কীভাবে শিশুকে সদর্থক মানুষ করে তুলবেন? 

dreamstime_s_179523931
179523931 © Thitaree Mahawong | Dreamstime.com

সদর্থক ব্যবহার কাকে বলে? সবকিছুতেই যদি কেউ রাজি হয়ে যায়, সবকিছুতেই যদি কেউ হ্যাঁ বলে তাহলেই কি তার ব্যবহারকে সদর্থক বলা চলে? 

উত্তরটা কিন্তু বেশ গোলমেলে, কারণ অনেকেই মনে করে সবকিছুতে রাজি হওয়া মানেই সদর্থক ব্যবহার। একটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, আপনার বাবাকে কখনও দেখেছেন সব কথায় রাজি হয়ে যেতে? দেখেননি নিশ্চয়ই।

কিন্তু, হয়তো আপনার ভাই যখন ধূমপানে আসক্ত হয়েছে বাবা তাকে শান্তভাবে বুঝিয়ে সেই পথ থেকে ফিরিয়ে এনেছেন।

হয়তো কোনও এক দুর্ঘটনার পর গাড়ি থামিয়ে আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছেন। 

হয়তো আপনি আপনার বাবাকে দেখেছেন আল্লাহর প্রতিটি কথা অক্ষরে-অক্ষরে মেনে চলতে। হয়তো আপনি আপনার বাবাকে দেখেছেন মানুষের উপকার করতে, সাহায্য করতে।

প্রিয় পাঠক, হয়তো এইভাবেই আপনার পিতা একজন সৎ ও সদর্থক মানুষ ছিলেন। আপনার মধ্যে যেটুকু পজিটিভ মনোভাব এসেছে তা তাঁর ব্যবহারের জন্যই এসেছে। অতএব বলা যায়, আপনি যদি আজ সদর্থক মানুষ হন, তাহলে আপনার সন্তানও আজ পজিটিভ মানুষ হয়ে বড় হয়ে উঠবে। 

কথায় বলে, বাপকা বেটা, সিপাহিকা ঘোড়া, কুছ নাহি তো থোড়া থোড়া। 

ঋণাত্মক মনোভাব

ইমানদার ইসলাম উম্মাহর প্রাথমিক সমস্যা হল ঋণাত্মক মনোভাব। আমাদের সন্তানরা আমাদের থেকে ক্রমশ উম্মাহর অবস্থা নিয়ে অভিযোগ শোনে। তারা শোনে যে কিছুই আর আগের মতো নেই, আগের দিন খুব ভাল ছিল এগুলো শুনতে-শুনতে তাদের মধ্যে একটা বেপরোয়া অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। সেই অসন্তোষ থেকে তারা আল্লাহর পথ থেকে সরে আসে। এছাড়া তাদের জীবন সম্পর্কে উৎসাহ কমে যায়। বলা যায়, তারাও সবকিছুতে অভিযোগ করতে শুরু করে। 

একজন অভিযোগকারীকে কোনও অবস্থাতেই পজিটিভ ব্যক্তি বলা চলে না। একজন পজিটিভ বা সদর্থক ব্যক্তি কে হবে? যার একটি শান্ত মস্তিষ্ক থাকবে, আত্মবিশ্বাসী ও মুক্তমনা মানুষ হবে সে। যে  অন্যের কথা মন দিয়ে শুনবে এবং নিজের কথাও শান্তভাবে শোনাতে পারবে।। 

একজন সদর্থক মানুষ সে-ই হবে যার মধ্যে এই বিশ্বাস থাকবে যে সে যেকোনও অবস্থাতেই নিজের জীবন পরিবর্তন করতে পারে। যে কখনও মানসিক দুঃখ ও কষ্টে হতোদ্যম হয়ে পড়ে না। 

একজন শিশুর সামনে যদি আদর্শ সদর্থক মানুষের উদাহরণ থাকে তবে সেই শিশু নিজের জীবনে একজন সুস্থ সবল ও মানসিকভাবে স্থিতধী মানুষ হয়ে ওঠে। 

কুরআনের আশ্রয়

আদর্শ মুসলমান হিসেবে আমাদের ইব্রাহিম (আঃ)-এর  উদাহরণ মনে করা উচিৎ, পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদ করেছিলেন। আল্লাহর পথে আসতে বলেছিলেন সকলকে, 

‘হে আমার পিতা, শয়তানের এবাদত করো না। নিশ্চয় শয়তান দয়াময়ের অবাধ্য।‘ [কুর-আন ১৯:৪]

‘যখন তিনি তাঁর পিতা তাঁর সম্প্রদায়কে বললেনঃ এই মূর্তিগুলো কী, যাদের তোমরা পূজারী হয়ে বসে আছ।‘ [ কুর-আন ২১:৫২]

শুধু এই নয়, ইব্রাহিম আরও বলেন, 

‘ধিক তোমাদের জন্যে এবং তোমরা আল্লাহ ব্যতীত যাদেরই এবাদত কর, ওদের জন্যে। তোমরা কি বোঝ না?’ [কুর-আন ২১:৬৭] 

তা সত্ত্বেও যখন বিধর্মীরা তাঁকে আগুনে পুড়িয়ে মারতে চায়, স্বয়ং আল্লাহ তাঁকে রক্ষা করেন। 

ইব্রাহিম (আঃ) একজন পিতা হিসাবে বিশ্বাস করতেন আল্লাহকে, তিনি বিশ্বাস করতেন নিজের উপর। তাই জন্য কাবাঘর গড়ে তোলার জন্য যখন তিনি আল্লাহর থেকে নির্দেশ পান তখন নির্দ্বিধায় তা তৈরি করার জন্য নিজের সন্তানের সাহায্য চান। আর সন্তানও পিতার এই সদর্থক মনোভাব দেখে সাহায্য করতে রাজি হয়। 

আল্লাহ পবিত্র কুর-আনে বলেছেন, 

‘স্মরণ কর, যখন ইব্রাহীম ইসমাঈল কাবাগৃহের ভিত্তি স্থাপন করছিল। তারা দোয়া করেছিলঃ পরওয়ারদেগার! আমাদের থেকে কবুল কর। নিশ্চয়ই তুমি শ্রবণকারী, সর্বজ্ঞ।’[কুর-আন ২১:২৭] 

আল্লাহ এভাবেই সদর্থক মনোভাবের সম্পর্কে বলেছেন। 

‘এই কিতাবে ইসমাঈলের কথা বর্ণনা করুন, তিনি প্রতিশ্রুতি পালনে সত্যাশ্রয়ী এবং তিনি ছিলেন রসূল, নবী। তিনি তাঁর পরিবারবর্গকে নামায যাকাত আদায়ের নির্দেশ দিতেন এবং তিনি তাঁর পালনকর্তার কাছে পছন্দনীয় ছিলেন।‘ [কুর-আন ১৯:৫৪-৫৫]

অনুসরণ

অনেকে অবশ্য একমত হবেন না, অনেকেই বলবেন এগুলো আসলে ঐশ্বরিক ক্ষমতা। এ কথায় একমত না হয়ে উপায় নেই, অবশ্যই ইব্রাহিম (আঃ)-এর মনের জোর আল্লাহর দান। কিন্তু আমার মূল কথা হল, এই ঘটনা থেকে জীবনবোধের শিক্ষা নিয়ে যে নিজের জীবন গড়ে তুলতে পারবে সে-ই সদর্থক মানুষ। 

আর এই আল্লাহর ইঙ্গিত শিশুদের কাছে পৌঁছে দেওয়া আমাদের কর্তব্য, কারণ শিশুরা মূলত অনুসরণ করে শেখে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, শিশুর প্রথম কথা বলা শুরু হয় পিতা মাতার কথা অনুসরণ ও অনুকরণ করে। সুতরাং, আপনার সন্তানের চারপাশে আপনি যদি সদর্থক থাকেন, আপনার সন্তানও পজিটিভ ভাবনা চিন্তা করতে শিখবে। 

একটি উদাহরণে বলা যায়, 

আপনি ও আপনার সন্তান একটি পার্কে গিয়ে বসলেন, সেখানে একজন সিগারেট খেতে শুরু করল। ধোঁয়ায় আপনার ও আপনার শিশুর অস্বস্তি হতে শুরু করল। আপনি যদি একজন ঋণাত্মক উদাসিন পিতা হন তাহলে আপনি ঐ ব্যক্তিকে কিছু বলবেন না, কিন্তু সদর্থক পিতা হলে আপনি সেই ব্যক্তিতে অনুরোধ করবেন সিগারেটটি ফেলে দিতে। মনে রাখবেন, এই ঘটনার প্রতি মুহূর্ত  থেকে কিন্তু আপনার শিশু শিখছে।

অতএব, আল্লাহর দেখানো পথ অনুসারে নিজে সদর্থক মানুষ হয়ে উঠুন, নিজের সন্তানকে হয়ে উঠতে সাহায্য করুন, কারণ কথায় বলে, ছোটবেলায় পাওয়া শিক্ষা পাথরে খোদিত লিপির সমান।