কী অবস্থায় রয়েছে ভিয়েতনামের মুসলমানরা

MEKONG DELTA, VIETNAM - April 26, 2014 - Vietnamese mosque.
MEKONG DELTA, VIETNAM - April 26, 2014 - Vietnamese mosque. Photo 59846355 © - Dreamstime.com

 দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সরু এস-আকৃতির দেশটির নাম ভিয়েতনাম। পৃথিবীর ইতিহাসে অদম্য নামে বিখ্যাত এই দেশটির পশ্চিম সীমান্তে কম্বোডিয়া ও লাওস অবস্থিত। ইন্দো-চিনা উপদ্বীপের পূর্বাংশে অবস্থিত এই দেশটি চিনদেশের সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। বর্তমান রাজধানীর নাম হ্যানয়, আর সর্ব বৃহৎ শহরের নাম হো চি মিন যার পূর্ব নাম ছিল সাইগন। ভিয়েতমান একত্রিত হওয়ার আগে সাইগন দক্ষিণ ভিয়েতনামের রাজধানী ছিল। 

ভিয়েতনাম কমিউনিজমের আঁতুরঘর নামে পরিচিত হলেও এই ভিয়েতনামেও ইসলাম পা রেখেছিল। ৯১৩ থেকে ১০০৯ খ্রিস্টাব্দে আরব দেশীয় ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে এই দেশে ইসলামের প্রসার শুরু হয়। কিন্তু, দুর্ভাগ্যবশত অন্যান্য দেশের মতো ইসলাম এখানে প্রসারিত হতে পারেনি। কমিউনিজমের আগে ভিয়েতনামের পেগান ধর্মমত ও কমিউনিজমের প্রসার শুরু হলে ইসলাম কোণঠাসা হতে শুরু করে। 

হুয়েই শহরে কমিউনিস্টরা প্রথমে নিরীহ মুসলমানদের উপর নানা প্রকার বিধি নিষেধ চাপিয়ে দেয়, এমনকি কোনও কোনও ক্ষেত্রে অত্যাচারও শুরু করে। তবে মূল সমস্যা শুরু হয় যখন উত্তর ও দক্ষিণ ভিয়েতনামের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৮… ভিয়েত কং ও পিপলস আর্মি অফ ভিয়েতনামের যুদ্ধে বিধ্বস্ত হয় হুয়েই শহর। সাধারণ মানুষ, যুদ্ধবন্দিদের গণকবর দেওয়া শুরু হয়। প্রাইয় কুড়ি দিন ধরে চলেছিল এই সংঘাত, অন্যান্য মানুষের সঙ্গে অজস্র মুসলমানকেও মৃত্যু বরণ করতে হয় তখন। প্রাণভয়ে দেশ ছেড়ে পালাতে থাকে মানুষ, ইসলাম আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। মুসলমানের সংখ্যা কমে যায় ভিয়েতনামে, যারা জীবিত থাকে তারাও লুকিয়ে পড়তে শুরু করে। 

উত্তর ও দক্ষিণ ভিয়েতনামের যুদ্ধ থামলেও দেশে শান্তি ফেরে না। বজ্রমুষ্টিতে শান্তি ফেরানোর জন্য ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট সরকার দেশে সত্তর খানা ক্রিমিনাল রিহ্যাবিলিশেন সেন্টার গড়ে তোলে। অন্যান্য মানুষদের সঙ্গে-সঙ্গে অজস্র ইসলাম ধর্মাবলম্বি মানুষ নামমাত্র অপরাধে সেখানে সশ্রম দণ্ডে দণ্ডিত থাকে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেখানে থাকার পর মৃত্যুর কিছু আগে তাদের রেহাই দেওয়া হত। সাধারণের মানুষের ক্লেশের শেষ ছিল না সেই সময়। 

কমিউনিস্টরা ক্ষমতা দখলের পর ভিয়েতনামে যে ক’টি মাদ্রাসা ও মসজিদ ছিল প্রায় সবকটিই দখল করে হাসপাতাল ও স্থানীয় প্রশাসনিক দপ্তর বানায়। দেশ থেকে ক্রমশ নিভে যেতে থাকে ইসলামের আলো। 

একমাত্র সাইগনের বৃহৎ মসজিদটি তারা রেখে দেয়, যাতে অন্য দেশ থেকে ইসলাম ধর্মাবলম্বি কোনও রাষ্ট্রদূত এলে সেখানে উপাসনা করতে পারে। আদতে সর্বধর্ম সমন্বয় মনোভাব দেখালেও দেশের অন্যপ্রান্তে তাদের ব্যবহার বৈষম্যমূলক।

কথিত আছে, ভিয়েতনামের বর্তমান সরকার নাকি একেবারেই ইসলাম ধর্মের প্রচার চায় না। তাই জন্যই শুক্রবারের জুম্মা নিষেধ, জুম্মা করতে গেলে আগে থেকে প্রশাসনের অনুমতি নিতে হবে। সমস্ত মুসলমানদের ঠিকানা ও পরিচয় প্রশাসনের কাছে জমা রাখতে হবে। অনেক ক্ষেত্রেই, কোনও কোনও মসজিদের ইমামদের গ্রেফতার করা হয়েছে কারণ তাঁরা হো চি মিনের প্রতিকৃতি মসজিদে রাখতে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তবে, সত্য বা মিথ্যা যাচাই করার কোনও উপায় নেই। 

এতযুগ ধরে অত্যাচার ও বৈষম্য সহ্য করার ফলে ভিয়েতনাম থেকে ইসলামের চিহ্নটুকু মুছে যেতে বসেছে। ভিয়েতনাম ব্যতীয় অন্য দেশের ইসলাম ও ভিয়েতনামের ইসলামের মধ্যে যোগাযোগ খুব ক্ষীণ। 

ফলস্বরূপ আমাদের এই মহান ধর্ম সম্পর্কে ভিয়েতনামের নব্য ইসলামিক প্রজন্ম প্রায় কিছুই জানে না। শুক্রবার করে অনুমতি নিয়ে মসজিদ খুলে ইমামরাই প্রার্থনা করেন, এমনকি রমজান মাসে ইমামরাই বাকিদের হয়ে উপবাস রাখেন। বয়স্ক মুসলমানরা যদিওবা কুর-আনের কিছু কিছু আয়াত মনে রাখতে পেরেছেন, নব্য মুসলমানরা ধর্ম সম্পর্কে ভাবেই না। উলটে কমিউনিজমের প্রতি তাদের প্রচ্ছন্ন মদত রয়েছে। 

সামাজিকভাবে ভিয়েতনামের মুসলমানদের  অবস্থান বেশ নীচু। তারা আর্মিতে যোগ দিতে পারে না। সাধারণত নিম্নপদস্থ কর্মেই তাদের জীবন কাটিয়ে দিতে হয়। 

ইসলাম সততার ধর্ম, শান্তির ধর্ম, সহনশীলতার ধর্ম। অথচ ভিয়েতনামের মতো দেশে এই মহান ধর্মের এমন পরিণতি দূর্ভাগ্যজনক।