কিতাব আল-তাবিখ: নবম শতাব্দীর বাগদাদের নানা রকম খাবার

খাবার Contributor
সুস্বাদু
কিতাব আল-তাবিখ
© Studiofocusvideo | Dreamstime.com

খলিফাদের রান্নাঘর থেকে

হাজার বছরেরও কিছু বেশি সময় আগে আরবের এক লেখক রন্ধন প্রণালী নিয়ে একটি বই লিখেছিলেন, যার নাম ছিল কিতাব আল-তাবিখ। মনে করা হয়, এই লেখকের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন দশম শতাব্দীর আলেপ্পোর সংস্কৃতিমনস্ক রাজপুত্র সঈফ আদ-দৌলাহ আল-হামদানি। তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন, সমস্ত মুসলিম রাজা, খলিফা, অভিজাতবর্গ এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিদের হেঁশেলে যা যা পদ রান্না হয়, সেগুলির প্রণালী নিয়ে একটি বই লিখতে। তাই বলা যেতে পারে, এই বই ছিল নবম শতাব্দীর বাগদাদের রাজকীয় রন্ধন প্রণালীর এক অসাধারণ সংকলন। লেখক আবু মুহাম্মদ আল মুজফফর ইবন সায়্যার স্বয়ং মুসলিম অভিজাত বংশের সন্তান হওয়ার ফলে এই কাজে তার পক্ষে খুব কঠিন ছিল না।

কিতাব আল-তাবিখ ও তার অন্দরের ধনরত্ন 

বর্তমানে এই বহুমূল্য বইয়ের তিনটি প্রধান পাণ্ডুলিপি এবং একটি চতুর্থ পাণ্ডুলিপির কিছু ভগ্নাংশ পাওয়া যায়। সেই সময় বাগদাদ ছিল সব থেকে ধনী শহর, এবং সমস্ত সুস্বাদু পদ এখানের ভোজনরসিক ব্যক্তিরা আস্বাদন করতেন। আল-মাহদি (মৃত্যু ৭৮৫ খ্রিস্টাব্দ) থেকে আল-মুতাওয়াক্কিল (মৃত্যু ৮৬১ খ্রিস্টাব্দ) পর্যন্ত, সমস্ত খলিফার ব্যক্তিগত সংগ্রহে ছিল এই সব রন্ধন প্রণালী, এর মধ্যে ২ টি ছিল হারুন আর-রশিদের ছেলে আল-মামুনের। হারুনের ভাই তথা বিখ্যাত কবি ও ভোজনবিলাসী ইব্রাহিম ইবনে আল মেহদির দেওয়া প্রায় ৩৫টি রন্ধন প্রণালীই রয়েছে এই বইয়ে বর্ণিত ঔষধি নয়, এমন প্রকৃতির রান্নার কৌশলের এক দশমাংশ জুড়ে।

এটি ছিল মধ্যযুগীয় রান্নার সুবর্ণ যুগ। কয়েক শতাব্দী পরেও রান্নার বইয়ে এই সমস্ত বিখ্যাত লোকেদের নাম রয়েছে, যেমন – হারুনিয়াহ, মামুনিয়াহ, মুতাওয়াকিলিয়াহ, ইব্রাহিমিয়াহ প্রমুখ। মামুনের স্ত্রী বুরানিয়াহারের নামানুসারে একটি রান্নার পদ আজও প্রচলিত আছে, যা বিরিয়ানি নামেই খ্যাত।

কিন্তু কিতাব আল-তাবিখ এ  বর্তমানে প্রচলিত আরবী রান্নাগুলির নাম খুব কমই পাওয়া যায়, যেমন- হাম্মুস, তাবৌলি, কিব্বে বা বাক্লাভা ইত্যাদির নাম নেই। তার বদলে বেশ কিছু অন্য রকম কিছু নাম আছে, যেমন- বাজমাউরদ, কার্দনাজ, ইস্ফিদাহবাজ, দিকবারিকা ইত্যাদি।

বর্তমানের রান্নার সঙ্গে পার্থক্য 

এই পদগুলিতে পার্সী রান্নার শৈলির প্রভাব স্পষ্ট, কিন্তু বর্তমান ইরানের রান্না হুবহু এমন নয়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে – পিলাফ রান্নার কোনও প্রণালী এই বইয়ে নেই। তবে এই বইয়ে আমরা পাই, ষষ্ঠ এবং সপ্তম শতাব্দীতে ইরানের রাজ ঘরানায় প্রচলিত বিভিন্ন রান্নার কৌশল এবং সেগুলির প্রভাবে বাগদাদের রাঁধুনীরা যে সব বিভিন্ন নতুন পদ রাঁধতেন, তার বর্ণনা।

এই মিশেলের কারণ হল, ইসলাম পূর্ববর্তী আরবে খেজুর, বার্লি আর দুধের জিনিসের মতো একঘেয়ে খাবারের প্রচলন ছিল। খেজুরের পদগুলোর জন্য বিভিন্ন আরবী নামও ছিল, যেমন – মাজি (টাটকা খেজুর দুধের সাথে মিশিয়ে), সিকল (দুধ আর শুকনো খেজুর), ওয়াতিহ – (খেজুরের কুচি দুধে গুলে), ওয়াজিয়াহ –(খেজুর গুঁড়ো দুধে ভিজিয়ে) ইত্যাদি। যখন আরবেরা পারস্য জয় করে, তখন তাঁরা বেশ সুস্বাদু এবং সমৃদ্ধ রন্ধন শৈলির সন্ধান পায়, এবং কালক্ষেপ না করে তারা পারস্যের খাদ্যাভ্যাসকে আপন করে নেয়।

কিতাব আল-তাবিখ-এ রচিত রন্ধন প্রণালী 

কিতাব আল-তাবিখ বলে, নবম শতাব্দীতে বাগদাদি রান্নার ঘরানা ছিল অভিজাত এবং বহু জটিল স্ট্যু বানানো হত তান্নুরে (তন্দুরের উনুনে)। কিছু পদের পার্সী নামও ছিল, যেমন সিকবাজ (ভিনিগারের স্বাদযুক্ত) এবং নারবাজ (ডালিমের স্বাদযুক্ত)। মনে করা হয়, আরবীয় নামের রান্নাগুলির নামকরণ বাগদাদ থেকে করা হয়েছিল, এবং সেগুলির অধিকাংশেরই নাম রাখা হত পদের প্রধান উপকরণ অনুযায়ী। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, আদাসিয়াহ (মুসুর ডাল আর মাংস) এবং শালজামিয়াহ (শালগমের পদ)।

কিছু পদের নামকরণ করা হয়েছিল অভিজাতদের নামানুসারে, যেমন, হারুনিয়াহ (পেষাই করা শুমাক ব্যবহৃত, কিতাব আল তাবিখের বিভিন্ন রান্নার প্রণালীতে হারুন আর-রশিদের প্রিয় মশলা হিসেবে এটির উল্লেখ রয়েছে)। কিছু খাবারের নাম আবার কাল্পনিকও হত, যেমন নারজিসিয়াহের উপর একটা ডিম দেওয়া হত, ফলে কিছুটা নারসিসাস ফুলের মত একে দেখতে লাগত – মানে কেউ যদি সত্যিই সাদৃশ্য খুঁজতে চায়।

মশলা ও বেগুন সমৃদ্ধ আরব রান্না 

মধ্যযুগীয় এই রান্নাগুলিতে এমন বহু মশলা ব্যবহৃত হত যা বর্তমানে অপ্রচলিত, কিন্তু বিস্ময়কর বিষয়টি হল, এই সব রান্নায় অনেক ভেষজের ব্যবহার ছিল। কখনো একই রান্নায় পাঁচ বা তার বেশি ভেষজ ব্যবহার হত, যেমন তুলসী, ট্যারাগন এবং পুদিনা, পার্সলে বা ধনেপাতা, যা বর্তমান আরবের রান্নাতেও ব্যবহৃত হয়।

আশ্চর্যের বিষয় হল, এই সেসময়ের রান্নায় বেগুনের প্রচলন খুব সীমিত ছিল। বর্তমান আরব দুনিয়ায় বেগুনকে সব্জির রাজা বলা হলেও, তখন এটি সবে হিন্দুস্থান থেকে আমদানি করা হয়েছিল এবং একেবারেই জনপ্রিয় ছিল না। বরং বেগুনকে তখন বিভিন্ন রোগের কারণ বলে মনে করা হত, এমনকি পাগলামো বা ক্যান্সারের কারণও বলা হত।