SalamWebToday নিউজলেটার
Sign up to get weekly SalamWebToday articles!
আমরা দুঃখিত কোনো কারণে ত্রুটি দেখা গিয়েছে:
সম্মতি জানানোর অর্থ, আপনি Salamweb-এর শর্তাবলী এবং গোপনীয়তার নীতি মেনে নিচ্ছেন
নিউজলেটার শিল্প

কিটোজেনিক ডায়েট কাদের জন্য বিপজ্জনক?

স্টাইল ২৩ ফেব্রু. ২০২১
সুস্বাদু
কিটোজেনিক ডায়েট
Photo by Sam Moqadam on Unsplash

‘কিটোজেনিক ডায়েট’—মাত্র দু’অক্ষরের এই জাদু শব্দবন্ধে এখন মজেছেন সেলিব্রিটিরা। আর তাঁদের দেখাদেখি পাল্লা দিয়ে কিটো ডায়েট করে চটজলদি স্লিম অ্যান্ড ট্রিম হওয়ার লক্ষ্যে ছুটছি আমরাও। কিটো ডায়েট নাকি শরীরের জন্য দারুণ উপকারী, এই ডায়েট করলেই আপনি পেতে পারবেন আপনার স্বপ্নের নায়ক-নায়িকার মতো আকর্ষণীয় চেহারা—এমন নানা হাতছানি আমাদের সামনে। কিন্তু কী এই  ডায়েট, কীভাবে তা মেদ কমাতে সাহায্য করে, তা নিয়ে ধারণা থাকে না অনেকেরই। ফলে কিটো ডায়েট করা শরীরের পক্ষে আদৌ ভাল না খারাপ, বা কাদের পক্ষে কিটো ডায়েট বিপজ্জনক, সেগুলি না জেনেই এই ডায়েট মেনে চলতে শুরু করেন তাঁরা। আজকে আমরা কিটো ডায়েটের নানা দিক সম্পর্কে আলোচনা করব।

কিটোজেনিক ডায়েট কী?

কিটোজেনিক ডায়েটকে সংক্ষেপে কিটো ডায়েট বলা হয়। কিন্তু কী এই কিটো ডায়েট? আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় কার্বোহাইড্রেট, ফ্যাট, প্রোটিন ইত্যাদি নির্দিষ্ট পরিমাণে থাকে। কিটো ডায়েট হল কম কার্বোহাইড্রেট যুক্ত ডায়েট যেখানে ফ্যাটের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। ডায়েটে ফ্যাটের পরিমাণ বেশি থাকে শুনে অনেকেই অবাক হচ্ছেন। আসলে কিটোজেনিক ডায়েটের মাধ্যমে আমরা শরীরে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ কমাই ও দৈনন্দিন চাহিদার প্রয়োজনীয় কার্বোহাইড্রেটকে ফ্যাটজাতীয় খাদ্য দিয়ে রিপ্লেস করি। এই ফ্যাট যকৃতে গিয়ে ফ্যাটকে কিটোনে পরিণত করে এবং মস্তিষ্কসহ সারা শরীরে শক্তির যোগান দেয়। যখন দেহ সাধারণভাবে কার্বোহাইড্রেটের বদলে ফ্যাটজাতীয় খাদ্য থেকে প্রয়োজনীয় শক্তি সঞ্চয় করে, তখন তাকে কিটোসিস বলা হয়। কিটো ডায়েটে কার্বোহাইড্রেটের দৈনন্দিন মাত্রাকে ২০-৫০ গ্রামের মধ্যে বেঁধে ফেলা হয়। এমনকী, এই ডায়েটে প্রোটিন গ্রহণকেও কমানো হয়, কারণ অত্যধিক মাত্রায় প্রোটিনজাতীয় খাদ্য গ্লুকোজে পরিণত হতে পারে যা কিটোসিস প্রক্রিয়াকে ব্যহত করে।

কী খাবেন, কী খাবেন না

কিটোজেনিক ডায়েট করলে কী খাবেন এবং কী খাবেন না, সেগুলি ভাল করে জেনে নেওয়া জরুরি। সাধারণত কিটো ডায়েট মেনে চলেন যারা, তাঁদের খাদ্যতালিকায় রেড মিট, স্টেক, মুরগির মাংস, স্যামন, ট্রাউট, টুনা, ম্যাকারেলের মতো তেলতেলে সামুদ্রিক মাছ, ডিম, মাখন, ভারি ক্রিম, চিজ, আমন্ড, আখরোট, কুমড়ার বীজ, এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল, নারকেল তেল, অ্যাভোকাডো অয়েল, অ্যাভোকাডো, সবুজ সবজি, টমেটো, পেঁয়াজ, লঙ্কার মতো কম কার্বোহাইড্রেটযুক্ত সবজি থাকে। এছাড়া এই ডায়েটের ক্ষেত্রে সোডা, চিনিযুক্ত খাবার, কেক, আইসক্রিম, লজেন্স, গম, ভাত, পাস্তা, ফল, কড়াইশুঁটি, রাজমা, ডাল, আলু, মিষ্টি আলু, গাজর, প্রসেস করা ফ্যাটজাতীয় খাবার খেতে বারণ করা হয়।

কিটো ডায়েট করার আগে সাবধান হন!

বিভিন্ন সমীক্ষা অনুযায়ী, চটজলদি ওজন কমিয়ে শরীরকে ছিপছিপে, তন্বী করে তুলতে কিটোজেনিক ডায়েটের জুড়ি নেই। এছাড়া ডায়াবেটিস, ক্যানসার, এপিলেপ্সি, অ্যালঝাইমার ইত্যাদির ক্ষেত্রেও কিটো ডায়েট উপকার দেয়। কিন্তু এই

ডায়েট ফলো করার বেশ কিছু খারাপ দিকও রয়েছে। কিটোজেনিক ডায়েট শুরু করার আগে কাদের জন্য এই ডায়েট বিপজ্জনক, তা জেনে নেওয়া প্রয়োজন।

আপনার কি ডায়াবেটিস রয়েছে?

কিটোজেনিক ডায়েট ডায়াবেটিসের রোগীদের ক্ষেত্রে উপকারী বলে ধরে নেওয়া হয়। এই ডায়েটে কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবারের পরিমাণ কমানো হয়, ফলে রক্তে শর্করার পরিমাণ কমাতে কিটো ডায়েট কার্যকরী। তবে আপনি যদি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য আগে থেকে কোনও ওষুধ খেয়ে থাকেন, তাহলে কিটোজেনিক ডায়েট শুরুর আগে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিন। কারণ এই ডায়েট শুরু করার পরও একই মাত্রার ওষুধ খেলে তা রক্তে শর্করার পরিমাণ অধিক মাত্রায় কমিয়ে দিতে পারে যা বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই যাদের ডায়াবেটিস রয়েছে, তাঁরা কিটো ডায়েটের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার। এক্ষেত্রে মাঝে-মাঝে রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করানো আবশ্যিক।

গর্ভবতী মহিলা ও ব্রেস্টফিডিং করান যারা

গর্ভাবস্থার পর বাড়তি ওজন কমানোর জন্য অনেকেই কিটোজেনিক ডায়েটের সাহায্য নিয়ে থাকেন। তবে এক্ষেত্রে খানিক সতর্ক থাকা প্রয়োজন। অত্যধিক কম কার্বোহাইড্রেটযুক্ত ডায়েট গর্ভাবস্থায় আপনার শরীরের ক্ষতি করতে পারে। তাই দিনে ন্যূনতম ৫০ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট খাদ্যতালিকায় রাখার চেষ্টা করুন। গর্ভবতী মহিলাদের ক্ষেত্রে রঙিন সবজি, যা ভিটামিন, আয়রন, ফোলেটের যোগান দেয় এবং গর্ভস্থ শিশুর বৃদ্ধিতে সাহায্য করে, অত্যন্ত প্রয়োজন। কিন্তু কিটোজেনিক ডায়েটে এধরনের সবজি খাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। ফলে শরীরে অত্যাবশ্যকীয় নিউট্রিয়েন্টসের ঘাটতি হয়। ফাইবারের অভাবে গর্ভাবস্থাজনিত কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা কিটো ডায়েটের ফলে আরও বেশি দেখা যায়। ব্রেস্টফিডিং করান যারা, তাঁদের ক্ষেত্রে লো কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ কিটোঅ্যাসিডোসিস নামক এক অবস্থার সৃষ্টি করে, যা সদ্য মায়েদের ক্ষেত্রে বিপজ্জনক।

রক্তচাপের সমস্যায় কিটো ডায়েট?

কিটো ডায়েট যেহেতু শরীরে ফ্যাট, বিশেষ করে স্যাচুরেটেড ফ্যাট এবং ট্রান্স ফ্যাটের পরিমাণ বাড়ায়, তাই এটি যারা রক্তচাপ ও হৃদরোগের সমস্যায় ভুগছেন, তাঁদের পক্ষে বিপজ্জনক হতে পারে। রক্তচাপ, রক্তে কোলেস্টেরলের আধিক্যের ক্ষেত্রে ট্রান্স ফ্যাট, এলডিএল বা খারাপ কোলেস্টেরল খেতে বারণ করা হয়। তাই উচ্চ রক্তচাপের সমস্যায় যারা ভোগেন, তাঁদের ক্ষেত্রে বাদাম, অলিভ অয়েল, অ্যাভোকাডো ইত্যাদি উদ্ভিজ্জ ফ্যাট গ্রহণ করতে বলা হয়। কারণ এতে থাকা ভাল কোলেস্টেরল হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। তবে শুধুমাত্রা উদ্ভিজ্জ ফ্যাট গ্রহণ করে কিটো ডায়েট করা সম্ভব নয়। ফলে আপনি যখনই রেড মিট জাতীয় প্রাণিজ প্রোটিন খেতে শুরু করবেন, তা অবধারিতভাবেই শরীরে ট্রাইগ্লিসারাইডের পরিমাণ বাড়াবে। ফলে বাড়বে হৃদরোগের ঝুঁকিও। তাই আপনার যদি উচ্চ রক্তচাপের প্রবণতা থাকে বা এর জন্য নিয়ম করে ওষুধ খান, তাহলে কিটোজেনিক ডায়েট শুরু করার আগে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে ভুলবেন না।

কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগেন যারা

কিটো ডায়েটে খাদ্যশস্য, ডালজাতীয় খাবার একেবারেই থাকে না বললেই চলে। ফলে যারা কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যায় ইতোমধ্যেই ভুগছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এই ডায়েট অসুবিধাজনক। এর ফলে শরীরে ফাইবারের ঘাটতি দেখা যায়, ফলে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা বাড়ে।

পেশির গঠনে সমস্যা

খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে কিটো ডায়েট বারণ করেন ডাক্তাররা। কারণ খেলোয়াড়দের পেশিবহুল চেহারার প্রয়োজন হয়। কিটো ডায়েট পেশিকে নষ্ট করে দিতে পারে। কারণ, পেশি গঠনের জন্য প্রোটিন ছাড়াও প্রয়োজন হয় কার্বোহাইড্রেটের, যা কিটো ডায়েটের ফলে ব্যহত হয়।

কিডনির সমস্যায় বিপজ্জনক কিটো ডায়েট

এছাড়া কিডনির সমস্যায় যারা ভোগেন, তাঁদের ক্ষেত্রেও কিটো ডায়েট বিপজ্জনক। এমনিতেই কিটো ডায়েটের ফলে কিডনিতে পাথর হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। কিটো ডায়েটের ফলে আমাদের খাদ্যতালিকায় বেশি পরিমাণে থাকা মাংস কিডনির সমস্যা এবং গেঁটে বাত বাড়ায়। অ্যানিম্যাল প্রোটিন বেশি খাওয়ার ফলে অ্যাসিডযুক্ত প্রস্রাব হয় এবং শরীরে ক্যালসিয়াম ও ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বৃদ্ধি পায়।

মুড সুইং

ঘনঘন মুড সুইং, ডিপ্রেশনে যারা ভোগেন, তাঁদের পক্ষে কিটো ডায়েট এড়িয়ে চলাই ভাল। চিনি বা শর্করাজাতীয় খাদ্য যতই শরীরের পক্ষে খারাপ হোক না কেন, মস্তিষ্কের কার্যকারিতার জন্য শরীরে শর্করা অতি অবশ্যই প্রয়োজন হয়। ফলে কম কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার এক্ষেত্রে ঝিমুনি, বিরক্তি, মুড সুইং ইত্যাদির কারণ হতে পারে। ‘সুগার ক্রেভিং’-এর ফলে মুড সারাক্ষণ বিগড়ে থাকতে পারে, এছাড়া আপনি অযথা খিটখিটে হয়ে যেতে পারেন।

অত্যাবশ্যক খাদ্যোপাদানের ঘাটতি

কিটো ডায়েট যারা মেনে চলেন, তাঁরা কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নির্দিষ্ট কিছু খাবারই খেয়ে থাকেন। তাঁদের খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র থাকে না বললেই চলে। দীর্ঘদিন ধরে নানারকম ফল, সবজি, খাদ্যশস্য জাতীয় খাবারকে বাদ দেওয়ার ফলে শরীরে সেলেনিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, ভিটামিন বি, সি-র অভাব দেখা যায়। ফলে তা অনেকসময় হিতে বিপরীত হয়ে যায়।

দীর্ঘদিন ধরে কিটো ডায়েট মেনে চললে নানারকম সমস্যাও হতে পারে। এই ডায়েটের ফলে রক্তে প্রোটিনের ঘাটতি দেখা যায়। যকৃতে বাড়তি ফ্যাট জমতে থাকার ফলে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হতে পারে। হতে পারে ‘কিটো ফ্লু’ও। এর ফলে ঝিমুনি, বমি, ডিহাইড্রেশন, মুখে দুর্গন্ধ পেটে ব্যথা, গ্যাস, কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়েরিয়া হতে পারে।

ফলে দেখতেই পাচ্ছেন, কিটো ডায়েটের অনেক ভাল দিক থাকলেও এর খারাপ ও ক্ষতিকর প্রভাব নেহাত কম নয়! তাই কিটো ডায়েট করে চটজলদি রোগা হওয়ার লোভ ত্যাগ করে এটি শুরু করার আগে এবার থেকে ভাল করে জেনে-বুঝে নিতে ভুলবেন না।