কিভাবে সত্যের বাণী প্রচারে রত হলেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) (পর্ব-০৬)

আকীদাহ Contributor
quran

পর্ব-০৬

কুরাইশদের প্রচলিত এই ভ্রান্ত চিন্তা ধারার বিপরীতে কোরআনের সূরাগুলো ওদের অন্তরাত্মাকে কাঁপিয়ে দিতে লাগল। কুরআনের একের পর এক সূরায় পরকালের অর্থাৎ আখেরাতের, কেয়ামতের, বিচার দিবসে আল্লাহর সামনে হাজির হওয়া এবং সকল কাজের জন্য জবাবদিহিতার বিষয়গুলো ওদের অন্তরাত্মাকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। পবিত্র কুরআনের ভাষায়, বাণী ও ধ্বনির ব্যঞ্জনায় উপস্থাপন করল যা ওদের অন্তরাত্মাকে কাঁপিয়ে দিল। যেমনঃ

‘যখন সূর্য অন্ধকারে ঢেকে যাবে,

যখন তারকারাজি নিজেদের আলো হারাবে,

যখন পর্বতমালা মরীচিকার ন্যায় উধাও হবে,

যখন পূর্ণ গর্ভবতী উটনী পরিত্যক্ত হবে,

যখন সকল বন্যপশুকে একত্র করা হবে,

যখন সমুদ্রের জলরাশি স্ফীত হবে,

যখন দেহে আবার আত্মা সংযুক্ত হবে,

যখন জীবন্ত কবর দেয়া শিশুকন্যাকে জিজ্ঞেস করা হবে কী অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?

যখন প্রত্যেকের আমলনামা দেখানো হবে,

যখন আকাশের আবরণ সরানো হবে,

যখন জাহান্নামের আগুন গনগনে লাল করা হবে,

যখন জান্নাতকে দৃশ্যমান করা হবে,

সেদিন প্রত্যেকেই জানতে পারবে,

কী পরিণতির জন্যে সে নিজেকে প্রস্তুত করেছে (বুঝতে পারবে কী করা উচিত ছিল, আর কী করা উচিত হয় নি)।’ [সূরা তাকভির : ১-১৪]

সূরা আবাসা

‘যখন গগনবিদারী ধ্বনির সাথে কেয়ামত হবে,

সেদিন প্রত্যেকে নিজের ভাই, মা-বাবা, স্ত্রী ও সন্তানদের কাছ থেকে পালিয়ে যেতে চাইবে।

সেদিন প্রত্যেকে শুধু নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়বে।

সেদিন অনেক চেহারা হবে আনন্দোচ্ছল, হাস্যোজ্জ্বল, পরিতৃপ্ত ও উপচে পড়া সুখী।

এবং অনেক চেহারা হবে বিষণ্ন মলিন ধূসর ও কালিমাচ্ছন্ন। এরাই সত্য অস্বীকারকারী, পাপ-পঙ্কিলতায় নিমজ্জিত।’ (সূরা আবাসা : ৩৩-৪২)

সূরা মা’আরিজ

‘সেদিন আকাশ হবে গলিত তামার মতো,

পাহাড়-পর্বত হবে রঙিন ধুনা পশমের মতো।

সেদিন চোখের সামনে থাকলেও বন্ধু বন্ধুর খোঁজ নেবে না।

সেদিন অপরাধীরা শাস্তি থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্যে

মুক্তিপণ হিসেবে দিতে চাইবে

সন্তানসন্ততি, স্ত্রী, ভাই ও আশ্রয়দানকারী আত্মীয়স্বজনকে।

নিজেকে বাঁচানোর জন্যে সে দিতে চাইবে পৃথিবীর সবকিছু।

না, কোনোকিছুই তাকে রক্ষা করতে পারবে না

তার জন্যে অপেক্ষমাণ গনগনে আগুন থেকে,

যা চামড়া ঝলসে শরীর থেকে খসিয়ে নেবে।

জাহান্নাম সেদিন উচ্চস্বরে ডাকবে তাদের,

যারা ন্যায় থেকে দূরে সরে গিয়েছিল,

যারা সত্যকে প্রত্যাখ্যান করেছিল,

যারা ধনসম্পত্তি সংগ্রহ করে (সৎ কাজে ব্যয় না করে)

কৃপণের মতো সংরক্ষিত করে রেখেছিল (সূরা মা’আরিজ : ৮-১৮)

সূরা হাক্কা

‘সেই দিন তোমরা মহাবিচারের সম্মুখীন হবে।

তোমাদের কোনোকিছুই গোপন থাকবে না।

তখন যার আমলনামা ডান হাতে দেয়া হবে, সে আনন্দিত হবে। বলবে, এই নাও আমার আমলনামা পড়ে দেখ। আমি জানতাম যে, একদিন আমাকে আমার প্রতিটি কাজের হিসাব দিতে হবে!

সুতরাং সে থাকবে উপচে পড়া সুখের মধ্যে সুউচ্চ জান্নাতে, সেখানে গুচ্ছ গুচ্ছ রকমারি ফল ঝুলে থাকবে হাতের নাগালের মধ্যে।

(আল্লাহর এই রহমতপ্রাপ্তদের বলা হবে) দুনিয়ায় তুমি যে সৎকর্ম করেছিলে, তারই পুরস্কার হিসেবে পানাহার করো পূর্ণ তৃপ্তির সাথে।

মহাবিচার দিবসে যার আমলনামা বাম হাতে দেয়া হবে, সে আর্তনাদ করে বলবে, ‘হায়! আমাকে যদি আমার আমলনামা দেয়া না হতো আর আমি যদি আমার রেকর্ড না দেখতাম!

হায়! আমার দুনিয়ার মৃত্যুই যদি চূড়ান্ত হতো! আমার ধনসম্পত্তি তো কোনো কাজে এলো না। আর আমার ক্ষমতাও তো হাতছাড়া হয়ে গেছে।’

তখন ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দেয়া হবে, ওকে ধরো, গলায় বেড়ি লাগাও আর নিক্ষেপ করো জাহান্নামে।

কারণ সে আল্লাহকে বিশ্বাস করে নি, অভাবীকে অন্নদানে অন্যকে উৎসাহিত করে নি। অতএব এখানে সে হবে বন্ধুহীন।

ক্ষতনিঃসৃত পুঁজ ছাড়া তার জন্যে কোনো খাবার থাকবে না, …….।’ (সূরা হাক্কা : ১৮-৩৭)

সূরা নিসা

‘যারা আমার বিধান মানতে অস্বীকার করবে তারা আগুনে পুড়বেই। ত্বক একবার পুড়ে গেলে আবার নতুন ত্বক সৃষ্টি করা হবে। আবার তা পুড়বে। এভাবেই তারা পুরোমাত্রার শাস্তি ভোগ করবে।’ (সূরা নিসা : ৫৬)

সূরা হুমাজাহ

‘দুর্ভোগ এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে, যে সামনাসামনি দুর্ব্যবহার করে এবং পেছনে নিন্দা করে। (দুর্ভোগ এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে) যে (কৃপণের মতো) অর্থ জমায় আর বার বার তা গণনা করে এবং একে নিজের রক্ষাকবচ মনে করে। সে মনে করে তার অর্থ তাকে অনন্তকাল বাঁচিয়ে রাখবে। না, কখনো নয়।

সে-তো (পরকালে) ‘হুতামা’য় নিক্ষিপ্ত হবে। তুমি কি জানো ‘হুতামা’ কী?

হুতামা হচ্ছে বিশাল প্রজ্বলিত চুল্লি যার আগুন হৃদয়কে চূর্ণবিচূর্ণ করে দহন করবে। বিশাল স্তম্ভসমূহ পরিবেষ্টিত চুল্লির মুখও ঢেকে দেয়া হবে (দহনযন্ত্রণাকে চূড়ান্ত রূপ দেয়ার জন্যে)।’ (সূরা হুমাজাহ : ১-৯)

যেকোনো সত্যির একটি আলাদা শক্তি রয়েছে। আমাদের পরান তো মহান রাব্বুল আলামিনের কাছ থেকে প্রেরিত। এমনকি কোরাইশ নেতাদের ওপরও এর প্রভাব যে কত গভীর ছিল একটি ঘটনা থেকে তা পরিষ্কার বোঝা যায়। একরাতে পারস্পরিক কোনো আলাপ ছাড়াই আবু সুফিয়ান, আবু জেহেল ও আল আখনাস ইবনে শরিক পৃথক পৃথকভাবে মুহাম্মদের (স) ঘরে উপস্থিত হলেন তাঁর আলোচনা শোনার জন্যে। প্রত্যেকেই অন্ধকার কোনা দেখে বসে পড়লেন।তারা আলোচনা প্রার্থনা ও গভীর রাতে তার আকর্ষণীয় কণ্ঠে কোরআনের তেলাওয়াত শুনলেন। অন্ধকার থাকতেই তারা রাস্তায় বেরিয়ে পড়লেন। হঠাৎই মুখোমুখি হলেন পরস্পরের। কারোই বুঝতে বাকি থাকল না তারা কোথায় গিয়েছিলেন। প্রত্যেকে একে অপরকে দোষারোপ করলেন এমন ক্ষতিকর কৌতূহলের জন্যে। তারা বললেন, সাধারণ কোরাইশরা এই ঘটনা জানলে তাদের মনোবল ভেঙ্গে পড়বে। তারা পরস্পরের কাছে প্রতিজ্ঞা করলেন, এমন কাজ তারা আর কখনো করবেন না। কিন্তু পরের রাতে নির্ধারিত সময়ে প্রত্যেকেরই মনে হলো, কী যেন তাদের টেনে নিয়ে যাচ্ছে মুহাম্মদের (স) বাড়িতে। কিছুতেই নিজেকে তারা থামাতে পারছে না। সারারাত একইভাবে কাটাল তারা মন্ত্রমুগ্ধের মতো। ফেরার পথে আবার পরস্পরের সাথে দেখা। আবার পরস্পরকে দোষারোপ। আবার প্রতিজ্ঞা। কিন্তু লাভ হলো না। তৃতীয় রাতেও ঘটল একই ঘটনা। আবার রাস্তায় তিনজনের দেখা। এবার অলঙ্ঘনীয় প্রতিজ্ঞা। না! আর কখনো নয়। সমাজপতি হওয়ার পর আমরাই যদি নিজেদের এ বাণী শোনা থেকে ফেরাতে না পারি, তবে সাধারণ মানুষের কী অবস্থা হবে!

নবীজি তার জীবনকে উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের এই সত্য বাণী প্রচারের জন্য। যাতে মানুষ হেদায়েতের পথে আসে, মহান রাব্বুল আলামিনের রহমতের পথে আসে। এবং এই বাণী যেন পৌছে যায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মর কাছে। আমরা অত্যন্ত ভাগ্যবান যে আমরা এই বাণী পেয়েছি। যা নবীজিকে অত্যন্ত কঠিন কষ্টের যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হয়েছে। এখন আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে এই বাণীকে নিজের জীবনে পরিপূর্ণ আকারে গ্রহণ করা এবং দিক নির্দেশনা অনুযায়ী জীবনকে পরিচালিত করা। মহান রাব্বুল আলামিন আমাদের সকলকে কবুল করুক।

(সমাপ্ত)

Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.