কিভাবে ছোট শিশুদের রোযা পালনে অভ্যস্ত করবেন?

শিশু Contributor
ফোকাস
ছোট শিশুদের রোযা
Photo : Dreamstime

ইসলামে একটি শিশুর আদর্শবান হওয়ার জন্য যাবতীয় পথনির্দেশনা রয়েছে। রোযা ও রমযানের প্রশিক্ষণও এক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে সক্ষম। এমন সন্তান সবারই কাম্য- যে সন্তান হবে আদব-আখলাক ও শিষ্টাচারে সকলের মধ্যে সেরা এবং যে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ সাধন এবং মুক্তির কারণ হবে।

সেই আদর্শ সন্তানের কল্যাণ পেতে ইসলামের অনুসরণ অনুকরণ জরুরি। ইসলামি বিধানমতো শিশুদেরকে লালনপালন করতে পারলে এ সুফল লাভ করা সম্ভব। আর শিশুকে ইসলামী ধাঁচে গড়ার বা প্রশিক্ষণ দেওয়ার অন্যতম মাস হলো পবিত্র রমযান। এ মাসে অন্যান্য ব্যস্ততা কিছুটা কমিয়ে ছোট শিশুদের জীবন গঠনে নজর দিলে বেশ উপকার পাওয়া যাবে। এটি শিশুদের অধিকার এবং অভিভাবকেদেরও ঈমানি কর্তব্য।

ছোট শিশুদের রোযা পালনে অভ্যস্ত করতে হতে হবে রোল মডেল

শিশু বড়দের সকল কর্মকাণ্ড অনুসরণ করে। আমরা শিশুদের যতটা মনোযোগী বা কল্পনাশক্তিসম্পন্ন বলে ধারণা করি, তারা তার চেয়েও অনেক বেশি ক্ষমতা রাখে। তাই আপনি তাকে কি বলছেন, তা থেকে তারা আরও বেশি লক্ষ্য করে যে, আপনি নিজে সেগুলো কতটা মানছেন। ফলে রমযানকে তাদের সামনে তুলে ধরতে হবে নতুন ভাবে, নতুন রূপে, আমলের মাধ্যমে। শুধু উপদেশ দিয়ে নয়, শিশুকে দেখিয়ে দেখিয়ে রমযান পালনের মাধ্যমেই শিশুর মাঝে রমযানের চেতনা ছড়িয়ে পড়বে। আপনি তার সামনে প্রধানতম আদর্শ বা ‘রোল মডেল’। তাই তার প্রাথমিক ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠবে আপনার দেখানো উদাহরণগুলো থেকে, কথা শুনে নয়।

শিশুর মধ্যে ইতিবাচক আচরণ ও সহযোগিতার মনোভাব গড়ে উঠার জন্য প্রয়োজন সঠিক যোগাযোগ, আনন্দময় পরিবেশ এবং সৃজনশীলতা। ভয় দেখিয়ে, কঠোর নিয়ন্ত্রণে রেখে শিশুকে দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে অনেক সঠিক কাজ করিয়ে নেয়া যায়, কিন্তু এর দরূণ শিশুর মাঝে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই রমযানের আমলগুলো বা ইবাদতগুলো কোনো চাপে রেখে নয়, বরং নিজেরা এগুলো করে তাদেরকে শিখাতে হবে। ইফতার, সাহরি ও সদকার বিষয়গুলো তাদের সঙ্গে শেয়ার করতে হবে।

হাদিসে বর্ণিত শিশুদের রোযা পালন

শিশুদের রোযা পালনের বিষয়টি বিভিন্ন হাদিসে উঠে এসেছে। এসব হাদিস থেকে দেখা যায় সাহাবীরা সন্তানদের নিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে রোযা রাখতেন। রমযানে অভিভাবকদের প্রথম দায়িত্ব শিশুদের রোযা রাখায় উদ্বুদ্ধ করা।

রুবাই বিনতে মুআওয়েয (রাযিঃ) বলেন, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম আশুরার সকালে মদিনার আশপাশে আনসারদের এলাকায় এই ঘোষণা পাঠালেন, যারা রোযা অবস্থায় সকাল শুরু করেছে, তারা যেন রোযা সম্পন্ন করে। আর যারা বে-রোজদার হিসেবে সকাল করেছে তারা যেন বাকি দিনটুকুর জন্য রোযার নিয়ত করে নেয়। এরপর থেকে আমরা আশুরার দিন রোযা রাখতাম এবং আমাদের ছোট শিশুদেরও রোযা রাখাতাম। আমরা তাদের নিয়ে মসজিদে যেতাম এবং তাদের জন্য উল দিয়ে খেলনা তৈরি করে রাখতাম। তাদের কেউ খাবারের জন্য কাঁদলে তাকে সেই খেলনা দিয়ে ইফতার পর্যন্ত সান্তনা দিয়ে রাখতাম।” (বুখারী, মুসলিম)

উমর (রাযিঃ) রমযান মাসে এক মদ্যপ ব্যক্তিকে বলেছিলেন, “তোমার জন্য আফসোস! আমাদের ছোট শিশুরা পর্যন্ত রোযাদার! এরপর তিনি তাকে প্রহার করা শুরু করলেন।”

যে বয়সে শিশু রোযা পালনে সক্ষমতা লাভ করে সে বয়স থেকে পিতামাতা তাকে প্রশিক্ষণমূলক রোযা রাখাবেন। এটি শিশুর শারীরিক গঠনের উপরও নির্ভর করে। ওলামায়ে কেরাম কেউ কেউ এ সময়কে ১০ বছর বয়স থেকে নির্ধারণ করেছেন।

যেভাবে ছোট শিশুদের রোযা পালনে অভ্যস্ত করবেন

ছোট শিশুদের রোযা পালনে অভ্যস্ত করে তোলার বেশকিছু পন্থা রয়েছে। নিম্নে তেমনই কিছু পদ্ধতি উল্লেখ করা হলো-

১) ছোট শিশুদের সামনে রোযার ফাজায়েল সম্পর্কিত হাদিসসমূহ তুলে ধরতে হবে। তাদেরকে জানাতে হবে যে, রোযা জান্নাতে প্রবেশের মাধ্যম। জান্নাতে একটি দরজা আছে ‘রাইয়্যান’; যে দরজা দিয়ে শুধু রোযাদাররাই প্রবেশ করবে।

২) প্রথমদিকে দিনের কিছু অংশে রোযা পালন করানো। ক্রমান্বয়ে সেই সময়কে বাড়িয়ে দেওয়া।

৩) রমযান আসার আগ থেকেই কিছু নফল রোযা রাখানোর মাধ্যমে তাদেরকে অভ্যস্ত করে তোলা যেতে পারে। যাতে তারা আকস্মিকভাবে রমযানের রোযার সম্মুখীন না হয়।

৪) প্রতিদিন বা প্রতিসপ্তাহে পুরস্কার দেওয়ার মাধ্যমে তাদেরকে রোযা পালনে উৎসাহিত করা।

৫) একেবারে শেষ সময়ে সাহরি গ্রহণ করানো। এতে করে তাদের জন্য দিনের বেলায় রোযা পালন সহজ হবে।

৬) ইফতার ও সাহরির সময় পরিবারের সব সদস্যের সামনে তাদের প্রশংসা করা। যাতে তাদের মানসিক উন্নতি ঘটে।

৭) শিশুদের ক্ষুধা লাগলে তাদেরকে ঘুম পাড়িয়ে অথবা বৈধ খেলনা দিয়ে ভুলিয়ে রাখা। এমন খেলনা যাতে পরিশ্রম করতে হয় না। যেভাবে সাহাবীরা তাদের সন্তানদের ক্ষেত্রে করতেন।

৮) উত্তম হয় যদি পিতা তার ছেলেকে নিয়ে মসজিদে সালাত আদায়ের জন্য যান। যাতে সে সালাতের জামাতে হাজির হয়ে মসজিদে অবস্থান করা কুরআন তেলাওয়াত ও আল্লাহর জিকিরে রত ব্যক্তিদের দেখতে পারে।

৯) যার একাধিক শিশু রয়েছে তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতার মনোভাব সৃষ্টি করা যেতে পারে।

১০) ইফতারের পর শরীয়ত অনুমোদিত ঘুরাফেরার সুযোগ দেওয়া। অথবা তার পছন্দমত খাবার, ফল-ফলাদি ও শরবত প্রস্তুত করা।