কার হাত ধরে এসেছিল বাংলা সাহিত্যের স্বর্ণযুগ?

Bangladesh Masjid
সুলতানি স্থাপত্যের রত্ন ছোট সোনা মসজিদ

এই বাংলায় মুসলিম শাসনের শুরুতে মুসলিমরা ছিল বহিরাগত। মুসলিম সুলতানদের মুখের ভাষা ছিল তুর্কি, রাজভাষা ছিল ফার্সি। সময়ের সাথে সাথে মুসলিম শাসকরা বেশ দ্রুতই এখানকার সাধারণ মানুষের জীবনের সাথে নিজেদের জীবনকে জড়িয়ে ফেলেন। ইতিপূর্বে বহিরাগত আর্যরা অনার্যদের সাথে যে বৈষম্যের দেয়াল তুলে রেখেছিল মুসলিমরা সে দেয়াল ভেঙ্গে ফেলেন। তারা ইসলামের সাম্যবাদ ঘোষণা করেন। ন্যায্য বিচারের ক্ষেত্রে সকল প্রকার পক্ষপাতমূলক আচরণ পরিহার করেন। তারা জনসাধারণের যাপিত জীবনকে আপন করে নেন। সাধারণ জনগণও মুসলিম শাসনকে নিজেদের জন্য কল্যাণকর হিসেবে গ্রহণ করে।

ব্রাহ্মণ-অনুশাসনের যুগে উঁচু নিচু বর্ণের ভেদাভেদ মানুষের সম্পর্কের মাঝে এক বড় দেয়াল তুলে দিয়েছিল। নাপিত ধোপা সহ বিভিন্ন পেশার লোকজন ছিলো চরম ঘৃণিত। তাদের দেখলে উঁচু জাতের লোকেরা তাদের প্রতি হেয় প্রতিপন্ন মূলক আচরণ করতো। ওই সময়টাতে বাংলা ছিল অবহেলিত কিন্তু সংস্কৃতি ভাষার জয়জয়কার চলছিল।

বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে। কিন্তু প্রথম বাংলা কাব্য চন্ডীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন’ রচিত হয় এর প্রায় দুইশো বছর পরে। ১২০১-১৩৫২ পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের অন্ধকার বলা হয়। কারণ ওই সময় যুদ্ধবিগ্রহ লেগেই ছিল। সাহিত্য চর্চার কোন অনুকূল পরিবেশ ছিল না।

সুলতান গিয়াসউদ্দিন আযম শাহ (১৩৮৯-১৪১০ খ্রিস্টাব্দ) শিক্ষানুরাগী হিসেবে ইতিহাসে বিশেষ স্থান লাভ করেছেন। তার পৃষ্ঠপোষকতায় শাহ মুহাম্মদ সগীর রচনা করেন বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘ইউসুফ জোলেখা’ (ডক্টর এনামুল হক ও ডক্টর এম এ রহিম এই মত দিয়েছেন। তবে আবদুল করিমের মতে সুলতান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহের শাসনামলে ইউসুফ জোলেখা রচিত হয়। বিস্তারিত জানতে দেখুন, বাংলার ইতিহাস সুলতানি আমল, পৃ-৪৫৮- আবদুল করিম। জাতিয় সাহিত্য প্রকাশ)। এই ধর্মীয় ও রম্য উপাখ্যান বাংলা সাহিত্যে নব দিগন্তের সূচনা করে। তারেই পৃষ্ঠপোষকতা অন্য সাহিত্যিকদের জন্য ছিল এক আশার বাণী। কারণ এই পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া সাহিত্য সাধনার কাজটি ছিল বেশ দুরূহ।

সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের সময়কালকে ধরা হয় বাংলা সাহিত্যের স্বর্ণযুগ হিসেবে। তার এই আমলের ৪৫ বছর সময়ে বাংলা সাহিত্যের বেশ উন্নতি সাধিত হয়। কেউ কেউ এ সময় কালকে বাংলা সাহিত্যের রেনেসাঁর যুগ বলে থাকে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার কারণে কবি-সাহিত্যিকরা সাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ করেন।

পঞ্চদশ ও ষোড়শ দশকে অনেক মুসলমান কবি প্রেমকাব্য রচনা করেছেন। এদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিলেন, ‘হানিফা ও কায়রা পরী’ গ্রন্থের লেখক কবি সাবিরিদ খান, ‘সয়ফুল মুলক’ কাব্যের রচয়িতা দোনাগাজি এবং ‘লাইলি মজনু’র লেখক দৌলত উজির বাহরাম খান। এভাবে বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ হতে থাকে। ওই সময়কার মুসলিম সাহিত্যিকরা তাদের লেখায় নৈতিকতা, মানবিক গুণাবলী, চারিত্রিক বিশুদ্ধতা দিকে বিশেষভাবে নজর দেন। তারা ইতিহাসের সাথে কল্পনাকে মিশিয়ে ইসলামের প্রথম যুগে বীরত্বগাথা রচনা করেন। এসব রচনার উদ্দেশ্য ছিল ইসলামের গৌরবগাথা প্রচার এবং মুসলমানদের মধ্যে ধর্মীয় আবেগের উন্মেষ ঘটানো। সুলতান ইউসুফ শাহের (১৪৭৪-১৪৮১) সভাকবি শেখ জৈনুদ্দিন রচনা করেন ‘রাসুল বিজয়’। এই গ্রন্থটির মূল উপাদান তিনি গ্রহণ করেছিলেন একটি ফারসি গ্রন্থ থেকে। এ ধরনের আরেকটি রচনা হলো শেখ ফয়জুল্লাহ লিখিত ‘গাজি বিজয়’। তিনি এই গ্রন্থ রচনা করেছিলেন সুলতান বারবক শাহের সেনাপতি বিখ্যাত দরবেশ শেখ ইসমাইল গাজির জীবনী অবলম্বনে। অবশ্য এটি নিরেট ইতিহাস ছিল না। বরং ইতিহাসের সাথে কল্পনার মাধুরী মিশিয়ে তিনি এই গ্রন্থ রচনা করেন।

পারস্যের জালালউদ্দিন রুমি এবং বিভিন্ন সুফি কবিদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ওই সময়ের মুসলিম কবিগন বাংলা ভাষায় মরমী সাহিত্য রচনা করেন। সুলতান হোসেন শাহের অধীনে চাঁদ কাজী নামে নবদ্বীপের একজন কাজী ছিলেন বাংলা সাহিত্যের এই ভাবমূলক গীতি-কবিতা রচনার প্রথম খ্যাতনামা কবি।

১৫৪৫-১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে শেখ ফয়জুল্লাহ সত্যপীর বিষয়ক কাব্য রচনার ক্ষেত্রে প্রথম বাঙালি কবি। এই সত্য পীরের কাহিনী মূলত মুসলিম মানুষের ভক্তি ও হিন্দুদের পৌরাণিক কাহিনীর প্রভাবে তৈরি। অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত এই জাতীয় কবি সাহিত্যিক বাঙালি সমাজের বেশ জনপ্রিয় ছিল।

মুসলিম কবিরা বাংলা ভাষাকে আরো সমৃদ্ধ করার জন্য আরবি ও ফারসি শব্দ থেকে বহু শব্দ গ্রহণ করেন। সুলতান নুসরত শাহের পুত্র যুবরাজ ফিরোজ শাহের পৃষ্ঠপোষকতায় আফজল আলি নামক একজন মুসলমান কবি বেশ কিছু কবিতা রচনা করেন। কবি আলাওলের সময় বাংলা ভাষার ইসলামি ঐতিহ্য উন্নতির শিখরে আরোহণ করে। মুসলিম কবিদের লেখনি হিন্দু কবিদেরকেও প্রভাবিত করেছিল। ফলে গোঁড়া হিন্দু কবিরাও তাদের কাব্যে আরবী-ফারসি শব্দ ব্যবহার না করে পারছিলেন না।

মুসলিম কবিরা ওই সময় আল্লাহ নবীজির প্রতি হামনাদ দিয়ে তাদের লেখা শুরু করতেন। এরপর তারা তাদের পৃষ্ঠপোষকদের দক্ষতার সহিত নানা উপাধিতে ভূষিত করে তাদের বন্দনা করতেন। বন্দনার প্রধান কারণ ছিল আর্থিক সহায়তা। কারণ এই আর্থিক সহায়তা না পেলে সাহিত্যচর্চা করা ছিল কঠিন। ওই সময় লেখার উপকরণের অপর্যাপ্ততা এবং জীবিকার চিন্তা দূর হয়ে যেত এই আর্থিক সহায়তার কারণে। রাষ্ট্রীয় আর্থিক সহায়তার কারণে তাদের সাহিত্য চর্চার পথ সুগম হতো।

সুলতান দেখে শুনে বুঝেই রাজসভা থেকে বাংলা সাহিত্য চর্চার পৃষ্ঠপোষকতা করতে থাকেন। পৃষ্ঠপোষকতার কারণেই বাংলা সাহিত্যে উদিত হয় এক আলোকময় সময়।