কীভাবে মিশর হয়ে উঠল ইসলামের দেশ? পর্ব ১

ইতিহাস Contributor
জানা-অজানা
মিশর
Photo: Dreamstime

ইতিহাসে মিশর মানেই রহস্যময় কুয়াশাঘেরা এক অধ্যায়। ঐতিহাসিকরা যখন গবেষণা করেন এই সভ্যতা নিয়ে তখন তাঁদের চোখেও থাকে এই রহস্যভেদ করার নেশা। বাস্তবিকই, নীল নদের তীরের এই সভ্যতা কালক্রমঅনুসারে পরিবর্তিত হয়েছে। দেখেছে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, ধর্মের পরিবর্তন ও সমাজের পালটে যাওয়া। কিন্তু অস্বীকার করার কোনও জায়গা নেই যে ইসলাম এক গভীর ছাপ রেখে গিয়েছে এই সভ্যতার উন্নতিতে।

মিশর বা আরব রিপাবলিক অফ ইজিপ্ট আসলে সিনাই উপদ্বীপের মাধ্যমে সংযুক্ত আফ্রিকা ও এশিয়ার বুকে অবস্থিত এক আন্তর্মহাদেশীয় দেশ। দেশটির বুক চিরে প্রবাহিত হয়েছে বিখ্যাত নীল নদ। সাহারা মরুভূমির একাংশ অবস্থান করছে এই দেশের দক্ষিণপ্রান্তে।

মিশর-এর প্রাচীন ইতিহাস

ঐতিহাসিকরা বলেন, পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধশালী সভ্যতাগুলির একটির সূচনা হয়েছিল এই মিশরেই। খ্রিস্টপূর্ব ৩১৫০ সনে ফারাও মেনেসের শাসনের মাধ্যমে মিশরে ফারাওবংশের রাজত্ব শুরু হয়। ৩০০০ বছরের ফারাওদের রাজত্বে মিশর চিকিৎসা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উন্নতি করেছিল। নীলনদে বাঁধ দিয়ে কৃষিকাজ, পিরামিড ও মমি তার অন্যতম নিদর্শন। এরপর খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩ সনে যখন অ্যালেক্সান্ডার মিশর অধিকার করেন, তখন থেকে এই দেশে শুরু হয় ম্যাসিডোনিয়ান বা হেলেনিস্টিক যুগের সূচনা। কিন্তু সেই যুগ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। অ্যালেক্সান্ডারের পর তাঁর সুযোগ্য সেনাপতি টলেমির শাসনে হেলেনেস্টিক যুগ আস্তে আস্তে পরিবর্তিত হতে থাকে। টলেমির বংশ ধীরে ধীরে মিশরিয় আদব কায়দা ও ধর্মে অভ্যস্থ হতে শুরু করে।

রোমের অধিগ্রহণ

টলেমির বংশের শেষ রানী ছিলেন সপ্তম ক্লিওপেট্রা। জুলিয়াস সিজার তখন রোমের সাম্রাজ্য বৃদ্ধির জন্য আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কৌশলী সম্পর্ক স্থাপন করছেন। সপ্তম ক্লিওপেট্রা তখন মিশরের অধিকার নিয়ে তাঁর ভাই ত্রয়োদশ টলেমির সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন। বুদ্ধিমান সিজার রানীকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেন। উপরন্তু, মার্ক অ্যান্টনি বলে এক সেনাপতিকে মিশরে প্রেরণ করেন। সিজার ও অ্যান্টনির প্রয়াসে ত্রয়োদশ টলেমি পরাজিত হন ও সিজার ক্লিওপেট্রার সঙ্গে যুগ্মভাবে মিশরের শাসক হিসাবে পরিচিত হন। কথিত আছে, এই সময় অ্যান্টনির সঙ্গে ক্লিওপেট্রার প্রণয়ের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।

খ্রিস্টপূর্ব ৩০ সনে রোম সম্পূর্ণভাবে মিশর অধিগ্রহণের দিকে এগোয়। ক্লিওপেট্রা বাধা দিতে অক্ষম হওয়ায় আত্মহত্যা করেন। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সম্পুর্ণ মিশর রোমান সাম্রাজ্যভুক্ত হয়।

মিশরে ইসলামের প্রবেশ

২৮৪ থেকে ৩০৫ খ্রিস্টাব্দে রোমান সাম্রাজ্য থেকে বাইজান্টিয়াম সাম্রাজ্যে পরিবর্তিত হতে শুরু করে এই দেশ। কিন্তু ৬৩৯ খ্রিস্টাব্দে আরবের উম্মাইয়াদ খলিফা উমর (রাঃ) প্রায় ৪০০০ সৈনিকের এক বাহিনী পাঠান মিশরে। এই বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আমির ইবন আল-আস (রাঃ)। ৬৪০ সনে আরও ৫০০০ সৈন্য যুক্ত হয় তাঁর সঙ্গে। এরপর, হেলিওপোলিসের যুদ্ধে মুসলমান বাহিনী পরাজিত করে বাইজান্টিয়াম সৈন্যবাহিনীকে।

মিশর দখল করার পর ফুস্তাত বা আল-ফুস্তাত শহরকে রাজধানী হিসাবে চিহ্নিত করেন ইবন আল-আস। এই শহরেই প্রথম আমির মসজিদের স্থাপন করেন তিনি। এই মসজিদ মিশরের ও সমগ্র আফ্রিকার প্রথম মসজিদ হিসাবে পরিচিত। এই মসজিদটিকে মুকুটে সজ্জিত মসজিদও বলা হয়। আল-ফুস্তাত নামটির অর্থ ‘তাঁবুর শহর’।

বাইজান্টিয়াম সাম্রাজ্যে মিশরীয়রা প্রচুর পরিমাণে অত্যাচারের সম্মুখীন হত। ইসলাম এসে তাঁদের সেই অত্যাচারের হাত থেকে উদ্ধার করে। বিশেষ করে সেনাপতি আমির ইবন আল-আস ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু ও বিচক্ষণ মানুষ। তাঁর শাসনে মিশরের খ্রিস্টানরা নিজেদের ধর্ম পালন করার অধিকার পায়। যদিও, ইসলামের প্রতি মিশরীয়দের আগ্রহ ক্রমশ বাড়ছিল। ইসলাম তাঁদের জীবনে নিয়ে এসেছিল শান্তি ও স্থায়িত্বের আশ্বাস। ফলে, মিশরীয়দের মধ্যে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার প্রবণতা বাড়তে থাকে।

আমর ইবন আল-আস (রাঃ) মিশরের উত্তরাঞ্চল, ফায়য়াম, দামিয়েতা ও টেনেসেও মুসলমান বাহিনী প্রেরণ করেন। এরপর, তাঁর বাহিনী পশ্চিমর সায়রানাইকা অঞ্চল দখল করে নেয়। এরপর নুবিয়া অঞ্চল দখল করায়ের মাধ্যমে মিশর ও তার চারপাশে উম্মাইয়াদ বংশের শাসন সূচিত হয়।

 

(চলবে)