কিশোর-কিশোরী সন্তানের জন্য কী করণীয়?

ছেলেমেয়ে বড় হওয়ার সাথে সাথে বাবামায়ের দায়িত্ব এবং সমস্যা দুটোই বেড়ে যায়। যতদিন ছোটো ছিল তারা, সমস্ত কিছু বাবামায়ের উপরেই নির্ভরশীল ছিল কিন্তু এবার তারা বড় হচ্ছে। জীবনের কিছুই তারা দেখেনি শুধুমাত্র কয়েকটা গল্পের বই এবং বন্ধুবান্ধবদের দেখে একটা কৃত্রিম পৃথিবী বানিয়ে নিয়ে নিজের নিয়মে চলতে চায় তারা। অথচ ওদের কিন্তু কোনো দোষ নেই, এটাই সাধারণ নিয়ম এবং এটাই হওয়া উচিত। আপনার ছেলেমেয়ে যদি সতেরোআঠারো বছর বয়সেও আপনার কথা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে, সেটাই বরণ অস্বাভাবিক। 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে কেন তারা এরকম করে এবং এর সমাধান কী?

প্রথম প্রশ্নের উত্তরে আসা যাক: বয়ঃসন্ধিকাল অর্থাৎ ১০১৯ বছর বয়স পর্যন্ত কিশোরকিশোরীদের মধ্যে শারীরিক এবং মানসিক পরিবর্তন আসতে শুরু করে। সময়টাকে আর একটু কমিয়ে বারো থেকে সতেরো বললে আরও ভালো হয়। শরীরে বিভিন্ন রকম হরমোনের ক্ষরণ শুরু হয় এই সময়, এই হরমোন গুলিই বালক থেকে কিশোরে পরিণত হওয়ার পিছনে প্রধান ভূমিকা নেয়। নিজের মতামত, দাবি এবং সমস্ত বিষয়ে কৌতুহল এই বয়ঃসন্ধিকালেই তৈরি হয়। এতে বিদ্রোহী মনোভাব, ছন্নছাড়া জীবনযাপন, অমনোযোগিতা এবং অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসের মতো নতুন সমস্যাগুলো বাবামায়ের সামনে উঠে আসে। এমতাবস্থায় আপনার বেশ কিছু করণীয় আছে। 

স্বীকার করুন আপনার সন্তান বড় হচ্ছে 

বাবামায়েদের সবচেয়ে বদ অভ্যাস হলো ছেলেমেয়ের মতামতকে গুরুত্ব না দিয়ে তাকে ছোট্টটি মনে করা। এতে ফল হয় উল্টো, আপনার চোখের আড়ালে তারা ঘটাতে থাকে নতুন সব কান্ডকারখানা। তাই প্রথমে স্বীকার করুন সে বড় হচ্ছে এবং তার কাছে তার নিজস্ব মতামতের গুরুত্ব আছে, আত্মসম্মান আছে। কিশোর ছেলেমেয়েদের ক্ষেত্রে এই ছোট জায়গাগুলো ভীষণ সংবেদনশীল, একটু আঘাত লাগলেই নিজেকে সম্পূর্ণ গুটিয়ে নিতে পারে আপনার থেকে। 

শান্ত প্রতিক্রিয়া দেখান

এই সময় ছেলেমেয়েদের বহুকার্যকলাপে মাথা গরম হয়ে যেতে পারে, কিন্তু ওটি করা চলবে না। যখনই আপনি মেজাজ হারিয়ে চিৎকার করে বকাবকি করবেন, সমস্যাটার সমাধান আর হবে না। ভীষণ রাগ হলেও তাকে ঠান্ডা মাথায় জিজ্ঞাসা করুন তার যুক্তি কি এবং তার মতে এটা কি ঠিক। যুক্তি দিয়ে কাবু করতে পারলে তবেই তারা পরের বারে কাজটা করার আগে ভাববে। আবার এমনও হতে পারে আপনার যুক্তি ভুল অথবা সে যেটা করেছে তার যথাযথ ব্যাখ্যা তার কাছে আছে, তখন আপনাকে এক পা পিছু হঠতে হবে। 

কিছু নিয়ম রাখুন

কিছু অলঙ্ঘনীয় নিয়ম রাখুন যা পালন না করলে যথাযথ শাস্তি থাকবে। তবে শাস্তি মানে মারধর বা বকাবকি নয়, শান্ত ভাবে তার ফোনটা একদিনের জন্য নিয়ে নিন অথবা তার প্রিয়ে টিভির চ্যানেলটা ব্লক করে দিন। এতে দুপক্ষের মধ্যে যথাযথ সম্মান বজায় থাকবে এবং আপনার ছেলে বা মেয়ে একটা নির্দিষ্ট নিয়মে চলবে। তবে নিয়ম করা মানে পদে পদে নিয়ম নয়, তিনটে কি চারটে নিয়ম যা কার্যতই অলঙ্ঘনীয়। এর মধ্যে রাত করে বাড়ি ফেরা, টিউশন বা স্কুল কেটে অন্য কোথাও যাওয়া এসব থাকতে পারে। একটা কোড অফ কনডাক্ট থাকলে বাড়িতে শান্তি বজায় থাকে। 

বাস্তবতার সাথে পরিচয় ঘটান

আপনার মেয়ে খুব আদরের অথবা ছেলেকে ভীষণ যত্ন করে মানুষ করছেন, নিজে যে কষ্টের মধ্যে বড় হয়েছেন তা যেন তাদের সাথে না হয় এজন্য প্রাণপণ পরিশ্রম করছেন। কিন্তু আপনি কি তাকে বাস্তবতা থেকে একটু দূরে সড়িয়ে রাখছেন না? একটা সময় আসবে যখন ওদের নিজেরটা নিজেকে বুঝে নিতে হবে, তখন যেন তারা না বলে যে বাবামা আমাকে এগুলো কখনও বলেনি। তাই তাকে কম বয়স থেকেই পরিশ্রমের মাহাত্ম, টাকাপয়সা সামলানো, অচেনা পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া নিজের মতামত দেওয়া, এই বিষয় গুলোর সাথে পরিচয় করাবেন। তবে হ্যাঁ নিজের জীবনকে তার উপর চাপিয়ে দেবেন না, তার সাথে আপনার বয়সের পার্থক্য তিরিশ বছরএই সময় পৃথিবী বহু উন্নতি করেছে এবং আপনার সন্তানও এই নতুন পৃথিবীর বাসিন্দা। তাই সে যদি কোনো বিকল্প পথের কথা বলে সেটাকে জরিপ করে দেখুন, নস্যাৎ করে দেবেন না। একজন আদর্শ অভিভাবক তার সন্তানকে যথেষ্ট সময় দেয়, আপনি যদি সন্তানের জীবনের স্তম্ভ হয়ে উঠতে চান আপনাকেও দিতে হবে।