কীভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল লাইবেরিয়ার মুসলমানরা?

liberia

সালটা ১৮২৭, আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলে লাইবেরিয়া প্রদেশে আমেরিকার তত্ত্বাবধানে আফ্রো আমেরিকান কালো মানুষের কলোনি তৈরি হল। ততদিনে আমেরিকায় দাসপ্রথা বিলুপ্তির পথে, আমেরিকান কালো মানুষেরা অমেক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর নিজেদের স্বাধীনতা অর্জন করে নিয়েছে। এই স্বাধীন কালো মানুষের মধ্যে প্রায় ৪৬০০০ মানুষ পাড়ি দিল লাইবেরিয়ার এই কলোনিতে। লাইবেরিয়ার প্রদেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেল মনোরোভিয়া।

ইউরোপীয় আগ্রাসন

এই লাইবেরিয়াকেই ধরা হয় ক্যাথলিক আগ্রাসনের ভিত্তিপ্রস্তর হিসাবে। কলোনি স্থাপনের আগে লাইবেরিয়ার স্থানীয় মানুষের মধ্যে অন্তত ৪০ শতাংশ ইসলাম ধর্ম অনুসরণ করতেন। কিন্তু আমেরিকা কলোনি স্থাপনের পর লাইবেরিয়ার দেশীয় মানুষ উপকূল থেকে সরে গিয়ে দেশের অভ্যন্তরে বসবাস করতে শুরু করে। তাও আগ্রাসন থামানো যায় না। ক্রমশ আমেরিকা লাইবেরিয়ার শাসন ভার নিজেদের হাতে তুলে নেয়। লাইবেরিয়ার মানুষজন স্থানীয় ভাষা ছেড়ে ইংরেজিতে কথা বলতে শুরু করে। ইসলাম ধর্ম অনুসরণকারী মানুষ নিজেদের মুসলমান নাম ছেরে আমেরিকান নাম গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। দেশের প্রাথমিক নীতিনির্ধারক হয়ে ওঠে আফ্রিকান আমেরিকানরা। এইভাবেই আমেরিকা ধীরে ধীরে ইসলাম ও লাইবেরিয়ার স্থানীয় সভ্যতা ধুয়ে মুছে দেয়।

মুসলমানদের উপর নির্যাতন

১৯৮০ তে, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি স্যামুয়েল ক্যানোয়েন ডো লাইবেরিয়ায়র একচেটিয়া আফ্রিকান আমেরিকান শাসনের অবসান ঘটাতে এক সামরিক অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন। চার্লস টেলার নামক এক আফ্রিকান আমেরিকান এর প্রতিবাদে রাজধানীতে দাঙ্গা শুরু করে। ১৯৮৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর , চার্লস টেলারের দল ( দয় ন্যাশনাল পেট্রিওটিক ফ্রন্ট অফ লাইবেরিয়া) প্রায় শতাধিক মুসলমানকে হত্যা করে। ৭৫ জন মুসলমান উলেমাকে গ্যাসোলিন ঢেলে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রায় শতাশিক মুসলমান মুয়াত্থিনদের কান ও জিভ কেটে নেওয়া হয়। প্রায় ৭০০০০এর বেশি মুসলমান কপর্দক শূন্য হয়ে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। চার্লসের দল এছাড়াও প্রায় ৭২০টি মসজিদ, ১৫০ টি বুনিয়াদি মাদ্রাসা ও ৪৫টি উচ্চ মাদ্রাসায় ধ্বংসলীলা চালায়।

নয়ের দশকের রক্তক্ষয়ী হামলা

এই হত্যালীলা খুব সহজে শেষ হয়নি, ১৯৯০ সালে স্থানীয় মুসলমানদের উপর অত্যাচারের মাত্রা আরও বাড়ে। এন পি এফ এল-এর সৈন্যরা খুঁজে খুঁজে যে গ্রামে ইসলাম ধর্ম পালন করা হয় সেই গ্রামে অত্যাচার চালাতে শুরু করে। নিরীহ গ্রামবাসীদের বন্দুকের গুলিতে বা ছুরিকাঘাতে খুন করা হতে শুরু করে। অনেকে লাইবেরিয়া ছেড়ে সিয়েরা লিয়োনে পালাতে শুরু করে। কেউ কেউ গিনিতেও আশ্রয় নেয়। ইসলামের জন্য যে সমস্ত মহান মানুষ শহিদ হয়েছিলেন তার মধ্যে অন্যতম হলেন শেখ বাহ, যিনি সুপ্রিম কাউন্সিল অফ ইসলামিক অ্যাফেয়ারের নেতা ছিলেন। আফ্রিকা অত্যন্ত দুর্গম মহাদেশ হওয়ায় পৃথিবীর বাকি দেশের মুসলমানের কাছে এই বিষয়ে খবর পৌঁছয় অনেক দেরিতে।

ঘুরে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার

দেওয়ালে পিঠ ঠেকলে মানুষ ঘুরে দাঁড়ায়। লাইবেরিয়ার মুসলমান ভাই বেরাদররাও ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। আল্লা’তালার ইচ্ছেয় শুরু হয় জিহাদ। ‘সেভ দ্য মুসলিমস অফ লাইবেরিয়া’ নামক ব্যানারের নীচে প্রতিবাদ শুরু হয়। এই প্রথম লাইবেরিয়ার মুসলমানদের একটা রাজনৈতিক অবস্থানের সূচনা হয়।

১৪১২ হিজরি সনে শুরু হওয়া এই জিহাদ সফল হতে শুরু করে। চার্লস টেলারের দলের হাত থেকে নিরীহ মুসলমানদের উদ্ধার কাজ শুরু হয় । উদ্ধার করা হয় প্রচুর মুসলমান গ্রাম। অত্যাচারিত থেকে মুসলমানেরা আস্তে আস্তে সমানে সমানে লড়াই করতে শেখে। যদিও লাইবেরিয়াতে অবস্থিত চার্চ ও ক্যাথলিকরা পুনরায় ধর্মযুদ্ধের আহ্বান জানায় , কিনতু জিহাদিদের হারানো ততদিনে বেশ কঠিন হয়ে গিয়েছে।

প্রচুর যন্ত্রণা ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে লাইবেরিয়ার মুসলমানেরা নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করেছে। আল্লাহর রহমত না থাকলে এই যুদ্ধে তারা জয়ী হত না। আমিন।