৯৭) প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন কানেম-বোর্নুর সাথে ইসলামের পরিচয় ঘটনানোর কৃতিত্ব মুহাম্মদ বি মণি নামক এক আলেমের উম্মে-জিলমি একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান ছিলেন তিনি হজ করার জন্য যাত্রা শুরু করেছিলেন, কিন্তু মক্কায় পৌঁছনোর আগেই মিশরে তাঁর মৃত্যু হয় আল-বাক্রির উল্লেখ থেকে জানা যায়, যে বহু উমাইয়া শরণার্থীকে কানেমে আশ্রয় দিয়েছিলেন উম্মে-জিলমি

সুদানের গুরুত্ব

কানেমে ইসলাম প্রবর্তনের সাথে সাথে, এটি কেন্দ্রীয় সুদান অঞ্চলে মুসলিম প্রভাবের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় এবং মধ্য প্রাচ্যের আরব দুনিয়া ও মাগরিবের সাথে এই এলাকার সম্পর্ক দৃঢ় হয়। তৃতীয় বার হজ যাত্রার সময়, উম্মের পুত্র ডুনামা মিশরে থাকাকালীন শাসনের অধিকার পেয়েছিলেন। দ্বিতীয় ডুনামা (১২২১-১২৫৯)-এর রাজত্বকালে, ১২৫৭ সাল নাগাদ তিউনিসিয়ায় একটি কানেম দূতাবাসের প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, এই কথা উল্লেখ করেছেন আন্দালুসিয়ার বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুন (মৃত্যু: ১৪০৬ খ্রিস্টাব্দ) উল্লেখ করেছেন। প্রায় একই সময়ে কায়রোতে একটি কলেজ এবং একটি ছাত্রাবাস প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যার নাম ছিল মাদ্রাসা ইবনে রাশিক। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষের দিকে, কানেম ইসলামী জ্ঞানের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল এবং বহু বিখ্যাত শিক্ষক মালি থেকে কানেমে শিক্ষকতা করতে এসেছিলেন। ত্রয়োদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে, কানেম তুয়াট (আলজেরিয়ান সাহারায়) এবং তিউনিসের হাফসিদ রাজ্যের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন এবং সেখানে তাঁদের দূতাবাস ছিল। 

ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন দ্বিতীয় ডুনামাকে ‘কানেমের রাজা এবং বোর্নুর প্রভু’ বলে অভিহিত করেছিলেন কারণ তাঁর আমলে এই সাম্রাজ্য পশ্চিমে কানো এবং পূর্বে ওয়াদাই পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছিল। 

বোর্নুর ইসলামীকরণ

চতুর্দশ শতকের শেষের দিকে, বোর্নুর নিগাজারগামুতে কানেম সাম্রাজ্যের একটি নতুন রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘আলী বি. ডুনামা, যিনি ‘আলী গাজী নামেও পরিচিত।তিনি ১৪৭৬ থেকে ১৫০৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন। এই শহর ১৮১১ সাল পর্যন্ত রাজধানী হিসেবে পরিচিত ছিল। আলী এখানে ইসলামের পুনর্জাগরণ ঘটিয়েছিলেন। 

বোর্নুর ইসলামীকরণ শুরু হয়েছিল মাই ইদ্রিস আলুমা (১৫৭০-১৬০২) -এর আমল থেকে। আমরা তাঁর জীবন সম্পর্কে জানতে পারি তাঁর জীবনীকার আহমদ ইবনে ফারতুয়ারের মাধ্যমে। তাঁর রাজত্বের নবম বছরে, তিনি মক্কায় গিয়েছিলেন এবং সেখানে বোর্নু থেকে যাওয়া যাত্রীদের জন্য একটি হোস্টেল নির্মাণ করেছিলেন। তিনি বিভিন্ন ইসলামী রীতিকে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন এবং সেগুলি অনুসরণ করেছিলেন। তিনি প্রচলিত আইন ব্যবস্থার পরিবর্তে ইসলামী আইন প্রবর্তনের জন্য কাদিস আদালতও স্থাপন করেছিলেন। 

১৮১০ সালে মাই আহমেদের আমলে বোর্নু সাম্রাজ্যের গৌরবের অবসান হয়, তবে ইসলামিক শিক্ষার কেন্দ্র হিসাবে এর গুরুত্ব তার পরেও অব্যাহত ছিল।

হাউসা-ফুলানি ল্যান্ডে ইসলামের জয়যাত্রা

হাউসা রাজ্যের উৎপত্তি সম্পর্কে একটি কিংবদন্তী রয়েছে, এই কাহিনীর মূল চরিত্র যে বেয়াজিদা (বায়েজিদ) বেগ থেকে কানেমে-বোর্নুতে বসতি স্থাপন করতে এসেছিলেন। তৎকালীন বোর্নুর শাসক মাই ( সেই আমলের আর কোনও তথ্য জানা যায়নি) বেয়াজিদাকে স্বাগত জানান এবং নিজের কন্যার সাথে তাঁর বিয়ে দেন। কিন্তু একই সাথে তাঁর অসংখ্য অনুসারীর সর্বস্ব ছিনিয়ে নেওয়া হয়।তখন বেয়াজিদা  তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে মাইয়ের কাছ থেকে পালিয়ে যান গয়া মাই কানোর কাছে। সেখানে তিনি কানোর স্বর্ণকারকে একটি তরোয়াল বানাতে বলেন।

গল্পটি থেকে জানা যায় যে, বেয়াজিদা একটি অতিপ্রাকৃত সাপকে মেরে কানোর প্রজাদের সাহায্য করেছিলেন, এই সাপটি তাঁদের একটি কূপ থেকে জল তুলতে বাধা দিচ্ছিল। কথিত আছে যে, রানী দৌরা তাঁর জনগণের প্রতি বেয়াজিদার নিষ্ঠা দেখে অভিভূত হয়ে তাঁর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। বেয়াজিদা ও দৌরার পুত্রের নাম ছিল বাউও। বাও-এর সাত পুত্র ছিল: বীরান, ডকুরা, ক্যাটসিনা, জারিয়া, কানো, রানো এবং গেবির, যিনি হাউসা রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই গল্পের সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, তবে এখানে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে যে, কীভাবে হাউসা ভাষা এবং সংস্কৃতি নাইজেরিয়ার উত্তর রাজ্যগুলিতে ছড়িয়ে পড়েছিল।

চতুর্দশ শতকের গোড়ার দিকে হাউসাল্যান্ডে ইসলামের আবির্ভাব হয়। কথিত আছে যে, ‘আলী ইয়াজি যে সময় কানো শাসন করছিলেন (১৩৪৯-১৩৮৫)তখন, প্রায় ৪০ জন এই সাম্রাজ্যে এসেছিলেন এবং তাঁদের মাধ্যমেই ইসলামের সাথে এখানকার বাসিন্দাদের পরিচয় হয়। 

কানোতে ইসলাম প্রতিষ্ঠ

মুহাম্মদ রুমফা যখন ক্ষমতায় আসেন (১৪৫৩-১৪৯৯) তখন কানোতে ইসলাম দৃঢ় ভাবে প্রতিষ্ঠিত। তিনি সরকারের বিভিন্ন বিষয়ে আলেমদের পরামর্শ গ্রহণ করতেন। বিখ্যাত মুসলিম ধর্মতত্ত্ববিদ আল-মাগিলি যখন পঞ্চদশ শতকে কানো সফরে গিয়েছিলেন, তখন মুহাম্মদ রুমফা-ই তাঁকে ইসলামী সরকার সম্পর্কিত একটি বই লিখতে বলেছিলেন। সেই বই কিংবদন্তীতে পরিণত হয়েছিল।

আফ্রিকাতে ইসলামের বিস্তারের পিছনে নানাবিধ কারণ রয়েছে, যেমন- ঐতিহাসিক, ভৌগলিক, মনস্তাত্ত্বিক, এবং তার পাশাপাশি মুসলিম সম্প্রদায়ের পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়া। এর মধ্যে কিছু কারণ বাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও সেগুলি অস্বীকার করার কোনও জায়গা নেই। আফ্রিকাতে প্রথম আবির্ভাবের পর থেকেই ইসলামের জয়যাত্রা অব্যাহত রয়েছে।