কীভাবে জীবনযাপন করেন মায়ানমারের মুসলমানরা?

mosque in yangon
YANGON, MYANMAR - FEBRUARY 14, 2018: Panorama of Persian Mogul mosque with huge white minarets and decorated facade, on February 14 in Yangon. Photo 112606297 © - Dreamstime.com

ভারত বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ বললেই প্রথম যার কথা মনে আসে তা হল মায়ানমার বা বার্মা। ইন্দো-চায়না অংশের উত্তর-পশ্চিমের দেশ বার্মার উত্তর পূর্বে চীনদেশ, দক্ষিণপূর্বে লাওস ও থাইল্যান্ড, পশ্চিমে বাংলাদেশ ও উত্তর পশ্চিমে ভারত অবস্থিত। বঙ্গোপসাগর দেশটির দক্ষিণ পশ্চিম আবৃত করে রেখেছে। 

১৯৮৯ সাল পর্যন্ত দেশটির নাম ছিল বার্মা, তারপর নাম হয় ‘রিপাবলিক ইউনিয়ন অফ মায়ানমার’।

এই মায়ানমারেই ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের সংখ্যা মাত্র ২০ শতাংশ। 

ইসলামের প্রবেশ

মূলত সমুদ্রপথে বাণিজ্যের হাত ধরেই মায়ানমারে ইসলামের প্রবেশ। আরব দেশ থেকে  আগত মুসলমান ব্যবসায়ীর প্রভাবে প্রভাবিত হয়েই এই দেশের বন্দর শহরের মানুষ ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ওঠে। যদিও অনেক ঐতিহাসিক বলেন যে মায়ানমারে ঠিকঠাক বন্দর ছিল না, তাই আরব থেকে আগত জাহাজগুলো অনেকসময়েই মালাক্কা ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াতে চলে যেত। তাই ইসলামের প্রসার সেই অঞ্চলে মায়ানমারের তুলনায় বেশি হয়েছে। এককালে এদেশে পরপর ৪৮ জন মুসলমান শাসক রাজত্ব করেছেন। তার মধ্যে সুলতান সুলাইমান শাহ ছিলেন প্রথম। 

বাগদাদে যখন খলিফা হারুন অল রশিদের রাজত্ব (হিজরি ১৭০-১৯৩ সন) তখন থেকেই মায়ানমারে আরব বাণিজ্য শুরু। 

৬৮৬ হিজরি সনে মুসলমান তাতার জাতি চীনদেশ হয়ে মায়ানমার দখল করে নেয়, সেই সময়েও যথেষ্ট পরিমাণে ইসলামের প্রসার হয়। এমনকি তৎকালীন অত্যাচারী শাসককে গদিচ্যুত করে মায়ানমারের মুসলমানরা নতুন প্রজাদরদী শাসক নির্বাচিত করে। 

মায়ানমারে ইসলামের প্রসারে ভারতেরও ভূমিকা অনস্বীকার্য। হিজরি একাদশ শতকে মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব ও তাঁর ভাই সুজার মধ্যে সংঘাত অনিবার্য হলে শাহজাদা সুজা তৎকালীন আরাকান প্রদেশে নিজেদের সঙ্গীসাথী ও বাহিনী নিয়ে আত্মগোপন করতে বাধ্য হন। এই আরাকান প্রদেশই বর্তমানে মায়ানমার নামে পরিচিত। এই বাহিনীর লোকজন ক্রমশ মায়ানমারের সাধারণ মানুষের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হন, এইভাবেই সূচনা হয় ইসলামের প্রসারের। শুধু তাই নয়, ভারত ও চীনদেশ থেকে অন্যান্য নানা কারণে ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষ মায়ানমারে বসবাস শুরু করেন। 

ইসলামের প্রসার

১৭৮৩ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন বার্মায় কৌনবাউং বংশের রাজ বৌদয়পা প্রথম মুসলমানদের নিজের প্রজা হিসাবে স্বীকার করেন। এমনকী, রাজধানী অমরপুরায় কালাপ্যো মসজিদ স্থাপন করেন। এই কালাপ্যো মসজিদের মতো আরও চল্লিশটি মসজিদ উনি স্থাপন করেন তাঁর সৈন্যবাহিনীর মুসলমান সৈন্যদের জন্য। এছাড়াও আবিদ শাহ হুসেইনি দরগা ও লিউশাহ দরগায় অজস্র মুসলমান মানুষ উপাসনা করতে আসেন। 

বর্তমানে জনগণনা অনুসারে মায়ানমারের সবচেয়ে বড় শহর ইয়াঙ্গনে, মান্দালয় অঞ্চলে ও মন রাজ্যে সবচেয়ে বেশি ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের বসবাস। জনসংখ্যায় ৪.৭ শতাংশ মুসলমান ইয়াঙ্গনে, ৩ শতাংশ মান্দালয়ে ও ৫.৮ শতাংশ মন রাজ্যে অবস্থিত। 

মায়ানমারে  মূলত দুই ধরনের মুসলমান দেখা যায়, কামান ও রোহিঙ্গা। কামান মুসলমানরা যদিও নিজেদের জাতিগত বিশুদ্ধতা বজায় রেখেছে, রোহিঙ্গাদের মধ্যে নানাপ্রকার মিশ্র উপজাতির নিদর্শন রয়েছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ দক্ষিণ চীনদেশীয় মুসলমান, কেউ আবার ভারতের তামিলনাড়ু অঞ্চলের মুসলমান। তবে, মায়ানমারের অনেক ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষই নিজেদের শুধু বার্মার মুসলমান বলে থাকেন। 

রোহিঙ্গা পরিস্থিতি

বর্তমানে এই রোহিঙ্গাদের অবস্থা খুবই খারাপ। বৌদ্ধ ধর্মে হঠাত উগ্র  জাতীয়তাবাদের প্রসার হেতু তারা নিজেদের অঞ্চলে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। অত্যাচারের চোটে মায়ানমার ছেড়ে বাংলাদেশ ও ভারতে রিফিউজি হয়ে চলে আসছেন তাঁরা। 

এতদিন পর্যন্ত কিন্তু বার্মার মুসলমানরা নিজেদের অন্য ধর্মের প্রতিবেশীদের সঙ্গে বিশেষ মিলেমিশেই ছিলেন। এটার কারণ তাঁরা বার্মিজ জীবনযযাত্রা আপন করে নিয়ছিলেন। আরও ভাল করে বলতে গেলে বলতে হয় তাঁরা ইসলাম ও বার্মিজ সামাজিক জীবনযাত্রার এক মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমানের উত্তপ্ত অবস্থায় সেই সহাবস্থান ও শান্তির বিশেষ অবনতি ঘটেছে। উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের সঙ্গে লড়াই করার জন্য মুসলমান যুবসমাজের মধ্যে তৈরি হচ্ছে স্বাভাবিক প্রতিবাদের ইচ্ছা। যদিও, শান্তিপ্রিয় বামার মুসলমানরা এখনও মনে করেন সবার উপরে মানুষ সত্য।