কিভাবে সত্যের বাণী প্রচারে রত হলেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) (পর্ব-০৫)

quran

পর্ব-০৫ 

আবু বকরের মা উম্মে জামিলের কাছে গেলেন। উম্মে জামিল নবীজী বা আবু বকর সম্পর্কে কোনোকিছু জানার কথা অস্বীকার করলেন। তবে বললেন, আপনি চাইলে আমি আপনার ছেলেকে দেখতে যেতে পারি। উম্মে জামিলের প্রস্তাবকে আবু বকরের মা স্বাগত জানালেন। মা উম্মে জামিলকে নিয়ে এলেন ছেলের কাছে। আবু বকর উম্মে জামিলের কাছে নবীজীর কথা জানতে চাইলেন। উম্মে জামিল সেখানে উপস্থিত মায়ের দিকে তাকালেন। আবু বকর আশ্বস্ত করলেন, তার দিক থেকে ভয়ের কিছু নেই। তখন উম্মে জামিল বললেন, নবীজী ভালো আছেন এবং নিরাপদে আরকামের ঘরে অবস্থান করছেন। আবু বকর তখন বললেন, আমি আল্লাহর নামে শপথ করেছি যে, নবীজীকে না দেখা পর্যন্ত আমি পানি বা খাবার গ্রহণ করব না।

লোকজনের সামনে পড়ার সম্ভাবনা কমে যাবে এইজন্য এই দুই নারী আবু বকরকে নিয়ে রাত গভীর হলে বের হন। দুই নারীর কাঁধে ভর করে কোনোমতে হাঁটতে হাঁটতে আবুবকর আরকামের ঘরে উপস্থিত হন। নবীজি তার স্নেহ ভালোবাসা মায়া-মমতা দিয়ে দুহাতে তাকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খেলেন। উপস্থিত মুসলমানরাও তাকে উষ্ণ সম্বর্ধনা জানাল। নবীজী তার অবস্থা জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বললেন, আমি ভালো আছি। শুধু আমার মুখমণ্ডলের আঘাত ছাড়া। তিনি এরপর মাকে দেখিয়ে বললেন, আমার মা তার পুত্রের ভালো যত্নই নিচ্ছেন। আপনি তার জন্যে দোয়া করুন। তাকে মুসলমান হওয়ার আহ্বান জানান। আপনার দোয়ার উছিলায় আল্লাহ যেন তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করেন। নবীজী দোয়া করলেন এবং ইসলাম সম্পর্কে বললেন। কয়েকদিন পরই মা ইসলাম গ্রহণ করলেন।

এ ঘটনা থেকে তিনটি বিষয় সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে-

১. ইসলামের বিকাশলগ্নে মুসলমানরা নিজেকে ইসলামের সাথে শনাক্ত করতে কতটা সতর্কতা অবলম্বন করতেন। তখন পর্যন্ত ইসলামের দাওয়াত দেয়া হতো খুব গোপনে। তাই উম্মে জামিল আবু বকরের মাকে নবীজী সম্পর্কে কোনো তথ্যই দেননি। তিনি যে নবীজী বা আবু বকর সম্পর্কে কিছু জানেন, তাও অস্বীকার করেছেন। এমনকি তিনি যখন আবু বকরকে দেখেন, তখনও তার মায়ের উপস্থিতিতে নবীজীর কোনো তথ্য দিতে ইচ্ছুক ছিলেন না। আবু বকর যখন তাকে আশ্বস্ত করলেন যে, তার মায়ের সামনে কথা বললে কোনো ক্ষতির আশঙ্কা নেই, তখনই উম্মে জামিল নবীজীর তথ্য তাকে জানান।

২. হিজরতের দশ বছর আগেও আবু বকরের নবীপ্রেমের গভীরতা এই ঘটনার মধ্য দিয়ে সুস্পষ্ট হয়ে উঠে। যে সময় আবু বকরের জন্যে খাদ্য ও পানির সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল, সে সময়ও তিনি নবীজীর সাথে দেখা করে তাঁর নিরাপত্তা সম্পর্কে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত খাবার গ্রহণ করেননি।

৩. ঘটনা আরো বলে দেয়, সত্য অস্বীকারকারীরা যখনই সুযোগ পেয়েছে তারা বিশ্বাসীদের ওপর আঘাত, আক্রমণ, প্রহার এমনকি হত্যা করতেও দ্বিধান্বিত ছিল না। আবু বকর কোরাইশদের তায়িম গোত্রভুক্ত ছিলেন। তার গোত্রের সদস্যরা তার সুরক্ষায় প্রস্তুত ছিল। তারাই প্রহার থেকে তাকে উদ্ধার করে এবং কাবা প্রাঙ্গণে শপথ নেয় যে, আবু বকরের মৃত্যু হলে তারা উতবা ইবনে রাবিয়াকে খুন করে এর বদলা নেবে। অভিজাত আবু বকরের ওপরই যখন এমন নৃশংস হামলা তখন সাধারণ বিশ্বাসীদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা যে-কেউ আঁচ করে নিতে পারে।

সাধারণভাবে এখানে মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, মক্কার অভিজাতরা কেন ইসলামের চরম বিরোধিতা করেছিল অনেকগুলো কারণের ভেতরে একটি প্রধান কারণ ছিল ‘পরকালীন শাস্তির ভয়’। ওই সময় প্রচলিত ধর্ম বিশ্বাসে পরকালে কর্ম অনুসারে শাস্তি ভোগ বা পুরস্কারের কোন স্থান ছিলো না। কিন্তু ইসলাম ধর্মে এই বিষয়টি সুনির্দিষ্ট করে বলা ছিল । নীতি-নৈতিকতার কোনও বালাই ছিল না। জীবন মানেই ছিল ভোগবিলাস আর বিকৃত আনন্দ ছিল প্রতিদিনের অভ্যাস। যে কোন উপায়েই হোক না কেন অর্থ উপার্জন করে আর ভোগবিলাসে ডুবে থাক। তাদের কথা ছিল মরার সাথেসাথেই সব শেষ।

( চলবে)