কীভাবে হয়ে উঠবেন বুদ্ধিদীপ্ত শিক্ষক?

dreamstime_s_190879170
oto 190879170 © Airdone | Dreamstime.com

মহান আল্লাহ অনেক সময়েই অনেক ঘটনার দ্বারা আমাদের নানা শিক্ষা দিয়ে থাকেন। এরকমই এক ঘটনার বিবরণ রইল।

অশান্ত ফরিশ

মাদ্রাসার এক সাধারণ দিন, উলেমাদের কাছে ছাত্ররা কুর-আন শিক্ষা করছে। শুধু ফরিশ নামক এক ছাত্র হন্তদন্ত হয়ে প্রধানশিক্ষকের ঘরে প্রবেশ করল,

এতটাই তাড়া যে ঢোকার আগে অনুমতি পর্যন্ত নিল না। উপরন্তু ভীষণ উত্তেজিত গলায় বলল, ‘হে প্রধান শিক্ষক, আমি আপনাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানাতে চাই।’

প্রধান শিক্ষক তখন কাজ করছিলেন, ফরিশের উত্তেজিত গলায় তিনি চিন্তিত হয়ে কাজ সরিয়ে রাখলেন।

চেয়ার থেকে উঠে ফরিশের কাঁধে হাত রাখলেন ও শান্ত গলায় বললেন, ‘ আগে তুমি শান্ত হও হে প্রিয় বালক, গলার স্বর নীচু করে কথা বলো। তারপর আমাকে জানাও কী হয়েছে?’

ছাত্র একটু শান্ত হয়ে বলল, ‘ আমাদের শ্রেণিকক্ষে বিপজ্জনক একটি ব্যাপার ঘটছে।’

প্রধানশিক্ষক আগ্রহ ও চিন্তা সহকারে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ কী হচ্ছে তোমাদের শ্রেণিকক্ষে?’

ফরিশ ব্যথিত মুখে বলল, ‘ আমাদের শ্রেণির কিছু ছাত্র আমাদের গণিত শিক্ষকের সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করছে। শুধু তা নয়, তিনি যখন অন্যমনস্ক থাকছেন তখন তার জামা কাপড়ে অশ্লীল শব্দ লেখা চিরকুট আটকে দিচ্ছে, তারপর সেটা নিয়ে হাসাহাসি করছে।

আমার প্রিয় শিক্ষকের এই অবস্থা দেখে আমার কষ্টে বুক ভেঙে যাচ্ছে। আমি অনেকবার ওদের মানা করেছি, কিন্তু ওরা আমার কথার কোনও গুরুত্বই দেয়নি।’

‘আল্লাহ তোমাকে রিজিক দান করুন ফরিশ, আমাকে এই ঘটনা জানানোর জন্য তোমাকে ধন্যবাদ। আমি দেখছি কী করা যায়।’

‘ আল্লাহ আপনাকেও রহমত প্রদান করুন হে প্রধান শিক্ষক।’

শিক্ষকের প্রবেশ

ইতিমধ্যে ক্লাসে আদম ও মজিদের মধ্যে তখন এই বিষয় নিয়েই কথা হচ্ছিল।

আদম মজিদকে বারংবার সাবধান করছিল যে প্রধান শিক্ষক যেকোনও দিন যেকোনও মুহূর্তে শ্রেণিকক্ষ পরিদর্শন করতে আসবেন।

মজিদ অবশ্য বিষয়টিকে খুব গুরুত্ব দিচ্ছিল না, এবং গণিত শিক্ষককে নিয়ে ক্রমাগত মজা করে যাচ্ছিল। হঠাত করেই সকলের অজান্তে প্রধানশিক্ষক শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করলেন।

প্রধানশিক্ষককে দেখে সকল ছাত্র সতর্ক হয়ে গেল।

‘আস সালাম আলায়কুম’ বললেন প্রধানশিক্ষক।

‘ ওয়া আলায়কুম আল সালাম ওয়া রহমতুল্লাহি ওয়া বরকত।’ সকল ছাত্র সমস্বরে উত্তর করল।

‘ আমার প্রিয় ছাত্ররা, তোমাদের পড়াশুনো কেমন চলছে? মনে রেখো, যে সকল ছাত্ররা সহি উপায়ে সৎ পথে পড়াশুনো শেষ করবে আল্লাহ তাদের উতকর্ষতা প্রদান করবেন।’

সকল ছাত্র মনোযোগ সহকারে প্রধানশিক্ষকের কথা শুনতে শুরু করল।

‘ আমার প্রিয় ছাত্ররা, মনে রেখ, শুধুমাত্র পড়াশুনো করলেই যে ভাল মানুষ হওয়া যায় তা কিন্তু নয়। অবশ্যই লেখাপড়ার জন্য তোমাদের রাত ও দিন পরিশ্রম করতে হবে, কিন্তু সেই সঙ্গে ভদ্রতাও শিখতে হবে।

তাঁর উপদেশ

আল্লাহর এই পৃথিবীতে প্রত্যেক মানুষের জন্য সম্মান বরাদ্দ, যে মানুষ অন্য মানুষকে সম্মান না দিয়ে অশ্লীল তামাশা করতে পারে সেই মানুষ নিজের জীবনেও সম্মান পায় না। শুধু তাই নয় , নিজেদের শিক্ষক ও উলেমাদের যারা অপমান করে তাদের নিজের জীবনে অসফল হয়। আমি জানতে পেরেছি এই শ্রেণিতে আমাদের প্রিয় গণিতের শিক্ষকের সঙ্গে অপমানজনক ব্যবহার করা হয়।

আমি জানি কারা এই কাজটা করে , কিন্তু আমি তাদের সম্মান রক্ষার্থেই নাম করব না। তবে তাদের আল্লাহর সৎ পথে ফিরে আসতে বলব, কারণ আল্লাহ তাদের উপর অবশ্যই ক্ষুব্ধ।

আল্লাহ পবিত্র কুর-আনে বলেছেন,

‘হে মু’মিনগণ! কোন পুরুষ যেন অপর কোন পুরুষকে উপহাস না করে;

কেননা যাকে উপহাস করা হয় সে উপহাসকারী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে এবং কোন মহিলা অপর কোন মহিলাকেও যেন উপহাস না করে;

কেননা যাকে উপহাস করা হয় সে উপহাসকারিনী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে।

তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করনা এবং তোমরা একে অপরকে মন্দ নামে ডেকনা;

ঈমান আনার পর মন্দ নামে ডাকা গর্হিত কাজ। যারা এ ধরণের আচরণ হতে নিবৃত্ত না হয় তারাই যালিম।’ [কুর-আন ৪৯:১১]

জীবনবোধের বিশ্লেষণ

এরপর প্রধান শিক্ষক শ্রেণীকক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন। তবে মজিদ আর আদম ততক্ষণে শিক্ষা পেয়ে গিয়েছে, এবং দুইজনেই অধোবদনে বসে রইল। প্রধানশিক্ষকের কথা তাদের মনের গভীর রেখাপাত করেছিল।

তারা সিদ্ধান্ত নেয় তারা গণিত শিক্ষকের কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইবে।

পাঠক, এটাই সঠিক ও বুদ্ধিমান শিক্ষকের উদাহরণ। শিক্ষক সবসময় শাস্তি দেওয়ার বিনিময়ে বোঝাবে ও জীবনবোধের কথা বলবে।

এই প্রধানশিক্ষক কিন্তু সহজেই শ্রেণীকক্ষে ঢুকে মজিদ ও আদমকে বেত্রাঘাত করতে পারতেন, জোর করে গণিত টিচারের কাছে ক্ষমা চাওয়াতে পারতেন,

তা কিন্তু তিনি করলেন না। তিনি খুব অল্প কথায় বুঝিয়ে দিলেন তাঁর সব দিকেই নজর রয়েছে ও সুন্দর শিক্ষা দিলেন তাঁর প্রিয় ছাত্রদের।

পিতা ও মাতার এটা মাথায় রাখা উচিৎ যে সন্তানকে শিক্ষা দেওয়ার সময় কিছুতেই যেন তাদের আত্মসম্মানে আঘাত না করেন। সন্তানের দায়

পিতা মাতার মানেই তাঁরা সন্তানকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত শাসন করতে পারবেন তা কিন্তু নয়। এটা মাথায় রাখা উচিৎ শিশুদের আবেগ খুব বেশি ও

তারা অনেকটাই অপরিণত। তাই তাদের অল্প কথায় গল্পের মতো শিক্ষা দেওয়া উচিৎ। শিক্ষা এমন হবে যেন তা শিশুর আত্মসম্মান ও নিজের প্রতি ভরসা বৃদ্ধি পায়।

নবী রাসুল (সাঃ) সবসময় নিজের শিষ্যদের নরম ভাষায় গল্পের মাধ্যমে শিক্ষা দিতেন। তিনি মনে করতেন কঠিন শাসন মানুষকে ভুলের দিকে আরও ঠেলে দেয়।

এই গল্পের প্রধানশিক্ষক কিন্তু এই বিষয়টি সম্পূর্ণ মাথায় রেখেই অবাধ্য ছাত্র দুটিকে শিক্ষা দিলেন। শিশু ও কিশোরদের সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য তাদের ভালবাসা যেমন প্রয়োজন, তেমন বুদ্ধিদীপ্ত অনুশাসন প্রয়োজন।

‘সাউন্ড ডিসপোজিশন’ বইতে সমীক্ষার জন্য প্রায় দশজন পিতাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল তাঁরা রেগে গেলে শিশুদের কীভাবে শাসন করেন?

বেশিরভাগ উত্তর দিয়েছিলেন যে তাঁরা শিশুর উপর রাগ দেখান। এটা সহি উপায় নয়।

আল্লাহ আমাদের সহি মুসলমান হওয়ার অনেক পাঠ দিয়েছেন, বুদ্ধিদীপ্ত শিক্ষক হওয়া তার মধ্যে অন্যতম।