কিভাবে সত্যের বাণী প্রচারে রত হলেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) (পর্ব-০৩)

quran

পর্ব-০৩ 

হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) নবুয়তের তৃতীয় বছরের শেষে এসে তিনি দেখতে পেলেন যে, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের জন্য অর্থাৎ বিশ্বাস এর জন্য যে কোনো ত্যাগ স্বীকারের এখন কিছু মানুষ প্রস্তুত ও সঙ্ঘবদ্ধ। সুতরাং এখন থেকে আর গোপনে বাণী প্রচার নয়। আল্লাহ তাকে নির্দেশ দিলেন প্রকাশ্যে মানুষকে সতর্ক করার জন্য। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) প্রথমে তিনি তার সকল আত্মীয়কে বাসায় দাওয়াত দিলেন। তবে সবাই এলো। নবীজি তাদের জন্য আপ্পায়ন এর ব্যবস্থা করলেন । খাবার শেষে তিনি সবাইকে মূর্তিপূজা বাদ দিয়ে এক আল্লাহ তাআলার উপাসনার কথা বলতে শুরু করলেন। এ সময় তার চাচা আবু লাহাব উঠে দাঁড়ালেন, এবং সেই মজলিস থেকে সবাইকে উঠিয়ে নিয়ে তিনি চলে গেলেন।

এরপর নবীজি মক্কাবাসীকে সরাসরি ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করলেন। একদিন তিনি শহরের উপর দাঁড়ালেন এবং সবাইকে একত্রিত হওয়ার জন্য আহ্বান জানালেন। সবাই জড়ো হলে তিনি বললেন, ‘যদি আমি তোমাদের বলি যে, এই পাহাড়ের ওপারে বিশাল অশ্বারোহী বাহিনী মক্কা আক্রমণের জন্যে সমবেত হয়েছে, তোমরা কি আমার কথা বিশ্বাস করবে?’

সবাই একবাক্যে জবাব দিল, ‘অবশ্যই! কারণ আপনি সত্যবাদী। কখনো আপনাকে আমরা মিথ্যা বলতে শুনিনি।’

নবীজী তখন বললেন, ‘তাহলে শোনো, আমি একজন সতর্ককারী! আমি তোমাদের সতর্ক করছি মহাবিচার দিবসের ভয়াবহ শাস্তি থেকে। এক আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নাই—এই ঘোষণা না দেয়া পর্যন্ত দুনিয়া বা আখেরাতে আমি তোমাদের কোনো কল্যাণ করতে পারব না।’

ধনাঢ্য বিলাসী বদমেজাজী আবু লাহাব সাথে সাথে চিৎকার করে উঠল, ‘তোমার বিনাশ হোক! এই উদ্ভট কথা শোনাতে তুমি আমাদের ডেকেছ!’। সমবেতরা আবু লাহাবের পক্ষ নিয়ে তাকে গালাগালি করতে করতে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর মুহাম্মদ (সাঃ) দেখলেন পাহাড়ে তিনি একাই দাঁড়িয়ে আছেন। বুঝলেন, আসন্ন সময় হবে কত কঠিন!

প্রথমদিকে কুরাইশরা ইসলাম ধর্মকে তেমন গুরুত্ব দেয়নি। বরং হাসি-তামাশা, ঠাট্টা-বিদ্রূপ, বিরোধিতায় সীমাবদ্ধ ছিল। এই বিষয়টাকে একটি বিচ্ছিন্ন ভিন্নমত মনে করেছিল। কারণ এরকম ভিন্নমতাবলম্বী এর আগে এসেছিল। এদিকে শোষিত-বঞ্চিতরা কোরআনের বাণী মধ্যে তাদের মুক্তির আলো দেখতে পেল। ফলে নতুন ধর্মের প্রতি তাদের আকর্ষণ বাড়তে লাগলো। কুরাইশরা তখন বুঝতে পারলো। তারা বুঝতে পারলো যে, যদি নতুনের ধর্মের বিস্তার লাভ করে তাহলে তাদের ধর্মকেন্দ্রিক যে ব্যবসা-বাণিজ্য রয়েছে এবং এই ধর্মকে ব্যবহার করে তারা যেভাবে শোষণ জুলুম নির্যাতন করছে তা বন্ধ হয়ে যাবে এবং তাদের বিশেষ সম্মান ও সুযোগ সুবিধা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। আসলে মক্কা তখন হয়ে উঠেছিল অর্থনৈতিক কেন্দ্র। কুরাইশরা ছিল মূল অর্থ লগ্নিকারী। ফটকাবাজারী ও সব ধরনের লেনদেনের নিয়ন্ত্রক। এডেন থেকে গাজা, দামেশক থেকে ইরাক পর্যন্ত যে-কোনো বিনিয়োগে একছত্র অধিপতি।

তারা শুধু মক্কার অভিজাতদেরই নয়, চারপাশের গোত্রগুলোর অভিজাতদেরও এই বিনিয়োগ, মুনাফা ও ঋণের জালে আবদ্ধ করে ফেলেছিল। আরব ও পার্শ্ববর্তী এলাকা- দামেশক, আলেকজান্দ্রিয়া, গাজা, ইরাক, সানা, এডেনের ব্যবসার নিয়ন্ত্রক ছিল এই বেনিয়া সিন্ডিকেট। আর এই শোষকদের রক্ষাকবচ ছিল কাবার ধর্মীয় মর্যাদা। আসলে কোরআন কোনো বিচ্ছিন্ন মরু জনপদে নাজিল হয়নি। বরং নাজিল হয়েছিল এক রমরমা বিকাশমান পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক কেন্দ্রে, ঘনবসতিপূর্ণ শহরে। কোরআন যে তাদের শোষণের মূল কাঠামোয় আঘাত হানছে, তা শোষকদের বুঝতে বাকি থাকল না।

(চলবে)