কুনাফার ইতিবৃত্ত: খলিফাদের পছন্দের এই মিষ্টি আজও রমযানে জনপ্রিয়

খাবার ২৭ এপ্রিল ২০২১ Contributor
সুস্বাদু
কুনাফার ইতিবৃত্ত
Photo : Dreamstime

রমযানের জনপ্রিয় মিষ্টি কুনাফার ইতিবৃত্ত আপনাদের অনেকেরই অজানা। রমযান মাস উপলক্ষে অনেকের বাড়িতেই দেশ-বিদেশের নানারকম মিষ্টি তৈরি হয়। কুনাফা তার মধ্যে অন্যতম। বাইরে গোলাপ জল বা অরেঞ্জ ব্লসম ও পাতলা চিনির রসসিক্ত হালকা বেকড ফিলো পেস্ট্রি বা ভাজা সিমাইয়ের পাতলা আবরণী, এবং ভিতরে ক্রিম বা চিজের স্তর, উপরে ছড়ানো পেস্তাবাদামের গুঁড়ো। এটিই কুনাফা। ওভেন বা তাওয়া থেকে নামানোর পর গরম অবস্থায় ফিলো পেস্ট্রির ভিতরের ক্রিম বা চিজ যখন গলন্ত থাকবে, তখনই কুনাফা খাওয়া দস্তুর। আরব দুনিয়ায় বিশেষ করে প্যালেস্তাইন, ল্যুভান্ত বা মিশরে এই মিষ্টি প্রবল জনপ্রিয়। তবে বর্তমানে দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার গণ্ডি ছাড়িয়ে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, তুরস্ক, গ্রিস, বলকান অঞ্চল, আরমেনিয়া, অ্যাজারবাইজান সহ দক্ষিণ ককেশাসেও কুনাফা পা রেখেছে। কিন্তু কে প্রথম বানিয়েছিলেন কুনাফা? কোন দেশে এর উৎপত্তি হয়, কুনাফার ইতিবৃত্ত খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে প্রাচীন আরবে।

কুনাফার ইতিবৃত্ত: কোথায় জন্ম কুনাফার?

প্রাচীন মিশরের গল্পসংকলন ‘আলেফ লায়লা’-তে কুনাফার হদিশ মিললেও প্রাচীন মিশর, নাকি আরব, কোথায় জন্ম কুনাফার, এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কেউ বলেন, কপটিক ইজিপশিয়ান শব্দবন্ধ ‘কেনেফিটেন’ (যার অর্থ কেক) থেকেই আধুনিক কুনাফার উৎপত্তি। আবার কেউ বলেন, খ্রিস্টিয় দশম শতকে দামাস্কাসের উমাইয়াদ খলিফা মুয়াবিয়া বিন আবি সুফিয়ানের রাজত্বকালেই কুনাফার উদ্ভব। রমযান মাস পড়লেই খলিফা বাবুর্চিদের তলব করতেন ভাল-মন্দ কিছু রাঁধার জন্য। সেহরির সময় সম্রাট ক্ষুণ্ণিবৃত্তি করবেন, তাই শাহি হাকিমেরা খলিফার খাস বাবুর্চিকে এহেন উপাদেয় মিষ্টিটি বানানোর পরামর্শ দেন!

কুনাফার আদিরূপ: ক্রেপের মধ্যে বাদামের পুর!

খ্রিস্টিয় দশম শতাব্দীতে আব্বাসিয় খলিফাদের আমলে আরবি লেখক ইবন সায়ার-আল-ওয়ারাকের সেযুগের আরব ও পারস্যের নানারকম রেসিপির সংকলন ‘কিতাব আল-তাবাইখ’-এ ‘কুনাফা’ শব্দটির হদিশ মেলে। তবে হাল আমলের কুনাফার সঙ্গে সেই কুনাফার ফারাক আসমান-জমিন! জানা যায়, সেইসময় ‘কাতাইফ’ (এর থেকেই তুর্কি ‘কাদাইফ’ ও গ্রিক ‘কাতাইফি’র উৎপত্তি) বা পাতলা ক্রেপের মধ্যে নাকি বাদামের পুর দিয়ে ডুবো তেলে ভেজে মধু ও চিনির রসে ডুবিয়ে খাওয়া হত। মনে করা হয়, এটিই কুনাফার আদিরূপ। এছাড়াও ছিল ‘রুকাক’ নামে পরিচিত পাতলা কাপড়ের মতো একধরনের ক্রেপ, এর উপর ফলের আস্তরণ ছড়িয়ে চিনির রসে ডুবিয়ে খাওয়া হত।

এরপর কুনাফার ইতিবৃত্ত-র সূত্র মেলে ত্রয়োদশ শতকের ‘কিতাব আল তাবাইখ ফি-ই-মঘরিব ওয়া-ই-আন্দালুস’ বা মাঘ্রেব (উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকা) ও আল-আন্দালুসের রেসিপির সংকলন বইটিতে। এখানে ‘কুনাফা’ শব্দবন্ধ পাওয়া যায়। তবে এই কুনাফা যেন আরও পাতলা, প্রায় টিসুর মতো! ক্রেপ বানিয়ে তার মধ্যে টাটকা চিজ দিয়ে বেক করে মধু ও গোলাপ সিরাপ দিয়ে এগুলি খাওয়া হত। কখনও বা গোলাপপাতার মতো পাতলা টুকরো করে কেটে মধু, বাদাম, চিনি ও গোলাপজল দিয়ে রান্না করেও এই কুনাফা খাওয়া হত। তবে কুনাফা এবং খাবারদাবার নিয়ে আরব দুনিয়ার

মানুষ যে কতটা সিরিয়াস ছিলেন, সে কথা জানা যায় এইসময়ের বিখ্যাত তাত্ত্বিক ইবন আল-জাযারির লেখায়। তাঁর বইতে একজন পরিদর্শকের কথা পাওয়া যায়। মামলুক সুলতানদের রাজত্বকালে প্রতি রমযান মাসে এই পরিদর্শক রাতের শহর ঘুরে বেলা কুনাফা, কাতাইফ এবং রমযানের অন্যান্য খাবারগুলির মানের তদারক করতেন!

কুনাফার ইতিবৃত্ত : বিদেশের মাটিতে জয়যাত্রা

আরও পরে পঞ্চদশ শতকে কুনাফা তৈরির ক্ষেত্রে আরও কিছু নতুন, সূক্ষ্ম প্রণালীর আবিষ্কার হতে শুরু করে। পঞ্চদশ শতকের মধ্যভাগে আরবি রান্নার বইয়ের সংকলক মুহম্মদ বিন হাসান আল-বাগদাদির ‘কিতাব আল-তাবাইখ’-এ যে-সমস্ত কুনাফার রেসিপির সন্ধান মেলে, সেগুলির সঙ্গে হাল আমলের কুনাফার রন্ধনপ্রণালীর মিল যেন স্পষ্ট। এইসময়েই কুনাফা আস্তে-আস্তে পা রাখতে শুরু করে আরবের মানচিত্র ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতে। ইরান, গ্রিস, তুরস্কেও শুরু হয় তার জয়যাত্রা। ভাষা, সংস্কৃতির ব্যবধানে এক-এক দেশের মানুষের কাছে পরিচিত হতে শুরু করে বিভিন্ন নামে।

ফলের কুচি, বাদাম, ক্রিম: নানা স্বাদে কুনাফা

মানচিত্র পালটে গেলেই যেমন বদলে যায় কুনাফার নাম, তেমনই বদল ঘটে রন্ধনপ্রণালীতেও। মিশরীয়রা যেমন কুনাফা তৈরিতে ‘আশতা’ নামক ঘন ক্রিম ব্যবহার করতেই পছন্দ করেন, আবার প্যালেস্তিনিয়রা কুনাফায় ন্যাবালসি চিজ ব্যবহারেই স্বচ্ছন্দ।

তবে কুনাফা সবচেয়ে জনপ্রিয় বোধহয় তুরস্কে। সেখানকার হাটায় শহরটি খাস ‘কুনাফার শহর’ বলেই পরিচিত। কুনাফার ইতিবৃত্ত বলে এখানকার কুনাফায় সে সিরাপটি ব্যবহার করা হয়, সেটা আরব কুনাফার চেয়ে বেশ খানিকটা আলাদা। শুধু তাই নয়, এক্ষেত্রে চিজটিও আলাদা হয়। এছাড়া ন্যাবালসে যে কুনাফা তৈরি হয়, সেগুলিও স্বাদে সেরা। এছাড়াও পাওয়া যায় ইজিপশিয়ান কুনাফা। কায়রোতে যদি আপনি যান, তাহলেই দেখতে পাবেন, কুনাফার স্ট্রিপগুলি তৈরি করার জন্য কারিগররা চালুনিতে ছেঁকে ময়দা মাখা মণ্ড গরম তাওয়ার উপর ফেলছেন। মিশরের কুনাফা আরও বেশি মুচমুচে এবং এগুলি খুব বেশি চটচটেও হয় না। মিশরিয়রা তাঁদের কুনাফার ভিতরে ক্রিম, বাদাম, এমনকী ফলের কুচিও দিয়ে থাকেন।

হাল আমলে কুনাফার নানারকম ফ্লেভারও বেরিয়েছে। লোটাস সস থেকে শুরু করে নুটেলা স্প্রেড, পেস্তা ক্রিম, রোজ ক্রিম, জাফরান, তিরামিসু ইত্যাদি সহযোগে নিত্যনতুন কুনাফার ফ্লেভার এখন প্রবল জনপ্রিয়। শুধু তাই নয়, কুনাফা আইসক্রিম, কুনাফা কাপকেক ইত্যাদিও বিকোচ্ছে দেদার!

বিশ্বের সবচেয়ে বড় কুনাফা!

কুনাফা নিয়ে রয়েছে কিছু পাগলামিও! আর সেই পাগলামির জন্যই কুনাফার নাম উঠেছে গিনেস বুকের রেকর্ডেও। বেশ কিছুবছর আগেই প্যালেস্তাইনের ন্যাবালসে বানানো হয়েছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় কুনাফা। ৭৪ মিটার লম্বা ও ১.০৫ মিটার চওড়া এবং ১৭৫৬ কেজি ওজনের এই কুনাফাটি বানাতে লেগেছিল প্রায় ৬০০ কেজি চিজ, ৩০০ কেজি চিনি, ৪০ কেজি পেস্তাবাদাম!

তবে কুনাফার সঙ্গে কবে বা কীভাবে জুড়ে গেল রমযানের নাম, কুনাফার ইতিবৃত্ত নিয়ে কথা বলতে গেলে সে কথা জানা না গেলেও, এখন অনেকেই কুনাফাকে রমযানের ‘বিশেষ’ মিষ্টি বলতে পছন্দ করেন। অনেক দেশেই রমযান মাস পড়লেই শুরু হয় কুনাফা বানানো। দোকান থেকে কিনে আনার বদলে কোনও-কোনও পরিবারে আবার বাড়ির বড়রা নিজেরাই বানিয়ে ফেলেন কুনাফা। তারপর একসঙ্গে মিলে সেহরি বা ইফতারে জমিয়ে খাওয়া হয় খলিফাদের পছন্দের এই মিষ্টি। তাই আপনার যদি কুনাফা বানাতে ইচ্ছে করে, তাহলে এবারের রমযানেই স্বচ্ছন্দে বানিয়ে ফেলতে পারেন এই মিষ্টিটি, আর চমকে দিতে পারেন নিজের প্রিয়জনদের।