SalamWebToday নিউজলেটার
Sign up to get weekly SalamWebToday articles!
আমরা দুঃখিত কোনো কারণে ত্রুটি দেখা গিয়েছে:
সম্মতি জানানোর অর্থ, আপনি Salamweb-এর শর্তাবলী এবং গোপনীয়তার নীতি মেনে নিচ্ছেন
নিউজলেটার শিল্প

কিডনিতে পাথর? কীভাবে হয়? হলেই বা কী করণীয়?

স্বাস্থ্য ১০ ফেব্রু. ২০২১
ফিচার
কিডনিতে পাথর
© Iryna Zastrozhnova | Dreamstime.com

কিডনিতে পাথর এখন খুব সাধারণ সমস্যা। আমাদের জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদির কারণে কিডনিতে পাথর হওয়ার ঘটনা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ১১ জনের মধ্যে একজনের ক্ষেত্রে কিডনিতে পাথর হয়। গোটা পৃথিবীর প্রেক্ষিতেও ছবিটা খানিক এরকমই। নারীদের তুলনায় আবার পুরুষদের কিডনিতে পাথরের সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু কী এই কিডনির পাথর? কীভাবেই বা হয়? একে আটকানোর কি কোনও উপায় আদৌ আছে? এইসমস্ত নিয়ে আজ আমরা আলোচনা করব।

কিডনির পাথর কী? ক্যালসিয়াম, নানারকম খনিজ লবণ, মিনারেলস, ইউরিক অ্যাসিড জমে কিডনি বা বৃক্কে যে শক্ত পদার্থ তৈরি হয়, তাকেই কিডনির পাথর বলে। আমাদের শরীরে থাকা নানারকম ক্ষতিকারক বর্জ্য মূত্রের মাধ্যমে দেহ থেকে বেরিয়ে যায়। শরীরে থাকা জল এইসমস্ত বর্জ্যপদার্থকে বের করে শরীর পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। এই কাজে সাহায্য করে কিডনি। কিন্তু জল যদি কম খাওয়া হয়, তাহলে এই ক্ষতিকারক পদার্থগুলি কিডনিতে জমে ক্রিস্টালের আকার ধারণ করতে শুরু করে।

যে-সমস্ত খনিজ বা মিনারেল জমে এই ক্রিস্টাল তৈরি হয়, সেগুলি হল ক্যালসিয়াম, অক্সালেট, ইউরেট, সিস্টিন, জ্যানথিন, ফসফেট ইত্যাদি। এই ক্রিস্টাল আস্তে-আস্তে পাথরে পরিণত হয়, একেই বলে কিডনি স্টোন। এই পাথর নানা আকারের হতে পারে। পাথর কিডনিতে তৈরি হলেও তা সবসময় কিডনিতে জমে থাকে না, মূত্রনালীর মাধ্যমে বাহিত হয়ে মূত্রথলিতে এসেও জমে থাকতে পারে। আমাদের কিডনির পাথর চার ধরনের হয়—ক্যালসিয়াম অক্সালেট, ইউরিক অ্যাসিড, স্ট্রুভাইট এবং সিস্টিন।

কেন কিডনিতে পাথর হয়?

পাথর নানাকারণে হতে পারে। তবে সাধারণভাবে জল কম খাওয়াই এর প্রধান কারণ বলে মনে করা হয়। এছাড়া স্থূলতা বা ওবেসিটি, ওজন কমানোর সার্জারি, খুব বেশি নুন বা চিনিযুক্ত খাবার খাওয়া, ইনফেকশন বা পরিবারে কারওর কিডনি স্টোনের ইতিহাস এর সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। চিনিতে ফ্রুক্টোজ থাকে, অতিরিক্ত ফ্রুক্টোজযুক্ত খাবার খেলেও কিডনিতে পাথর হয়। যাদের ডায়াবেটিস রয়েছে, তাঁদের কিডনির পাথর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

কিডনিতে পাথর হলে কীভাবে বুঝবেন?

কিডনিতে পাথর হলে সাধারণত পেটে অসহ্য যন্ত্রণা শুরু হয়। এই যন্ত্রণা এতই ভয়ঙ্কর যে একে অনেকসময় ছুরি মারার যন্ত্রণার সঙ্গে তুলনা করা হয়। পাথর যখন ইউরেটারে প্রবেশ করে, তখন এই ব্যথা শুরু হয়। তবে সবসময় ব্যথা থাকে না। এছাড়া মূত্রত্যাগের সময়ও এই ব্যথা আপনি অনুভব করতে পারবেন। তবে এই ব্যথাকে অনেকসময় ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশনের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়। ঘনঘন বাথরুমে যাওয়া, মূত্রে রক্তের উপস্থিতিও কিডনিতে পাথরের কারণে হতে পারে। মূত্রে যদি দুর্গন্ধ থাকে বা বমি, ঝিমুনির মতো লক্ষণ দেখা যায়, তাহলেও কিডনিতে পাথর হয়েছে বলে মনে করা হয়।

কী করবেন?

কিডনিতে পাথর বেশিরভাগ সময়েই খুব গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছে যায়। ফলে উপরে উল্লেখিত কোনও একটি সমস্যা হলে যত দ্রুত সম্ভব ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। পেটে ব্যথা হলে অনেকেই একে অন্য কোনও রোগের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে খুব একটা আমল দিতে চান না, নিজেরাই ওষুধ খেয়ে নেন। এইসমস্ত একেবারেই না করা ভাল। কিছু-কিছু ধরনের কিডনির পাথর খুব দ্রুতহারে বাড়ে। ফলে এক্ষেত্রে দেরি করা মানেই কার্যত বিপদের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলা।

ঘরোয়া পদ্ধতিতে কিডনির পাথর দূর করুন

খুব ছোট পাথর হলে অনেকসময় ডাক্তাররা কিছু ওষুধপত্র দিয়ে পাথর গলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এছাড়া বেশ কিছু খাবার আছে, যেগুলি খেলে আপনি পাথর থেকে মুক্তি পেতে পারেন। তবে এইসমস্ত ঘরোয়া টোটকা শুরু করার আগে ডাক্তারের সঙ্গে ভাল করে কথা বলা অত্যন্ত জরুরি। নিজের কিডনির পাথরের আকার, আয়তন জানুন, তার পরিস্থিতি সম্পর্কে ভাল করে ওয়াকিবহাল হন। নয়তো নিজের চিকিৎসা নিজেই করতে গিয়ে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েই যায়।

পাতিলেবুর রস খান

পাতিলেবুতে থাকে ভিটামিন সি এবং সাইট্রেট, যা শরীরে ক্যালসিয়াম স্টোনকে গঠিত হওয়ার থেকে আটকায়। ছোট স্টোন হলে সাইট্রেট সেগুলিকে গলিয়ে দিতেও সাহায্য করে। জলে লেবু গুলে যখন খুশি খেতে পারেন। পাশাপাশি খেতে পারেন সাইট্রেট যুক্ত অন্য ফলও। তবে মনে রাখবেন, এই চিকিৎসা কিন্তু খুবই সময়সাপেক্ষ।

তুলসিপাতার রস

তুলসিপাতায় থাকা অ্যাসেটিক অ্যাসিড, যা কিডনির পাথরকে ভাঙতে সাহায্য করে এবং পেটব্যথা কমায়। প্রাচীনকাল থেকে প্রদাহজনিত সমস্যায় তুলসিপাতাকে ব্যবহার করা হয়ে আসছে। তুলসিপাতা সামগ্রিকভাবে কিডনিকে ভাল রাখতেও সাহায্য করে। এছাড়া তুলসিপাতা রক্তচাপ, ডায়াবেটিস কমাতেও কার্যকরী। তুলসিপাতা দিয়ে তৈরি চা দিনে বেশ কয়েকবার খেলে কিডনির পাথরের ক্ষেত্রে তো বটেই, অন্য অনেক সমস্যাতেও কাজে দেবে।

অ্যাপল সিডার ভিনিগার

এটিও কিডনিতে পাথর গলাতে সাহায্য করে। অ্যাপল সিডার ভিনিগারে থাকা অ্যাসেটিক অ্যাসিড পাথরকে শরীর থেকে বের করার পাশাপাশি পেটব্যথা কমায়। একগ্লাস জলে ২ চামচ অ্যাপল সিডার ভিনিগার গুলে খান, উপকার পাবেন। তবে যাদের ডায়াবেটিস রয়েছে, তাঁদের এই ভিনিগারটি না খাওয়াই উচিত।

ডালিমের রস

শরীর থেকে ক্ষতিকারক টক্সিন বের করে দিতে ডালিম বা বেদানার জুড়ি নেই। কিডনিতে সার্বিকভাবে ভাল রাখতে এবং পাথর সহ অন্যান্য ক্ষতিকারক পদার্থ কিডনি থেকে বের করে দিতে ডালিমের রসে ভরসা রাখতে পারেন। এতে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকে, যা কিডনিতে পাথর গঠনের থেকে আটকায়। তাই প্রতিদিন নিয়ম করে ডালিমের রস খান।

ক্যালসিয়াম যুক্ত খাবার

ক্যালসিয়াম অক্সালেট ধরনের পাথর রয়েছে যাদের, তাঁদের কিন্তু শরীরে ক্যালসিয়ামের মাত্রা বজায় রাখা আবশ্যিক। দুগ্ধজাত পদার্থ বা দুধ খেলে কিডনিতে পাথরের ঝুঁকি বাড়ে, এই ধারণাটি যে ভুল, তা বিভিন্ন সমীক্ষা ইতোমধ্যেই প্রমাণ করে দিয়েছে। তাই ব্রকোলি, দুগ্ধজাত পদার্থ, দুধ, দই, পনির, নরম কাঁটার মাছ ইত্যাদি ক্যালসিয়াম যুক্ত খাবার খান। তবে ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট খেলে কিন্তু তা পাথরের সম্ভাবনাকে অনেকগুণ বাড়িয়ে দেয়। ফলে শরীরে ক্যালসিয়াম বাড়ানোর জন্য সাপ্লিমেন্টের বদলে প্রাকৃতিক খাবারে ভরসা রাখাই শ্রেয়।

জল খান প্রচুর

এছাড়া সারাদিনে প্রচুর পরিমাণ জল খাওয়া কিন্তু প্রয়োজন। জল কম খাওয়াকেই কিডনির পাথর তৈরির প্রধান কারণ বলে মনে করা হয়। জল শরীর থেকে ক্ষতিকর পদার্থ বের করে দিয়ে শরীরকে সুস্থ রাখতে প্রভূত সাহায্য করে। কিডনিতে নানারকম খনিজ পদার্থ জমতে শুরু করলে জলই তাকে বের করে দেয়। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে ডাক্তাররা সাধারণত দিনে আড়াই থেকে তিন লিটার জল খাওয়ার পরামর্শ দেন।

কিডনিতে পাথর আটকাতে কী কী এড়িয়ে চলবেন?

কার্বোনেটেড, ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় কিডনিতে পাথরের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলে। অতিরিক্ত কফির পাশাপাশি যারা সোডা, কোল্ডড্রিঙ্কস প্রচুর খান, তাঁরা সাবধান হন। কারণ এতে প্রচুর পরিমাণে চিনি থাকে, যা বিপদের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। মদ্যপান থেকে বিরত থাকুন। উচ্চ পরিমাণে অক্সালেটযুক্ত খাবার, যেমন, বাদাম, পালংশাক, চা, ঢেঁড়স, বিট, তিল, চকোলেট, সয়ামিল্ক ইত্যাদি পুষ্টিকর হলেও অনেকক্ষেত্রে কিডনিতে পাথরের সম্ভাবনা বাড়ায়, ফলে এইসব খাবার নিয়ন্ত্রণে রাখুন। অনেকে মাংস, ডিম, সামুদ্রিক মাছ ইত্যাদি অ্যানিম্যাল প্রোটিন খেতেও বারণ করেন। কারণ এতে থাকে ইউরিক অ্যাসিড, যা কিডনিতে পাথরের অন্যতম উপাদান।

আর হ্যাঁ, আপনার ওজনকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভুলবেন না। ৪০-এর পর এই কিডনিতে পাথরের ঝুঁকি খানিক বাড়ে, তাই বয়স ৪০ পেরলেই বাড়তি সতর্ক থাকুন। ব্যায়াম করুন, দেখবেন সুস্থ থাকছেন, নীরোগ থাকছেন।