কীভাবে বেঁচে রয়েছেন আফ্রিকা মহাদেশের গিনি প্রদেশের মুসলমানরা?

Guinea Africa

আফ্রিকার ক্ষুদ্রতম দেশ বললে প্রথমেই যে দেশটির কথা মনে আসে তা হল গিনি, যাকে ভৌগলিকরা বিষুবরৈখিক গিনি বলে থাকেন। দেশটির জনসাধারণের ৯০ শতাংশ রোমান ক্যাথলিক ও ৫ থেকে ১০ শতাংশ ইসলাম ধর্মের মানুষ। ইসলাম ধর্মাবলম্বি মানুষদের বেশিরভাগই মূল ভূখণ্ডে বাস করে। জনসাধারণের মধ্যে সংখ্যা লঘিষ্ট মুসলমান জনজাতি হলেও গিনিতে সভ্যতার আলো কিন্তু ইসলামের হাত ধরেই প্রথম এসেছিল।

একাদশ শতকে মরক্কোর আলমোরাভিদ শাসকের হাত ধরে ইসলাম প্রথম গিনিতে পা রাখে। এছাড়াও মুসলমান উলেমা ও ভ্রামণিকরা আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল থেকে যাত্রা শুরু করে গিনিতে পৌঁছয়। তারা তাঁদের বাণী ও ধর্মমতের প্রচার শুরু করেন গিনিতে এবং তৎকালীন গিনির অধিবাসীদের কাছে অত্যন্ত সমাদৃত হন।

এরপর ষোড়শ শতকে গিনি ইসলাম বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে, নাইজেরিয়ায় অবস্থিত মুসলমান বণিকদের সঙ্গে গিনির অধিবাসীদের বাণিজ্য সংঘটিত হত্ব। সেই সমস্ত বণিকদের অনেকেই স্থানীয় মহিলাদের সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন ও গিনিতে বসবাস করতে শুরু করেন। বলাই বাহুল্য, গিনিতে ইসলাম ধর্মের মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে এভাবেই।

ইসলামের প্রভাব ও প্রসার

ষোড়শ শতকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ঘটেছিল গিনিতে, স্থানীয় ফ্যাং উপজাতি ক্যামেরুন থেকে এসে গিনিতে বসবাস করতে শুরু করে, স্থানীয় মুসলমান অধিবাসীদের প্রভাবে তাঁদের মধ্যে ইসলামের প্রতি আগ্রহ জন্মায়। এই ফ্যাং উপজাতিরা অতঃপর ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে শুরু করে। স্বাভাবিক ভাবেই, এর প্রভাব গিনির অন্যান্য উপজাতিদের মধ্যে পড়তে শুরু করে, তারাও একে একে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ওঠে।

অটোমান সাম্রাজ্য সমেত অন্যান্য ইসলামিক সাম্রাজ্যয়ের থেকে ভৌগলিক দূরত্ব বেশি থাকায় গিনিতে ইসলামের প্রসার হয়েছে বেশ ধীরগতিতে। উনবিংশ শতকের ইউরোপিয়ান আগ্রাসন শুরু হলে সেই প্রসারের গতি আরও কমে এসেছে। বিশেষ করে, ১৮৭৯ সালে স্প্যনিশরা গিনি দখল করে নিলে ইসলামের প্রসার একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। স্প্যানিশদের শাসনে খ্রিস্টান ধর্মের জোয়ার আসে গিনিতে, ইসলামের নাম উচ্চারণ করা বে-আইনি হয়ে যায়।

বর্তমানে দেশের বেশিরভাগ মুসলমান জনসংখ্যা উত্তর ও উত্তর পূর্বে রিও মিউনি অঞ্চলে বসবাস করে, অপরদিকে ক্যাথলিক জনসংখ্যা বসবাস করে ফার্নান্দো দ্য প্রভিন্সে। যদিও মুসলমানদের সংখ্যা বেশ কম, তাও নাইজেরিয়া থেকে যে সমস্ত শ্রমিকেরা এসে গিনিতে কাজ করে তারা দেশের ইসলামিক জনসংখ্যা বাড়িয়ে চলেছে।

বিংশ শতাব্দীর গৃহযুদ্ধ

স্প্যানিশ শাসকদের বৈরিপূর্ণ শাসনব্যবস্থার জন্য গিনিতে রাজনৈতিক ও জাতিগত গৃহযুদ্ধের কোনও ইয়ত্তা নেই। ১৯৯৫ পর্যন্ত গিনি ভয়াবহ অশান্তিপূর্ণ দেশ ছিল। ১৯৬৮তে স্পেনীয়দের হাত থেকে স্বাধীনতা পেলেও আভ্যন্তরীণ অশান্তি একটুও কমেনি। তারপর ১৯৯৫-এ আমেরিকান কোম্পানি গিনিতে পেট্রোলিয়াম আবিষ্কার করে। এর পরেই গিনির অবস্থা একটু একটু করে পালটাতে শুরু করে। তবে তাতে স্থানীয় মুসলমানদের অবস্থার খুব উন্নতি হয় না। এখনও কোণও উঁচু সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে মুসলমানরা অংশগ্রহণ করতে পারে না। তাঁদের শহরে বেশি আসা নিষেধ। তাঁদের কোনোরকম অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক স্বাধীনতা নেই।

গিনির মুসলমানদের জীবন বেশ কঠোর। তাঁদের কোনোরকম রাজনৈতিক প্রতিনিধি নেই। স্থানীয় শাসকরা মুফতিকে খুব একটা গুরুত্ব দেয় না। ফলে, স্থানীয় মসজিদগুলি অনেক ক্ষেত্রেই সেরকম সুযোগ সুবিধা পায় না। এমনকি দেশটির ভাষার মধ্যে ফারসি বা আরবি নেই, স্প্যানিশ, ফ্রেঞ্চ, পর্তুগিজ ও বান্টুতে কথা বলেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

তবে, পরম করুণাময় আল্লাহর কৃপায় মুসলমানদের মধ্যে সৌহার্দ্য-এর বন্ধন খুব ধীরে ধীরে হলেও আবার তৈরি হচ্ছে, অনেকখানি অন্ধকারের মধ্যে এ যেন এক আশার আলো।