কাশিমকে ইরাকে ফেরত না পাঠালে অষ্টম শতকেই উত্তর ভারতে ইসলামের প্রসার ঘটত

165730_800

তৃতীয় পর্ব

দ্বিতীয় পর্বে আমরা জেনেছি সিন্ধু বিজয়ের সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাশিমের করুণ পরিণতির কথা। এই পর্বে আমরা জানবো সিন্ধু বিজয় ও তত্কালীন ইসলামী সাম্রাজ্যের নৈতিক হল হকিকত।

স্পেন জয়ী সেনাপতি মুসা বিন নুসাইর ও সিন্ধ বিজয়ী সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাশিমের পরিণতি ইসলামের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রয়েছে। মুয়াইয়া শক্তির উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে আর গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে শাসক নির্বাচন একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। গাজোয়ারি ও বাহুবলের মাধ্যমে একের পর এক সুলতান ক্ষমতায় আসতে থাকে। সুলতানদের মূল শক্তি ছিল তাদের সৈন্যদল। এই সৈন্যদলের মাধ্যমেই তারা সাধারণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে রাখতেন। সত্যি কথা বলতে কি, প্রথম ওয়ালিদের মৃত্যুর পর সাধারণ মানুষের দুর্দশার শেষ ছিল না। 

যখন একজন শাসক প্রকৃত ও প্রজাদরদী হয়ে ওঠেন তখন সেই শাসকের শাসনকালে প্রজারা ভাল থাকে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় পঞ্চম খলিফা ওমর বিন আবদুল আজিজ (রহ.)-এর কথা। তাঁর শাসনকালে প্রজারা সুখে শান্তিতে ছিল। স্বাধীন মতামত প্রকাশ করতে পারত। কিন্তু সুলতান সুলাইমান বিন আবদুল মালিকের শাসনকালে প্রজারা অত্যাচারের মুখে পড়ে। সুলাইমান ছিলেন আত্মম্ভরী, অহংকারী ও খামখেয়ালি। প্রজারা তাকে অসম্ভব ভয় করত।

ইসলামের প্রথম চার খলিফার আমলে ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে আস্তে-আস্তে গড়ে উঠছিল। কিন্তু এই সমস্ত অত্যাচারী ইসলামিক শাসকদের সময় সেই  রাজনৈতিক শক্তির অনেকাংশেই পতন হয়। নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের উপর উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের অত্যাচার শুরু হয়। নেতা গড়ে তোলার থেকে গা জোয়ারি করে নেতা হওয়ার প্রবণতায় শাসনব্যবস্থার ঘুণ ধরতে শুরু করে। রাজনৈতিক ক্ষমতা উচ্চ পদে আসীন স্বেচ্ছাচারীর কুক্ষিগত হয়ে যায়।

মুসা ও কাশিমের মৃত্যু চোখে আঙুল দিয়ে এই দেখায় যে ইসলাম সেই সময় বেশ সঙ্কীর্ণ ছিল। স্পেন বিজয়ের পর মুসা ফ্রান্স অভিযানের প্রস্তুতি করছিলেন যখন তাকে ইরাকে ডেকে আনা হয় ও সেখানে তাকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়। এটা না করা হলে হয়তো ফ্রান্স বিজয়ও সম্ভব হত। পরবর্তীতে যখন মধ্য ফ্রান্সে আবার ইসলাম বিজয় শুরু হয় তখন ফরাসীদের বিখ্যাত সেনাপতি চার্লস মার্টলের হাতে তুরের যুদ্ধে মুসলমান সৈন্যদল পরাজিত হয়। ঘটনাটি ঘটেছিল ৭৩৭ সনে। 

একইভাবে মুহাম্মদ বিন কাশিম সহজ পদ্ধতিতেই সিন্ধ ও ভারতবর্ষ দখলের দিকে এগিয়েছিলেন। দামাস্কাস আর কুফার থেকে সম্মতি পেলে হয়তো গাঙ্গেয় বদ্বীপ অঞ্চলও তিনি দখল করে নিতেন। কিন্তু সে তো হল না, মূলতানে সিন্ধু নদের তীরে তিনি যখন যুদ্ধ প্রস্তুতি নিচ্ছেন তখনই তাকে ইরাকে ডেকে নেওয়া হল। উত্তরভারত রয়ে গেল রাজপুতদের হাতে। বহুদিন পর, ১১৯১ সনে মুহাম্মদ ঘোরীর হাতে দিল্লির মসনদ দখল হয়েছিল। ইসলামের প্রসার হয়েছিল ভারতবর্ষে।

নিজেদের মধ্যে শত্রুতা না থাকলে হয়তো তার অনেক আগেই প্রসার ঘটত। 

সমাপ্ত