কিভাবে সত্যের বাণী প্রচারে রত হলেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) (পর্ব-০২)

quran

পর্ব-০২ 

হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) পরিবারের বাইরে প্রথমেই এই ধর্মের কথা, এই শাশ্বত বাণীর কথা বলেন তার বন্ধু আবু বকরকে। আবু বক্কর হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর কাছ থেকে শোনা মাত্রই ইসলাম গ্রহণ করেন। আবু বকর ছিলেন অভিজাত কুরাইশদের একজন। তিনি একাধারে ছিলেন সফল ব্যবসায়ী, জ্ঞানী, সদালাপী ও সদাচারী। আবু বকর নিজে নিরবে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া শুরু করলেন। তিনি তাদের দাওয়াত দেওয়া দেওয়া শুরু যাদের কাছে তিনি আস্থাভাজন ছিলেন। এদের অধিকাংশই ছিল তাঁর ব্যবসায়িক বন্ধু ও অভিজাত ভালো মানুষ। তার এই দাওয়াত দেওয়ার ফলে যারাই ইসলাম গ্রহণ করত, তিনি তাদেরকে একজন একজন করে গোপনে নবীজির কাছে নিয়ে যেতেন। সেখানে তারা নবীজির কাছে ইসলাম গ্রহণের কথা ঘোষণা দিতে এবং নবীজির কাছ থেকে উপদেশ নিয়ে যেত । এইভাবে উসমান ইবনে আফফান, আবদুর রহমান ইবনে আউফ, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস, তালহা, জুবায়ের সংযুক্ত হলেন নতুন বিশ্বাসের সাথে।

সাহাবাদের সম্প্রসারণ

এরপর একে একে ইসলাম গ্রহণ করলেন আবু উবায়দা, আবু সালামা আবদুল্লাহ, আরকাম ইবনে আবুল আরকাম, উসমান ইবনে মাজউন, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, সাঈদ ইবনুল আস, আমর ইবনে আনবাসা, উবায়দা ইবনে হারিস, খালিদ ইবনে সাঈদ, সাঈদ ইবনে জায়েদ, আম্মার, বেলাল। মহিলাদের মধ্যে উম্মুল ফদল, নবী-তনয়া জয়নাব, রুকাইয়া, উম্মে কুলসুম, ফাতেমা, আবু বকর তনয়া আসমা ও (ওমরের বোন) ফাতেমা ইসলাম গ্রহণ করলেন। প্রথম তিন বছরে ইসলাম গ্রহণকারীর সংখ্যা মাত্র ৩০ জন। এর একটা বড় অংশই ছিল সমাজের লাঞ্ছিত-বঞ্চিত মানুষ।

ওই সময়ে ইসলাম প্রচারের জন্য গোপন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল সাফা পাহাড়ে আবস্থিত আরকাম মাখজুমির বাড়ি। আরকামের বাড়িকে গোপন কেন্দ্র করার মধ্য দিয়ে আমরা নবীজীর দূরদৃষ্টির ও প্রজ্ঞার পরিচয় পাই। প্রথমত আরকাম ছিলেন বনু হাশিমের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বনু মাখজুম গোত্রের। চারপাশেই আবু জেহেলের বনু মাখজুম গোত্রের ঘরবাড়ি। তাছাড়া আরকাম ছিলেন বয়সে তরুণ এবং তিনি মুসলমান হওয়ার কোনো প্রকাশ্য ঘোষণা দেননি। ফলে নবীজী গোপন কাজের পুরো সময়ই এখানে নির্বিঘ্নে বৈঠক ও প্রশিক্ষণ দিয়ে গেছেন। আবু জেহেল কখনো আঁচই করতে পারেনি তার দুর্গের ভিতরেই মুহম্মদ ধর্মীয় প্রশিক্ষণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। মুসলমানরা তখন মক্কার বাইরে গিয়ে গোপনে নামাজ পড়তেন।

সূরা নাজিল

নবুয়তের প্রথম তিন বছর চিন্তা চেতনা, অর্থাৎ জীবনদৃষ্টি বদলানোর জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক সূরা নাযিল হতে থাকে। অধিকাংশ সূরাই ছিল ছোট ছোট। এই সূরাগুলো মূর্তি ও কল্পিত দেবতার পূজা আর পিতৃপুরুষের সংস্কারের অন্ধ অনুসরণের অসারত্ব তুলে ধরে। প্রতিটি আয়াতের বাণী ও ধ্বনির ব্যঞ্জনা বিশ্বাসী-অন্তরকে আপ্লুত করে এক স্রষ্টার উপাসনায়—নিজের সবকিছু স্রষ্টার কাছে সমর্পণের। তখন ইসলাম গ্রহণ ও অনুসরণের অনুঘটক ছিল নবীজির জীবন। নবীজি একাধারে ছিলেন ক্ষমতাশীল ও দয়ালু। বিনয়ী তারপরও পৌরুষদীপ্ত। তিনি সবার সাথে মিষ্ট ভাষায় কথা বলতেন কিন্তু তিনি ন্যায়নিষ্ঠ ছিলেন। যার যার প্রাপ্য তাকে বুঝিয়ে দিতে তিনি থাকতেন সবসময় তৎপর। দুর্বল, এতিম, বঞ্চিত ও নিপীড়িতের প্রতি অফুরন্ত সমমর্মী।রাতের প্রায় পুরোটাই কাটাতেন ধ্যানে, নামাজে ও কোরআন তেলাওয়াতে—জীবন পরিচালনায় এর মর্ম অনুধাবনে। মহান রাব্বুল আলামিনের শাশ্বত বাণীর অনুসরণীয় এবং অনুকরণীয় সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত নিজেদের মাঝে পাওয়ার পরে অনুসারীদের বিশ্বাস এর গভীরতা বেড়ে গেল। যদিও তারা সংখ্যায় কম ছিলো। সুতরাং তারা বিশ্বাস এর জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করতে উদ্বুদ্ধ হলো ।

(চলবে)