কীভাবে গড়ে উঠেছে ইসলামী স্থাপত্যশৈলী?

Arabic Poetry
Ceiling decoration of the tomb of Hafez great poet in Shiraz, Iran.

গত চল্লিশ বছর ধরে ১৮ নভেম্বর তারিখে ইউনেসকো (UNESCO) আন্তর্জাতিক ইসলামী শিল্প ও সংস্কৃতি দিবস পালন করে। ২০১৯ সালে এই তারিখ ইউনেসকো এই বিষয়ে চল্লিশ তম সেশনটি পালন করেছে।

এই দিবস পালন করার মূল উদ্দেশ্য প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত ইসলাম ধর্ম , সংস্কৃতি ও সভ্যতা ঠিক কী ধরনের প্রভাবে ফেলেছে সভ্যতার বুকে সে বিষয়ে পৃথিবীর মানুষকে জানানো। ইসলামী শিল্পের সূক্ষ্মতা সম্পর্কে বাকি বিশ্বকে সচেতন করা এবং কীভাবে সভ্যতার পটপরিবর্তনের সঙ্গে-সঙ্গে ইসলামী শিল্প ও সংস্কৃতির বিবর্তন ঘটেছে সে বিষয়ে সম্যক ধারণা দেওয়া।

শুধু ইসলামী শিল্প ও সংস্কৃতির গুণগ্রাহীতার জন্যই যে এই দিন পালন করা হয় তা নয়, উপরন্তু সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, মতামত ও অভিব্যক্তি প্রকাশের স্বাধীনতা, নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সুরক্ষা ও অন্যান্য সংস্কৃতির সঙ্গে নিজের সংস্কৃতি ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যমেও এই দিন পালন করেন মুসলমানরা।

বিভিন্ন রকম আলোচনা, কনফারেন্স, বিতর্কসভা, ওয়ার্কশপ ইত্যাদিতে জমজমাট হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক ইসলামী শিল্প ও সংস্কৃতি দিবস। এটি মনে করিয়ে দেয় ইসলামী স্থাপত্যের সৌন্দর্যের সঙ্গে পৃথিবীর আপামর জনসাধারণ গভীরভাবে পরিচিত।

উজ্জ্বল রঙ, ঐতিহ্যময় কারুকার্য ও প্রতিসম সিলুয়েট… এই স্বাতন্ত্র্য প্রায় সপ্তম শতক থেকে সারা বিশ্বের কাছে এই স্থাপত্যকে বিখ্যাত ও আদরণীয় করে তুলেছে।

যদিও এই স্থাপত্য দেশ ও কাল নির্বিশেষে পালটে গিয়েছে অনেক, তথাপি, কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য সবকটির মধ্যেই বর্তমান। ভাল করে নজর করলে দুটি আলাদা নির্মাণের মধ্যে অনেক সাদৃশ্য দেখা যায়।

ইসলামী স্থাপত্যের সূচনাঃ

এই বিশেষ স্থাপত্যবিষয়ক ঐতিহ্য মূলত দুই ধরনের জায়গায় পাওয়া যায়,

প্রথমত, ইসলাম ধর্মাবলম্বি দেশগুলিতে

দ্বিতীয়ত, যে সমস্ত দেশ মধ্যযুগে ইসলামের ছায়ায় এসেছে, যে সমস্ত দেশের শাসনভার ইসলাম নিজের হাতে তুলে নিয়েছে।

আরব দেশ, আলজেরিয়া, মিশরের সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপের যে যে অঞ্চলে মুর দের প্রভাব রয়েছে সেই অঞ্চলেও ইসলামী স্থাপত্যের প্রসার দেখা যায়।

উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, স্পেন, পর্তুগাল, ইতালি ও মালটায় প্রভূত ভাবে ইসলামি স্থাপত্যকীর্তি রয়েছে।

সাধারণত মসজিদগুলিকেই ইসলামী স্থাপত্যের উজ্জ্বল নিদর্শন ধরা হয়, তবে মসজিদ ছাড়াও প্রাসাদ, সেরেস্তা, সরকারি দালান কোঠা ইত্যাদিও স্থাপত্যকীর্তির উদাহরণ হিসাবে গৃহীত হতে পারে। কিন্তু সবকটি নির্মাণের কিছু সাধারণ সদৃশতা রয়েছে।

অনেক ঐতিহাসিকের মতে ইরিত্রিয়ার সাহাবি মসজিদ ও মদিনার কুবা মসজিদ থেকে ইসলামই স্থাপত্যর যাত্রা শুরু হয়।

dreamstime_xs_181928966

 © Nuttawut Uttamaharad | Dreamstime.com

ইসলামী স্থাপত্যের গঠনঃ

সপ্তম শতাব্দী থেকে সূচিত হওয়া ইসলামী স্থাপত্য মূলত দুই ধরনের স্থাপত্যের ধরন দ্বারা প্রভাবিত,

১। গ্রেকো রোমান স্থাপত্যঃ বিশেষ করে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের আশপাশে এই ধরনের স্থাপত্য দেখা যায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় সিরিয়া, মিশর ইত্যাদি জায়গার নাম। এই স্থাপত্যের মধ্যে গ্রিক হেলেনিক যুগ ও প্রাচীন রোমান স্থাপত্যের প্রভাব রয়েছে।

২। প্রাচ্যের স্থাপত্যঃ মেসোপটেমিয়া ও পারস্যের স্থাপত্য যা মূলত সানাসিন স্থাপত্য থেকে উদ্ভাবিত।

প্রাথমিক ভাবে এই দুই স্থাপত্যশৈলী থেকে ইসলামী স্থাপত্যের সূচনা হওয়ার পর আস্তে আস্তে তা নতুন আঙ্গিকে বদলে যেতে থাকে।

স্থাপত্যের বিশেষ বৈশিষ্ট্যঃ

১। মিনারঃ

টাওয়ারের মতো লম্বা ও উঁচু নির্মাণ যার মধ্যে সরু সিঁড়ি ও ছোট ছোট জানলা রয়েছে, তাকেই সাধারণত মিনার বলা হয়। প্রাচীনতম ইসলামী স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন এটি। সাধারণত বেশিরভাগ মসজিদের পাশে এক বা একাধিক মিনার দেখতে পাওয়া যায়। এই মিনার থেকেই মুয়াজ্জিন সাধারণত আজানের জন্য ডাক দেন। প্রাচীনকালে কোণও মসজিদে একের বেশি মিনার থাকলে ধরে নেওয়া হত সেটি কোনও সুলতানের তৈরি।

২। গম্বুজঃ

বাইজান্টাইন ও ইতালিয় রেনেসাঁর মত ইসলামী স্থাপত্যের মধ্যেও প্রবলভাবে প্রভাব। ফেলেছিল গম্বুজ বা ডোম। সপ্তম শতাব্দীতে জেরুজালেমে গঠিত ‘ দা ডোম অফ দি রক’ নামক স্থাপত্যটি প্রথম গম্বুজের নিদর্শন ধরা হয়। বাইজান্টাইন স্থাপত্যকীর্তির অনুকরণে তৈরি এই অষ্ট কোনী স্থাপত্যর কাঠের গম্বুজটি ষোড়শ শতকে সোনা দিয়ে বাধানো ছিল। অন্যান্য গম্বুজ তিনকোণা পেন্ডেন্টিভের উপর তৈরি হলেও এই গম্বুজটি ষোলটি থামের উপর বিন্যস্ত।

পেন্ডেন্টিভ হল গম্বুজের নীচের ত্রিকোণ অংশ যা মুকারনা বা টাইল দিয়ে সাজানো হয়।

এই মুকারনাগুলি এত সুন্দর হয় ও এত সূক্ষ্ম এদের কারুকাজ হয় যে অনেক সময়েই এদের মৌচাকের সঙ্গে তুলনা করা হয়।

Al Masjid Aqsa Mosque

Al Masjid Aqsa Mosque.

আর্চ বা খিলান সমূহঃ

ইসলামী স্থাপত্যর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল আর্চ বা খিলান। যেকোনো নির্মাণের প্রবেশদ্বারে, অন্দরমহলে ও বহির্দ্বারে খিলান থাকবেই থাকবে। সাধারণত চারধরনের খিলান দেখা যায় এই স্থাপত্যশৈলীতে,

সরু খিলানঃ

বক্র চূড়া সমন্বিত সরু স্থাপত্যকে সরু খিলান বলা হয়। গথিক স্থাপত্যর সঙ্গে এর খানিক মিল রয়েছে।

অজই খিলানঃ

এই ধরনের খিলান সরু খিলানের মতই দেখতে হয়, শুধু চূড়া গোলাকৃতি না হয়ে খানিক তরঙ্গায়িত হয়।

© Hin255 | Dreamstime.com

ঘোড়ার নালের ন্যায় খিলানঃ

মুরদের স্থাপত্যে মূলত এই ধরনের খিলান দেখা যায়। নিপুণ গোলাকৃতি এই চূড়ার নীচের ভাগ সরু হয়।

katerina-kerdi--IGVkXGPpuo-unsplash

Fotoğraf: Katerina Kerdi-Unsplash

পত্রাকার খিলানঃ

গোলাকৃতি খিলানের মাথায় অসংখ্য পাতার আকারের কারুকাজ। এই ধরনের খিলানকে পত্রাকার খিলান বলে। মুরদের স্থাপত্যের একটি অংশ এটিও।

স্বর্গের বাগানঃ

ইসলামী স্থাপত্যর মধ্যে অন্যতম হল সুন্দর বাগান ও পানির ধারা। মসজিদ থেকে আরম্ভ করে যেকোনো ইসলামই নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল বাগান ও পানি। ভারতের তাজমহল বা স্পেনের আলহামরা প্রভৃতিতে এই বাগান দেখা যায় ।